হবিগঞ্জে তীব্র জ্বালানি সংকট: চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে তেল, চরম ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ

হবিগঞ্জ, ১৩ মার্চ – হবিগঞ্জ জেলার ফিলিং স্টেশনগুলোতে কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি তেল না পাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন বাস, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল এবং প্রাইভেট গাড়ির চালক ও যাত্রীরা। অভিযোগ উঠেছে যে জ্বালানি তেল মজুত করে খুচরা দোকানগুলোতে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল অতিরিক্ত দামে বিক্রি করা হচ্ছে।
জেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ও খুচরা দোকান ঘুরে দেখা যায় যে সরকার যানবাহনে জ্বালানি দেওয়ার নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দিলেও ফিলিং স্টেশন মালিকরা তা তোয়াক্কা করছেন না। খুচরা দোকানগুলোতে নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি লিটার তেলের জন্য ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। ভোক্তাদের অভিযোগ প্রশাসনের যথাযথ নজরদারি না থাকায় এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে জেলার সাধারণ মানুষ তীব্র ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
জানা গেছে যে হবিগঞ্জ জেলায় প্রতিদিন প্রায় এক লাখ ৯১ হাজার লিটার জ্বালানির ঘাটতি তৈরি হচ্ছে যা মোট চাহিদার প্রায় ৬৯ দশমিক ৪ শতাংশ। এই পরিস্থিতির কারণে পরিবহন চালক ও সাধারণ ভোক্তাদের মাঝে ব্যাপক অসন্তোষ বিরাজ করছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বর্তমানে জ্বালানি সরবরাহে একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী একটি মোটরসাইকেল দিনে সর্বোচ্চ ২ লিটার পেট্রোল বা অকটেন নিতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য এই সীমা ১০ লিটার নির্ধারণ করা হয়েছে এবং অন্যান্য যানবাহনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট পরিমাণ বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু ফিলিং স্টেশনগুলোতে এই নিয়ম মানা হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে যে নির্ধারিত সীমার চেয়েও অর্ধেক পরিমাণ তেল যানবাহনে দেওয়া হচ্ছে। হবিগঞ্জ জেলায় বর্তমানে মোট ১৯টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে বাহুবল উপজেলায় আটটি, মাধবপুর, চুনারুঘাট ও নবীগঞ্জে দুটি করে, শায়েস্তাগঞ্জ ও বানিয়াচংয়ে একটি করে এবং সদর উপজেলায় তিনটি ফিলিং স্টেশন রয়েছে।
চাহিদামতো তেল না পাওয়ায় বেশ কয়েকটি স্টেশনে চালক ও কর্মচারীদের মধ্যে প্রায়ই বাগবিতণ্ডার ঘটনা ঘটছে। সদর উপজেলার বাসিন্দা সমীরণ চত্রবর্তী জানান যে ব্যবসায়ীরা তেল বিক্রির নিয়ম মানছেন না এবং খুচরা দোকানে অতিরিক্ত দাম রাখায় জনভোগান্তি দিন দিন বাড়ছে। চুনারুঘাট উপজেলার শ্রীকুটা গ্রামের মনছুর আলী জানান যে প্রশাসনের তৎপরতা একেবারেই চোখে পড়ছে না এবং খুচরা দোকানগুলোতে দ্রুত অভিযান চালানো প্রয়োজন। অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতাদের দাবি তারা বেশি দামে তেল কিনছেন বলেই বেশি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
ফিলিং স্টেশন মালিকদের ভাষ্যমতে সরকার বিক্রির সীমা নির্ধারণ করলেও সরবরাহ কম থাকায় তারা কাঙ্ক্ষিত তেল দিতে পারছেন না। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী জেলার ১৯টি ফিলিং স্টেশনে প্রতিদিন অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেল মিলিয়ে মোট চাহিদা প্রায় দুই লাখ ৭৫ হাজার লিটার। তবে গত কয়েকদিন যাবত ডিপো থেকে চাহিদার মাত্র ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। তথ্যমতে জেলায় অকটেনের দৈনিক চাহিদা প্রায় ২৫ হাজার লিটার হলেও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র সাত হাজার লিটার। পেট্রোলের চাহিদা ৫০ হাজার লিটার হলেও সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২০ হাজার লিটার। পাশাপাশি ডিজেলের চাহিদা প্রায় দুই লাখ লিটার হলেও পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫৭ হাজার লিটার।
প্রতিদিন প্রায় ১৮ হাজার লিটার অকটেন, ৩০ হাজার লিটার পেট্রোল এবং এক লাখ ৪৩ হাজার লিটার ডিজেলের ঘাটতি এই সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে। হবিগঞ্জ জেলা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব মাহবুবুর রহমান চৌধুরী হেলাল জানান জেলার দুটি কূপ থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়।
তিনি দাবি করেন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সত্ত্বেও দেশে জ্বালানি উৎপাদন স্বাভাবিক রয়েছে কিন্তু রেশনিং পদ্ধতির কারণে সরবরাহে চাপ ও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফিন জানান প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কোনোভাবেই তেল বিক্রি করতে দেওয়া হবে না।
এ এম/ ১৩ মার্চ ২০২৬









