ইরান যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কে টানাপোড়েন, ট্রাম্প-শি বৈঠক স্থগিত

চীন, ১৭ মার্চ – কখনো উষ্ণ এবং কখনো শীতলতার মধ্য দিয়ে যাওয়া চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে ইরান যুদ্ধ। বিশেষ করে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠককে ওয়াশিংটন যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাওয়ায় চীনা কর্মকর্তারা বিরক্তি প্রকাশ করেছেন।
হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ পাহারা দেওয়ার জন্য কয়েকদিন আগে চীনসহ বিভিন্ন দেশকে আহ্বান জানিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বেইজিং এই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ট্রাম্প স্বয়ং বৈঠক পিছিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন। যদিও সোমবার তিনি দাবি করেন যে তিনি বৈঠকে যেতে চান কিন্তু যুদ্ধের কারণে তাকে দেশেই থাকতে হচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে চীনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খুব ভালো এবং তিনি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের অপেক্ষায় আছেন।
তবে বৈঠক পিছিয়ে দিয়ে ট্রাম্প সুসম্পর্কের দাবি করলেও বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন না চীনা কর্মকর্তারা। বাণিজ্যিক জাহাজ পাহারা দেওয়ার মার্কিন আহ্বানকে বেইজিং বেশ শীতলভাবেই গ্রহণ করেছে। সোমবার এ বিষয়ে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান কেবল জানান যে তার দেশ সব পক্ষকে অবিলম্বে সামরিক তৎপরতা বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছে। সরকারি মহলের বাইরে ট্রাম্পের এই আহ্বান চীনে রীতিমতো উপহাসের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র গ্লোবাল টাইমস প্রশ্ন তুলেছে এটি কি সত্যিই দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া নাকি শেষ করতে না পারা যুদ্ধের ঝুঁকি ভাগ করতে ওয়াশিংটনের কোনো ফন্দি। অপরদিকে এক প্রভাবশালী চীনা ব্লগার রসিকতা করে বলেছেন মার্কিন জাহাজকে পাহারা দেওয়ার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের এখন ইরানি যুদ্ধজাহাজকে আমন্ত্রণ জানানো উচিত।
বেইজিংয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে নিজেদের কর্মী ও জাহাজকে ঝুঁকিতে ফেলা বা আঞ্চলিক ঘনিষ্ঠ অংশীদার ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। ইরান ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেছে যে তারা কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে এবং চীনের তেলবাহী জাহাজগুলোকে নির্বিঘ্নে প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দিচ্ছে।
সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ ইউনিভার্সিটির মিডল ইস্ট স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডিং লং জানান ট্রাম্প বেইজিং সফর করুন বা না করুন চীন কোনোভাবেই যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে না। নৌবাহিনীর জাহাজ পাঠানোর অর্থ হলো ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাতে যোগ দেওয়া বা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়া যা করতে চীন মোটেও আগ্রহী নয়। শি জিনপিং দীর্ঘদিন ধরে চীনকে পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। এই অবস্থায় ট্রাম্পের আহ্বানে যুদ্ধজাহাজ পাঠালে তা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের কাছে নতিস্বীকার করার শামিল হবে। মারকেটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজের বিশ্লেষক ক্লজ সুং মনে করেন বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে এটি আমেরিকার যুদ্ধ এবং চীনের সমস্যা নয়। তাই ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দিলে মনে হবে চীন যেন নির্দেশ পালন করছে। তবে একেবারে সাড়া না দেওয়াটা দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য বিরতিকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
ট্রাম্পের সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকের মাধ্যমে বেইজিং মার্কিন চাপ কমিয়ে নিজেদের ধীরগতির অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার আশায় ছিল। চীন চায় ওয়াশিংটন যেন তাইওয়ানের প্রতি সমর্থন কমায় এবং প্রযুক্তি রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করে। এছাড়াও গত বছরের বাণিজ্য যুদ্ধের পর শুল্কের ওপর যে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছিল সেটির মেয়াদ বাড়ানোর প্রত্যাশাও রয়েছে চীনের। যুদ্ধ শুরুর আগেই চীন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করেছিল কিন্তু তারপরও হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় তারা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী যুদ্ধ শুরুর পর থেকে খুব কম সংখ্যক চীনা জাহাজই এই জলপথ অতিক্রম করেছে।
মেরিটাইম ডেটা প্ল্যাটফর্ম মেরিন ট্রাফিকের তথ্যমতে মঙ্গলবার পর্যন্ত অন্তত ৯টি চীনা পণ্যবাহী জাহাজ পারস্য উপসাগরে আটকা পড়ে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওয়াশিংটনের স্টিমসন সেন্টারের চায়না প্রোগ্রামের পরিচালক ইউন সান বলেন প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়া হলে সবাই উপকৃত হবে। বেইজিং হয়তো মধ্যস্থতার চেষ্টা করতে পারে অথবা পর্দার আড়াল থেকে ইরানকে প্রণালিটি খুলে দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে পারে।
তিনি আরও বলেন প্রণালিটি খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারলে তা বেইজিংয়ের জন্য লাভজনক হবে এবং এটি শীর্ষ সম্মেলনের আগে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরিতে সাহায্য করবে। তবে চীন কেবল একতরফা চাপ দিয়ে ইরানকে বাধ্য করতে পারবে না। বিপরীত দিক থেকে বিবেচনা করলে ট্রাম্প ও শির বৈঠক পিছিয়ে যাওয়াটা চীনের জন্য পরোক্ষভাবে লাভজনকও হতে পারে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়বে এবং চীন সেই চাপকে কাজে লাগিয়ে দর কষাকষির বাড়তি সুযোগ পাবে। বিশ্লেষক ক্লজ সুংয়ের মতে বেইজিং এবং ওয়াশিংটন উভয় পক্ষেরই এই শীর্ষ সম্মেলন নিয়ে প্রত্যাশা রয়েছে। তবে ট্রাম্পের জন্য এই বৈঠকটি সম্ভবত বেশি জরুরি কারণ তিনি প্রমাণ করতে চান যে তিনি একটি সফল চুক্তি করতে সক্ষম।
এ এম/ ১৭ মার্চ ২০২৬









