মার্কিন গণমাধ্যমে যুদ্ধকামী প্রবাসী ইরানিদের একতরফা প্রচারণা

তেহরান, ১৪ মার্চ – ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সংবাদ প্রচারে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো একটি সুনির্দিষ্ট কৌশল অবলম্বন করছে। তারা মূলত প্রবাসী ইরানিদের মধ্যে যারা প্রকাশ্যে যুদ্ধের পক্ষে, তাদের বক্তব্যকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এটি এখন মার্কিন গণমাধ্যমের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো প্রবাসী ইরানি এবং ইরানি বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের বক্তব্য ব্যাপকভাবে প্রচার করছে। এই ব্যক্তিরা স্থল অভিযানের মাধ্যমে ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করছেন। বিশেষত যারা নিজ দেশের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর প্রতি তীব্র ক্ষোভ পোষণ করেন, তাদের কণ্ঠস্বরই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তাদের মূল দাবি হলো, ইরানের বর্তমান সরকার অপরাধী এবং তাদের পতন অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ ইরানি বংশোদ্ভূত আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী কিয়ান তাজবাখশের কথা বলা যায়। তিনি অতীতে ইরানে রাজনৈতিক বন্দি ছিলেন এবং বারাক ওবামার পারমাণবিক চুক্তির আওতায় মুক্তি পেয়েছিলেন।
সম্প্রতি সিএনএনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি সরাসরি যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাজবাখশ দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো কোনো বৃহৎ শক্তির সহায়তা ছাড়া ইরানি জনগণ নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে সক্ষম হবেন না। তার মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করেননি, বরং তিনি ১৯৭৯ সালে ইরানের শুরু করা ৪৭ বছরের পুরনো একটি সংঘাতের অবসান ঘটাতে চান।
গণমাধ্যমে এমন বক্তব্য তাজবাখশকে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরলেও তার দাবির ঐতিহাসিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেগকে উৎখাত করার ইতিহাস এড়িয়ে গেছেন। তদুপরি তেহরানের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম সম্পূর্ণভাবে ইরানি জনগণের নিজস্ব বিষয়। আন্তর্জাতিক আইন বা মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী অন্য কোনো দেশকে এমন হস্তক্ষেপের অধিকার দেওয়া হয়নি।
তাজবাখশ ছাড়াও মাসিহ আলিনেজাদের মতো আরও অনেকের কণ্ঠস্বর মার্কিন গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রচার করা হচ্ছে। আলিনেজাদ সম্প্রতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বার্লিন প্রাচীরের উদাহরণ টেনে যুদ্ধবিরোধীদের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, একটি গোষ্ঠী শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ধারণার প্রতি অযৌক্তিক ভীতি পোষণ করে। অন্যদিকে ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাসক মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ছেলে রেজা পাহলভিও মার্কিন গণমাধ্যমে নিয়মিত উপস্থিত হচ্ছেন।
তার ব্যক্তিগত লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো এবং রাজতন্ত্রের পুনরুদ্ধার করা। তবে অনেক ইরানি তাকে পশ্চিমা হস্তক্ষেপের সমর্থক হিসেবেই বিবেচনা করেন। এইসব ব্যক্তিত্ব মূলত আমেরিকান দর্শকদের আবেগকে কাজে লাগাচ্ছেন। তারা এমন দর্শকদের লক্ষ্যবস্তু করেছেন যারা ইরানি জনগণের স্বাধীনতা চান কিন্তু সামগ্রিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে খুব বেশি অবগত নন।
গণমাধ্যমগুলো কোনো ধরনের বস্তুনিষ্ঠ যাচাই বাছাই ছাড়াই একতরফাভাবে এই বক্তব্যগুলো প্রচার করে পেশাদারি মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং দর্শকদের বিভ্রান্ত করছে। বাস্তবতা হলো যুদ্ধের পক্ষে প্রচারণা চালানো এই গোষ্ঠীটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র। ইরানের বেশিরভাগ নাগরিক এবং প্রবাসী ইরানিরা যুদ্ধের ঘোর বিরোধী। তারা মনে করেন, যুদ্ধের চূড়ান্ত মূল্য সাধারণ এবং নিরপরাধ মানুষকেই চোকাতে হয়।
তাছাড়া সামরিক সংঘাত কট্টরপন্থীদের আরও শক্তিশালী করবে এবং পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার ঘটাবে। গত ৬ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত শুরুর আগে ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিল সতর্ক করে একটি বিবৃতি দিয়েছিল। সেখানে বলা হয়, ইরানে হামলার জন্য চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধবিরোধী কণ্ঠস্বরগুলোকে কোণঠাসা করার চেষ্টা তীব্রতর হয়েছে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইরাক বা কিউবার ক্ষেত্রেও এমন ক্ষুদ্র অথচ সোচ্চার গোষ্ঠী শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পক্ষে ইন্ধন জুগিয়েছে। মার্কিন গণমাধ্যম ও শাসকশ্রেণি প্রায়ই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের দোহাই দিয়ে এমন একতরফা প্রচারণা চালায়, যার প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষের পক্ষে উপলব্ধি করা কঠিন।
এ এম/ ১৪ মার্চ ২০২৬









