
নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের পশ্চিম প্রান্তের শহর বাফেলো বহুদিন ধরেই সীমান্তঘেঁষা অভিবাসী জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কানাডার কাছাকাছি অবস্থান, তুলনামূলক কম খরচ এবং নতুন জীবন গড়ার সুযোগের কারণে বাংলাদেশি অভিবাসীদের একটি অংশও এই শহরকে আশ্রয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন। সময়ের সঙ্গে বাফলোর বাংলাদেশি কমিউনিটির বিস্তৃতি বেড়েছে, আর সেই সঙ্গে বেড়েছে নতুন আসা মানুষের সংখ্যা। এই নবাগতদের স্বপ্ন, অনিশ্চয়তা এবং আইনি অজ্ঞতাকে পুঁজি করে গত কয়েক বছরে এখানে গড়ে উঠেছে এক অন্ধকার প্রতারণার বাজার। অভিযোগ উঠেছে, ইমিগ্রেশনের রঙিন ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কিছু ব্যক্তি মানুষের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন বিপুল অর্থ। সেই অভিযোগের কেন্দ্রেই এখন উঠে এসেছে বাংলাদেশি এম. এম. নুরুজ্জামানের নাম এবং তার প্রতিষ্ঠান Zaaf Law & Immigration।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বাফলোর টেলিভিশন চ্যানেল WKBW TV এ প্রচারিত এক প্রতিবেদনের পর বিষয়টি বড় আকারে আলোচনায় আসে। লাইভ অনুষ্ঠানটিতে দেখা যায়, নুরুজ্জামানের প্রতিষ্ঠানের সামনে বিক্ষোভে দাঁড়িয়ে কমিউনিটির সদস্যরা বিচার চাইছেন এবং অভিযোগ তুলছেন যে তারা প্রতারিত হয়েছেন। Erie County District Attorney Michael Keane এর কার্যালয়ও জানায়, তারা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে অভিযোগের কথা জেনেছে এবং তদন্ত এগিয়ে নিতে ভুক্তভোগীদের সরাসরি এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে।

অভিযুক্ত নুরুজ্জামানের কৌশলের প্রথম ধাপ ছিল মানুষের বিশ্বাস অর্জন। তিনি নিজেকে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং আমেরিকার ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিতেন। তার টার্গেট ছিল মূলত ভিজিট ভিসায় আসা নতুন আগত বাংলাদেশি নাগরিকরা, যারা যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তার লাইভ এবং আকর্ষণীয় প্রচারণা দেখে অনেকেই সহজে তার প্রতি আস্থা পোষণ করেন।
স্থানীয় মূলধারার মিডিয়ার অনুসন্ধান এ ঘটনাকে নতুন মাত্রা দেয়। WKBW এর ৪ মার্চ ২০২৬-এর ফলোআপ প্রতিবেদনে বলা হয়, নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি রেজিস্ট্রিতে নুরুজ্জামানকে লাইসেন্সধারী আইনজীবী হিসেবে পাওয়া যায়নি। একই প্রতিবেদনে বাফেলোর ইমিগ্রেশন আইনজীবী জেনিফার বেম বলেন, একজন ‘ফর্ম প্রিপেয়ারার’ সীমিত পরিসরে কাগজপত্র প্রস্তুতে সহায়তা করতে পারেন, কিন্তু তিনি আইনি পরামর্শ বা নির্দিষ্ট ‘লিগ্যাল স্ট্র্যাটেজি’ দেওয়ার অধিকার রাখেন না।
Zaaf Law & Immigration এর ওয়েবসাইটে নিজেদেরকে “immigration law firm” বলা হয়েছে। সেখানে family immigration, business and investment visas, asylum, deportation defense, removal representation এবং naturalization counselling সহ বিস্তৃত সেবার তালিকা রয়েছে। “Team Members” পাতায় M M Nuruzzaman কে Founder & CEO এবং “Advocate of Supreme Court of Bangladesh” হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। Buffalo, Jackson Heights এবং Dhaka অফিসের ঠিকানাও সেখানে দেওয়া আছে। ফলে প্রকাশ্য পরিচিতিতে প্রতিষ্ঠানটি এমন একটি পূর্ণাঙ্গ আইন ও ইমিগ্রেশন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের ছাপ তৈরি করেছে, যা সাধারণ গ্রাহকদের কাছে সহজেই বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে।

অভিযোগকারীদের দাবি, বাংলাদেশ থেকেও তিনি লোকজনের কাছ থেকে ১০ হাজার, ২০ হাজার, এমনকি আরও বেশি অঙ্কের ডলার নিয়েছেন, দক্ষ ভিসা, ব্যবসায়িক ভিসা বা যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে। নুরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের এক স্পষ্ট উদাহরণ ভুক্তভোগী আব্দুল বাতেনের বয়ান। বাতেনের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি প্রথমে বাংলাদেশের একটি লাইভ অনুষ্ঠানে নুরুজ্জামানের বক্তব্য শুনে যোগাযোগ করেন। সেখানে বলা হয়েছিল, যাদের যুক্তরাষ্ট্রের টুরিস্ট ভিসা আছে তারা ব্যবসা কিনে বা সেটআপ করে E 2 ভিসার মতো স্ট্যাটাসের পথে এগোতে পারেন। বাতেনের দাবি, নুরুজ্জামান তাকে আশ্বস্ত করেন যে বাফলোতে একটি ব্যবসা কিনলে তিনি সহজেই ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাসের পথে এগোতে পারবেন। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি দফায় দফায় নুরুজ্জামানকে টাকা দিতে থাকেন।
নুরুজ্জামান বাতেনকে প্রথমে তার কাজের ফি বাবদ ১২ হাজার ডলারের কথা বললেও, পরে বিভিন্ন খাতে সেই অঙ্ক বেড়ে ১৭ হাজার ডলারে পৌঁছায় বলে বাতেন দাবি করেন। এখানেই শেষ নয়। একটি কাপড়ের দোকান কেনার নামে তার কাছ থেকে আরও ৩৩ হাজার ডলার নেওয়া হয়। বাতেনের ভাষ্যমতে, পরে তিনি জানতে পারেন দোকানটির প্রকৃত মূল্য এর চেয়ে অনেক কম ছিল। সব মিলিয়ে ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস পাওয়ার আশায় তিনি প্রায় ৫৯ হাজার ডলার হারিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত তার ইমিগ্রেশনের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়, আর সেই সঙ্গে তাকে হারাতে হয় জীবনের সঞ্চয়ও।
এক পর্যায়ে ভুক্তভোগীরা বুঝতে শুরু করেন যে তারা প্রতারণার শিকার। কেবল বাংলাদেশি নয়, রোহিঙ্গা, সেনেগালিজ এবং বার্মিজ নাগরিকরাও এম. এম. নুরুজ্জামান ও তার প্রতিষ্ঠান Zaaf Law & Immigration-এর বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে যখন বাফলোর রাস্তায় Zaaf Law & Immigration-এর সামনে বিক্ষোভ শুরু হয়, তখন অভিযোগ ওঠে যে প্রতিষ্ঠানটির সাইনবোর্ড ও পরিচিতির ভাষায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রতিবাদকারীদের বক্তব্য, আগে যেখানে “immigration advocate” জাতীয় পরিচয় ব্যবহার করা হতো, পরে সেখানে “form preparer” ধরনের সীমিত পরিচয় সামনে আনা হয়।
বাফেলোর মূলধারার মিডিয়ায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রচারিত হওয়ার পর নুরুজ্জামান সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেন, তিনি কাউকে কোনো মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেননি। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশে অবস্থান করছেন বলেও উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
Erie County District Attorney Michael Keane এর কার্যালয় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যারা প্রতারিত হয়েছেন তাদের স্ট্যাটাস যা-ই হোক না কেন, তাদের সুরক্ষা দেওয়া হবে। তিনি ভুক্তভোগীদের সরাসরি 716-858-2400 নম্বরে যোগাযোগ করতে বলেছেন।
তথ্যসূত্র:
WKBW (২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
WKBW (৪ মার্চ ২০২৬)
New York State Attorney General









