অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ভারতের অর্থ সহায়তা এক যুগে সর্বনিম্ন

ঢাকা, ২২ মার্চ – বিদেশি সহায়তা নীতির আওতায় গত এক যুগে বাংলাদেশকে প্রায় এক হাজার ৫৫৭ কোটি রুপির অর্থ সহায়তা প্রদান করেছে ভারত। তবে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের বর্তমান মেয়াদে এই সহায়তার পরিমাণ গত ১২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
মাত্র পাঁচ বছর আগেও যেখানে বছরে ২০০ কোটি রুপির বেশি সহায়তা দেওয়া হতো, বর্তমানে তা মাত্র ২৫ কোটি রুপিতে নেমে এসেছে। গত শুক্রবার ভারতের লোকসভা অধিবেশনে এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে দেশটির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং বাংলাদেশকে দেওয়া এই অর্থ সহায়তার পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।
লোকসভার সদস্য টি আর বালুর ২০১৪ থেকে ২০১৫ অর্থবছর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশকে দেওয়া সহায়তার পরিমাণ জানতে চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই তথ্য জানানো হয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে লোকসভায় দেওয়া এই হিসেবের বিস্তারিত জানানো হয়েছে। তবে এই হিসেবের মধ্যে ভারতের লাইন অব ক্রেডিট বা এলওসির আওতাভুক্ত অর্থ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, লোকসভায় ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন যে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের মূল ভিত্তি প্রতিবেশীকেন্দ্রিক এবং জনমুখী।
এলওসি এবং বিভিন্ন অনুদানের মাধ্যমে ভারত বেশ কিছু উন্নয়নমূলক উদ্যোগে সহায়তা দিয়ে আসছে। এর পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়ন, মানবিক সহায়তা, দুর্যোগকালীন ত্রাণ বিতরণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির কর্মসূচিতেও ভারত নিয়মিত সহায়তা করেছে। ২০১৪ থেকে ২০১৫ অর্থবছর থেকে শুরু করে ২০২৫ থেকে ২০২৬ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত বাংলাদেশকে দেওয়া সহায়তার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র লোকসভায় উপস্থাপন করা হয়। ভারতের হিসাব অনুযায়ী তাদের অর্থবছর এপ্রিল মাস থেকে শুরু হয়ে মার্চ মাসে শেষ হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০১৫ অর্থবছরে প্রায় ১৯৮ কোটি রুপি দেওয়া হয়েছিল।
সহায়তার সর্বোচ্চ পরিমাণ ছিল ২০২১ থেকে ২০২২ অর্থবছরে, যখন ভারত ২১৯ কোটি ৫৩ লাখ রুপি প্রদান করে। এরপর থেকে সহায়তার হার ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। ২০২৪ থেকে ২০২৫ অর্থবছরে এসে এই পরিমাণ ৫৯ কোটি রুপিতে নেমে আসে। উল্লেখ্য, এই বছরই প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং তিনি ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হওয়ার পর নানা ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের কিছুটা টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে দ্বিপক্ষীয় অর্থ সহায়তার ওপর।
সর্বশেষ ২০২৫ থেকে ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে, অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, সহায়তার পরিমাণ মাত্র ২৫ কোটি রুপিতে এসে দাঁড়িয়েছে, যা গত পাঁচ বছরের তুলনায় প্রায় আট ভাগের এক ভাগ। লোকসভায় কীর্তি বর্ধন সিং আরও জানান, প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে গভীর ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক বন্ধন রয়েছে। একটি স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের প্রতি ভারত সর্বদা সমর্থন জানিয়ে এসেছে। এছাড়া দ্বিপক্ষীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অধীনে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অব্যাহত রাখতে ভারত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ভারতীয় বন্দরগুলোতে বাংলাদেশি রপ্তানি পণ্যের অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট সব দিক বিবেচনা করে নীতিগত যেকোনো পরিবর্তনের বিষয়ে আগামীতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ বা ইআরডি সূত্র জানিয়েছে, গত জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ভারত এলওসির আওতায় মোট ২১০ কোটি ডলার অর্থ ছাড় করেছে।
২০১০, ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে তিনটি এলওসির অধীনে বাংলাদেশকে মোট ৭৩৬ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রতিশ্রুতির তুলনায় অর্থ ছাড়ের হার আশানুরূপ হয়নি। মূলত অবকাঠামো, বিদ্যুৎ এবং যোগাযোগ খাতের বিভিন্ন প্রকল্প এই ঋণের আওতায় গ্রহণ করা হয়েছে।
ইআরডির একজন কর্মকর্তা জানান, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ভারতীয় ঋণের অর্থ ছাড়ের গতি কিছুটা কমে যায়। তবে নতুন সরকারের আমলে এলওসির আওতাভুক্ত প্রকল্পগুলোতে অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে থাকা সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা পর্যালোচনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
এ এম/ ২২ মার্চ ২০২৬









