সিলেট

হাকালুকি হাওরে বেড়েছে জলচর পাখির সংখ্যা, মিলল বিরল রাজহাঁসের দেখা

হাকালুকি হাওর, ৮ মার্চ – এশিয়ার বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি হিসেবে পরিচিত হাকালুকি হাওরে এবারের শুমারিতে গত বছরের তুলনায় জলচর পাখির সংখ্যা বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে। বিগত বছরগুলোর মতো এবার হাওরে বিষটোপ প্রয়োগ বা নিষিদ্ধ জালে আটকে পাখির মারা যাওয়ার ঘটনা তেমন নজরে আসেনি।

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব ও আইইউসিএন আয়োজিত দুই দিনব্যাপী পাখিশুমারি শেষে এসব তথ্য জানা গেছে। গত ৪ ও ৫ ফেব্রুয়ারি হাকালুকি হাওরের ৪৩টি বিলে এই শুমারি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এতে নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও বিশিষ্ট পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক। শুমারি কার্যক্রমে সহযোগিতা প্রদান করেছে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সিলেট।

এবারের শুমারিতে হাকালুকি হাওরে ৫৩ প্রজাতির মোট ৫৪ হাজার ৪৮৬টি জলচর পাখি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৮টি স্থানীয় এবং ৩৫টি পরিযায়ী প্রজাতির পাখি রয়েছে। গত বছর এই হাওরে ৬০ প্রজাতির মোট ৩৫ হাজার ২৬৮টি পাখি পাওয়া গিয়েছিল যা সংখ্যার বিচারে এবারের চেয়ে কম। বার্ড ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সরওয়ার আলম দীপু জানান যে এবার হাওরের চিনাউরা ও হাওরখালসহ কয়েকটি বিলের পরিবেশ তুলনামূলক ভালো ছিল এবং পানির পরিমাণও বেশি ছিল।

অন্য হাওরে পানি কমে যাওয়ায় পাখিগুলো হাকালুকিতে চলে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত বছরের শুমারিকালে নাগুয়া ও লরিবাই বিলে পাখি শিকারের জন্য পাতা প্রায় ১০০ মিটার লম্বা নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল পাওয়া গিয়েছিল এবং তাতে আটকে পড়া মৃত পাখিও উদ্ধার করা হয়েছিল।

পিংলা বিলের পাশে কার্বোটাফ নামক রাসায়নিক কীটনাশকের প্যাকেটও পাওয়া গিয়েছিল যা ধানের সঙ্গে মিশিয়ে পাখি নিধনে ব্যবহার করা হতো। তবে বার্ড ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক দাবি করেছেন যে এবার হাওরে সেই চিত্র দেখা যায়নি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ফলে শিকারিদের অপতৎপরতা হ্রাস পেয়েছে। বার্ড ক্লাব সূত্রে জানা যায় এবার হাকালুকি হাওরে একটি অত্যন্ত বিরল প্রজাতির সাদা কপাল রাজহাঁসের দেখা মিলেছে যা সারা দেশে গত ১০ থেকে ১২ বছরে মাত্র একবার দেখা যেত।

এছাড়া হাওরে এবার প্রথমবারের মতো ১৯৪টি রাজহাঁসের একটি দলের দেখা মিলেছে যা আগে কখনো দেখা যায়নি। উপকূলীয় অঞ্চলে সাধারণত যেসব সৈকত পাখি বা শোরবার্ড দেখা যায় এবার হাকালুকিতে সেসব প্রজাতির পাখির উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে জৌরালি ও লালপাসহ বিভিন্ন সৈকত পাখির সংখ্যা সাত হাজারের বেশি ছিল।

মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার পাঁচটি উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত এই হাওরকে ১৯৯৯ সালে সরকার প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা ইসিএ ঘোষণা করে। তবে দীর্ঘমেয়াদী পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে গত ২০ বছরে সারা দেশে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা ৩৫ শতাংশ এবং হাকালুকিতে ৪৫ শতাংশ কমেছে। পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক বলেন যে পাখির আবাসস্থল কমে যাওয়া এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সব দেশেই পাখির সংখ্যা কমছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে হাওরে মাছের উৎপাদন বাড়াতে এবং পাখির আবাসস্থল রক্ষা করতে হলে অভয়াশ্রম তৈরি করে পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হবে। কৃষি জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাছ ও পাখির প্রধান খাদ্য ফড়িং এবং অন্যান্য পোকামাকড় ধ্বংস হচ্ছে যা সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন জানিয়েছেন যে হাকালুকি হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন এবং পরিবেশ যাতে বিনষ্ট না হয় সে বিষয়ে প্রশাসন খোঁজখবর রাখছে।

এম ম/ ৮ মার্চ ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language