সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে জোর দিলে ২৫ বছরে বাঁচবে ৩ বিলিয়ন ডলার: আইইইএফএ

বাংলাদেশ, ১৬ মার্চ – বাংলাদেশে এক গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা গেলে আগামী ২৫ বছরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানিতে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস বা আইইইএফএ আজ সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে। ‘
ইরান উত্তেজনা এশিয়ার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির জরুরি প্রয়োজন’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান ইরান সংকটের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৫১ শতাংশ এবং এলএনজির দাম ৭৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশসহ জ্বালানি আমদানিনির্ভর এশীয় দেশগুলো এক নতুন অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে।
এতে মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর ব্যাপক চাপ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এখনই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের উদ্যোগ জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
আইইইএফএর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের আমদানি করা এলএনজির বড় একটি অংশ কাতার ও ওমান থেকে আসে। সম্প্রতি বাংলাদেশ খোলা বাজার থেকে একটি এলএনজি কার্গো কিনেছে, যার দাম পড়েছে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট বা এমএমবিটিইউ ২৮ দশমিক ২৮ ডলার। এটি গত মাসের জাপান কোরিয়া মার্কার সূচকের প্রায় তিন গুণ।
সংস্থাটির মতে, এ ধরনের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি আমদানিনির্ভর এলএনজি ব্যবস্থার অর্থনৈতিক ঝুঁকির বিষয়টিকেই স্পষ্ট করে তোলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় গ্যাসের সীমিত মজুত এবং আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও ঠিক একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তখন এলএনজির ব্যবহার কিছুটা কমলেও উচ্চ মূল্যের কারণে আমদানি ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানির দাম বাড়লে অর্থনীতিতে এক ধরনের দুষ্টচক্র তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রার মান কমে যায়, যার ফলে আমদানি ব্যয় আরও বেড়ে যায়। এতে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে, ডলারে লেনদেন করা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের খরচ বাড়ে এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশের সরকার স্বল্পমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানিতে ভর্তুকি দেওয়া, খুচরা দামের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা অথবা কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করা।
তবে আইইইএফএর মতে, এসব পদক্ষেপ সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে সরকারি অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। ইতিমধ্যে এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। থাইল্যান্ড ডিজেলের দাম সীমিত করেছে এবং জ্বালানি কর কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। চীন, থাইল্যান্ড ও ভারতের কিছু পরিশোধনাগার সাময়িকভাবে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ রেখেছে।
অন্যদিকে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক করে বলেছে যে, তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের বেশি হলে মুদ্রানীতি কঠোর করা হতে পারে। আইইইএফএ বলছে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশগুলোকে বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। বর্তমানে বাংলাদেশে এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ সৌর ও বায়ুশক্তির তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, বাংলাদেশে এক গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারলে ২৫ বছরে এলএনজি আমদানিতে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তাও বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামার নেতিবাচক প্রভাব কমে আসবে। এদিকে ইরান সংকট ঠিক কতদিন স্থায়ী হবে তা এখনো পুরোপুরি অনিশ্চিত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই সংঘাত চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে এবং তিনি তেহরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দাবি করেছেন।
অন্যদিকে কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, সংঘাত দীর্ঘ হলে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
তাই ভবিষ্যৎ জ্বালানি ঝুঁকি মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া এখন সময়ের দাবি। আইইইএফএর মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু পরিবেশ রক্ষার কোনো বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। সৌর, বায়ু এবং বিদ্যুৎ সংরক্ষণ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে অনেকটাই সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।
এ এম/ ১৬ মার্চ ২০২৬









