যুদ্ধের মাঝেও চীনের কাছে ইরানের তেল বিক্রি অব্যাহত: ডার্ক ফ্লিটের রহস্য

তেহরান, ১২ মার্চ – গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে বিধ্বংসী সংঘাত শুরু হয়েছে। এই যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ ও সমুদ্রসীমা অত্যন্ত উত্তপ্ত থাকলেও তেহরানের তেল বাণিজ্য থেমে নেই। বিশেষ করে বেইজিংয়ের সাথে ইরানের জ্বালানি সম্পর্ক এখনো আগের মতোই সচল রয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক রুবেন এফ. জনসনের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কীভাবে ইরান তাদের ‘ডার্ক ফ্লিট’ বা রহস্যময় জাহাজ বহরের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালীর বাধা অতিক্রম করে চীনে তেল পাঠাতে সক্ষম হচ্ছে।
সরাসরি যুদ্ধের ময়দান থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে ইরান প্রায় এক কোটি বিশ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে পার করেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিপুল পরিমাণ তেলের প্রায় সবটুকুর গন্তব্য হিসেবে নথিপত্রে চীনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। যুদ্ধের কারণে যেখানে অন্যান্য দেশের জন্য এই নৌপথ ব্যবহার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে চীনের জাহাজগুলো এক ধরনের অলিখিত নিরাপত্তা বলয় নিয়ে যাতায়াত করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তেহরানের পক্ষ থেকে বারবার হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হলেও বিশেষজ্ঞরা একে একটি আত্মঘাতী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। কারণ ইরানের নিজস্ব আমদানি ও রপ্তানির বড় অংশই এই প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে খাদ্যশস্যের মতো জরুরি পণ্য আমদানিতে এই পথটি তাদের জন্য অপরিহার্য। ফলে ইরান যদি পুরোপুরি এই পথ বন্ধ করে দেয়, তবে তারা নিজেদের অর্থনীতিকে আরও গভীর সংকটে ঠেলে দেবে এবং বেইজিংয়ের মতো শক্তিশালী মিত্রকেও অসন্তুষ্ট করার ঝুঁকিতে পড়বে।
গোয়েন্দা তথ্য ও স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘ট্যাঙ্কার ট্র্যাকার্স’ জানিয়েছে, ধরা পড়া এড়াতে অনেক জাহাজ তাদের অবস্থান শনাক্তকারী যন্ত্র বা ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে দিয়ে অন্ধকারে চলাচল করছে। একেই বিশেষজ্ঞরা ছায়া বহর বলে অভিহিত করছেন। এই কৌশলের মাধ্যমে ইরান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক নজরদারি এড়িয়ে চীনের বন্দরে তেল পৌঁছে দিচ্ছে। তবে এই লুকোচুরির খেলায় গত কয়েক দিনে অন্তত দশটি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন।
সামরিক চাপের মুখে ইরান এখন তার তেল রপ্তানির কৌশলে কিছুটা পরিবর্তন এনেছে। দীর্ঘদিনের প্রধান তেল টার্মিনাল খার্গ আইল্যান্ড থেকে কার্যক্রম কমিয়ে তারা এখন ওমান উপসাগরের জাস্ক টার্মিনালকে বেশি ব্যবহার করছে। এই টার্মিনালটি কৌশলগতভাবে হরমুজ প্রণালীর বাইরে অবস্থিত হওয়ায় এখান থেকে তেল লোড করা কিছুটা নিরাপদ। সম্প্রতি একটি ইরানি জাহাজ এই জাস্ক টার্মিনাল থেকে প্রায় বিশ লাখ ব্যারেল তেল নিয়ে যাত্রা করেছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে এই বন্দরে বড় ধরনের তেলের চালানের একটি অন্যতম উদাহরণ।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের জ্বালানি চাহিদা মেটানোই এখন তেহরানের জন্য টিকে থাকার প্রধান অবলম্বন। ইরান জানে যে, চীনের অর্থনীতিকে তেলের যোগান দিয়ে সচল রাখতে পারলে বেইজিং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাদের পক্ষে শক্ত ঢাল হিসেবে কাজ করবে। অন্যদিকে চীনও এই উত্তাল সময়ে নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানের সাশ্রয়ী মূল্যের তেলের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই পারস্পরিক স্বার্থের কারণেই যুদ্ধের ভয়াবহতার মাঝেও সমুদ্রের এই গুরুত্বপূর্ণ পথটি বিচ্ছিন্ন হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক কমান্ডাররা পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন। মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরীগুলো আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরে মহড়া চালিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিলেও হরমুজ প্রণালীতে চীনের স্বার্থে আঘাত করা হবে একটি বড় কূটনৈতিক ঝুঁকি। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এই তেল বাণিজ্য নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করা হয়নি। তবে তারা যে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং নিজেদের তেলের যোগান নিশ্চিত করতে পর্দার আড়ালে কাজ করছে, তা অত্যন্ত স্পষ্ট।
রুবেন জনসনের এই বিশ্লেষণ স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয়, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ কেবল ভূখণ্ডের লড়াই নয়, এটি বিশ্ব রাজনীতির জটিল অর্থনৈতিক সমীকরণের অংশ। ইরান ও চীনের এই জ্বালানি সখ্যতা অপারেশন এপিক ফিউরির গতিপথ পাল্টে দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত এই তেলের বাণিজ্য কতদিন টিকে থাকে এবং ইরান কতক্ষণ এই সংকীর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনের বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ।
এস এম/ ১২ মার্চ ২০২৬









