ইতিকাফের আধ্যাত্মিকতা ও বর্তমান সময়ের ডিজিটাল আসক্তি: একটি পর্যালোচনা

মসজিদ, ১২ মার্চ – ইতিকাফ এমন একটি বিশেষ ইবাদত যেখানে একজন মুমিন জাগতিক সব ব্যস্ততা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে স্রষ্টার স্মরণে নিমগ্ন হওয়ার চেষ্টা করেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা এই ইবাদতের কথা উল্লেখ করেছেন এবং এর কিছু মৌলিক বিধানও বর্ণনা করেছেন।
মুফাসসিরদের মতে কোরআনের আয়াতটি ইতিকাফের বৈধতা ও গুরুত্বের একটি স্পষ্ট দলিল। প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ইমাম কুরতুবি (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে আল্লাহ তাআলা ইতিকাফকে একটি স্বীকৃত ইবাদত হিসেবে মর্যাদা দিয়েছেন। ইতিকাফ ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) এর জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নাহ। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) এর বর্ণনা অনুযায়ী নবী (সা.) রমজানের শেষ দশক নিয়মিত ইতিকাফ করতেন এবং তাঁর ওফাত পর্যন্ত এই নিয়ম অব্যাহত ছিল।
পরবর্তীতে তাঁর সহধর্মিণীরাও ইতিকাফ পালন করতেন। বুখারি শরিফের হাদিস অনুযায়ী রমজানের শেষ দশক এলে নবী (সা.) বেশি বেশি ইবাদতের প্রস্তুতি নিতেন, রাত জেগে থাকতেন এবং পরিবার পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন। এই হাদিসগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে শেষ দশকের প্রতিটি মুহূর্ত তিনি আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য ব্যয় করতেন।
কারণ এই সময়েই রয়েছে লাইলাতুল কদরের মতো মহিমান্বিত রাত যাকে কোরআনে এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলা হয়েছে। এই মহিমান্বিত রাতের সন্ধানেই মূলত মুমিনরা মসজিদে ইতিকাফে বসেন। তবে বর্তমান সময়ের বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। আধুনিক বিশ্বে মানুষের সবচেয়ে বড় ব্যস্ততার জায়গা হয়ে উঠেছে ডিজিটাল জগৎ। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বার্তা আদান প্রদান এবং ভিডিওসহ নানা অনলাইন কার্যক্রমে মানুষের সময় ও মনোযোগ গভীরভাবে আটকে আছে। অনেক সময় মানুষ নিজের অজান্তেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা এসবের মধ্যে ডুবে থাকেন।
এই বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। ইতিকাফে বসেও যদি কেউ সার্বক্ষণিক মোবাইল ফোন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যস্ত থাকেন তবে ইতিকাফের মূল আধ্যাত্মিকতা কতটুকু অর্জিত হবে সেটি একটি বড় চিন্তার বিষয়। প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) এর মতে ইতিকাফের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো মানুষের অন্তরকে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর দিকে নিবিষ্ট করা। অর্থাৎ ইতিকাফের সময় মানুষের হৃদয় দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে মুক্ত হয়ে স্রষ্টামুখী হবে। কিন্তু সেই মূল্যবান সময়টি যদি ডিজিটাল বিভ্রান্তিতে নষ্ট হয় তবে ইতিকাফের মূল উদ্দেশ্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইমাম গাজালি (রহ.) মানুষের হৃদয়ের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন যে অন্তর সবসময় বিভিন্ন চিন্তা ও আকর্ষণে ব্যস্ত থাকে। যখন মানুষ একান্ত নির্জনতায় আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন হন তখনই হৃদয় পরিশুদ্ধ হতে শুরু করে। এ কারণেই ইতিকাফের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো নিভৃততা।
মসজিদের শান্ত পরিবেশে বসে কোরআন তিলাওয়াত করা, দীর্ঘ সময় সিজদায় থাকা এবং নিজের জীবনের ভুলগুলো স্মরণ করে ক্ষমা প্রার্থনা করাই ইতিকাফের প্রকৃত চিত্র। নির্জনতায় বসে জীবনের দিকে তাকালে মুমিন উপলব্ধি করতে পারেন কত সময় অবহেলায় নষ্ট হয়েছে। এই উপলব্ধি থেকে হৃদয় নরম হয় এবং মানুষ বিশুদ্ধ তাওবা করার সুযোগ পান। তাই ইতিকাফের এই গভীর আধ্যাত্মিক মুহূর্তগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যস্ততা বা মোবাইল স্ক্রিনের আলোয় কাটিয়ে দিলে মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হতে পারে।
ইতিকাফের দিনগুলোতে নিজেকে সব ধরনের ডিজিটাল ডিভাইস থেকে দূরে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করা উচিত। এ সময় সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় কাজ এবং জাগতিক চিন্তা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া জরুরি।
রমজানের শেষ দিনগুলোকে পরিপূর্ণভাবে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধনের জন্য উৎসর্গ করাই ইতিকাফকারীদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। ইতিকাফের এই পবিত্র সময়কে কোনোভাবেই প্রযুক্তিগত আসক্তির কারণে নষ্ট হতে দেওয়া উচিত নয়। একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হওয়ার মাধ্যমেই ইতিকাফের সার্থকতা নিহিত।
এ এম/ ১২ মার্চ ২০২৬


