সম্পাদকের পাতা

বিশ্বের সবচেয়ে বিস্ময়কর ও বৈচিত্র্যময় মুদ্রার গল্প

নজরুল মিন্টো

মানুষের হাতে থাকা একটি নোট আসলে কেবল লেনদেনের কাগজ নয়। তার গায়ে থাকে রাষ্ট্রের প্রতীক, শাসনের স্মৃতি, শিল্পীর কল্পনা, অর্থনীতির বাস্তবতা, আর মানুষের বিশ্বাসের অদৃশ্য ছাপ। কোথাও একটি নোট পকেটে থাকাই আর্থিক স্বস্তি ও মর্যাদার প্রতীক, আবার কোথাও সংখ্যার অঙ্ক এত বড় যে নোটের গায়ে ট্রিলিয়ন লেখা থাকলেও তা দিয়ে বাজারের সামান্য প্রয়োজনও মেটে না। তাই মুদ্রার কাহিনি শুধু অর্থনীতির হিসাব নয়, এটি সভ্যতার শক্তি, সংকট, অহংকার ও স্বপ্নেরও এক বিস্ময়কর আত্মজীবনী।

আর সেই কাহিনির শিকড় আমাদের নিয়ে যায় বহু দূরের অতীতে। প্রাচীনকালে কড়ি, তামা, এমনকি চামড়ার মুদ্রা দিয়েও বিনিময়ের প্রথা ছিল। তবে আধুনিক কাগুজে নোটের যাত্রা শুরু হয় চীনে, প্রায় এক হাজার বছর আগে। মজার বিষয় হলো, প্রথম যুগের কিছু নোট ছিল আকারে বেশ বড়, প্রায় এক ফুট লম্বা। সেগুলো বহনের জন্য দরকার হতো আলাদা থলে বা ঝোলা।

কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে সর্বোচ্চ প্রচলিত নোট ১০০ ডলার। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডেও সর্বোচ্চ নোট ১০০ ডলার। যুক্তরাজ্যে আবার সর্বোচ্চ নোট ৫০ পাউন্ড। কিন্তু ইউরোপের অন্য প্রান্তে কিংবা এশিয়ার নানা দেশে এই চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন। কোথাও একটি নোট দিয়ে আস্ত একটি গাড়ি কেনা যায়, আবার কোথাও এক বস্তা নোট দিয়ে এক হালি ডিম পাওয়াও দুষ্কর। সুইজারল্যান্ডের ১০০০ ফ্রাঁর নোট এখনও বিশ্বের অন্যতম উচ্চমূল্যের নিয়মিত ব্যাংকনোট। বেগুনি রঙের এই একটি নোটের মান ১,১০০ মার্কিন ডলারের বেশি এবং দেখতেও রাজকীয়। সিঙ্গাপুর ও ব্রুনাইতে এক সময় ১০,০০০ ডলারের নোট ছিল! তবে মানি লন্ডারিং রোধে ২০১৪ সাল থেকে সিঙ্গাপুর এটি ছাপানো বন্ধ করে দিয়েছে। উন্নত অনেক দেশে বড় অঙ্কের নোট না রাখার পেছনে মূল কারণ হলো ‘ক্রিমিনাল ইকোনমি’ নিয়ন্ত্রণ। অপরাধীরা যাতে ব্রিফকেস ভর্তি করে কোটি কোটি টাকা পাচার করতে না পারে, সেজন্যই বড় নোট তুলে দেওয়া হয়েছে।

মুদ্রাস্ফীতি যখন আকাশচুম্বী হয়, তখন মুদ্রার মান হয়ে পড়ে ধুলোর সমান। ২০০৮ সালে জিম্বাবুয়েতে ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারের নোট বের হয়েছিল। অথচ সেই নোট দিয়ে একবেলা পেট ভরে খাওয়াও যেত না। এটিই ইতিহাসের সবচেয়ে ‘বড়’ অথচ ‘মূল্যহীন’ নোট। ইতিহাসের সর্বোচ্চ অঙ্কের নোট ছিল হাঙ্গেরির ১০০ কুইন্টিলিয়ন (১-এর পরে ২০টি শূন্য) পেঙ্গো। বাংলাদেশে টাকার সর্বোচ্চ প্রচলিত নোট ১০০০ টাকা। ভারতে ২০০০ রুপি এবং পাকিস্তানে ৫০০০ রুপির নোট রয়েছে।

অনেক সংগ্রাহকের মতে, সুইজারল্যান্ডের নোট বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর। তবে সৌন্দর্য, রংবৈচিত্র্য ও ব্যবহারিক সুবিধার দিক থেকে কানাডিয়ান ডলার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ৫ ডলার (নীল), ১০ ডলার (বেগুনি), ২০ ডলার (সবুজ), ৫০ ডলার (লাল) এবং ১০০ ডলার (বাদামী) এর সংখ্যা না পড়েও রং দেখে বোঝা যায় কত টাকার নোট। কানাডিয়ান নোটের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো পলিমার বা প্লাস্টিকজাত উপাদানে তৈরি। তাই সহজে ছিঁড়ে যায় না, আর কাগজের নোটের তুলনায় বেশি পরিষ্কার থাকে। কানাডিয়ান নোট যেন একটু আধুনিক, একটু অহংকারী, আর অনেক বেশি সহনশীল।

বর্তমান পৃথিবী দ্রুত ডিজিটাল পেমেন্টের দিকে ঝুঁকে পড়লেও সঞ্চয়, জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার এবং মানসিক নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে নগদ অর্থের প্রতি মানুষের আস্থা এখনো কমে যায়নি। কার্ড, মোবাইল ওয়ালেট কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সির যুগেও হাতে কিছু নগদ রাখার অভ্যাস তাই পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।


Back to top button
🌐 Read in Your Language