চীনের হুমকি মোকাবিলায় মার্কিন রণতরীর বিবর্তন ও ভবিষ্যৎ

ওয়াশিংটন, ৬ মার্চ – সমুদ্রবক্ষে মার্কিন সামরিক শক্তির প্রতীক হিসেবে কয়েক দশক ধরে দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করছে বিমানবাহী রণতরী বা এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার। বিদেশি কোনো ঘাঁটির সহায়তা ছাড়াই বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে আকাশপথে হামলা চালানোর সক্ষমতা এই বিশাল যুদ্ধজাহাজগুলোকে অদ্বিতীয় করে তুলেছে। তবে ২০২৬ সালের বর্তমান ভূ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই রণতরীগুলোর প্রাসঙ্গিকতা ও টিকে থাকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। বিশেষ করে চীনের মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর উত্থান এই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষক জ্যাক বাকবি তার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন যে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে বিমানবাহী রণতরীগুলো এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। এক সময় সমুদ্রের রাজা হিসেবে পরিচিত যুদ্ধজাহাজগুলো বা ব্যাটেলশিপ যেভাবে প্রযুক্তির বিবর্তনে হারিয়ে গিয়েছিল, বিমানবাহী রণতরীগুলোর পরিণতিও তেমন হবে কি না তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে। তবে মার্কিন নৌবাহিনী এখনই তাদের এই প্রধান শক্তিকে বাতিলের খাতায় ফেলতে নারাজ।
এই বিতর্কের মূল কারণ হলো চীনের অভাবনীয় সামরিক আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি। বেইজিং বর্তমানে ডিএফ ২১ডি এবং ডিএফ ২৬ এর মতো অত্যাধুনিক ক্যারিয়ার কিলার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে যা কয়েক হাজার মাইল দূর থেকেই চলন্ত রণতরীকে নিখুঁতভাবে আঘাত করতে সক্ষম। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাইপারসনিক অস্ত্র এবং উন্নত সাবমেরিন প্রযুক্তি। ফলে ১৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি ফোর্ড ক্লাস সুপারক্যারিয়ার এখন শত্রুপক্ষের জন্য অত্যন্ত দামী এবং সহজ লক্ষ্যে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই বিশাল বিনিয়োগের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। একটি সফল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কেবল কয়েক হাজার নৌসেনার প্রাণহানি ঘটাবে না বরং আমেরিকার কয়েক বছরের পরিশ্রম ও বিপুল অর্থ নিমেষেই ধ্বংস করে দেবে।
এই আর্থিক ও কৌশলগত ঝুঁকি সত্ত্বেও পেন্টাগন মনে করে যে বিমানবাহী রণতরী ছাড়া বৈশ্বিক আধিপত্য বজায় রাখা অসম্ভব। কারণ ভূমিভিত্তিক বোমারু বিমান বা একক ব্যবহারের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন। বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে মার্কিন নৌবাহিনী তাদের রণকৌশলে আমূল পরিবর্তন আনছে। এখন আর আগের মতো শত্রুর উপকূলের খুব কাছাকাছি রণতরী নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না বরং অনেক দূর থেকে যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা অর্জনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। মার্কিন রণতরীগুলো এখন আর কেবল বিমান বহনের মাধ্যম নয় বরং এগুলো পরিণত হচ্ছে একটি সমন্বিত কমান্ড হাবে। এই বিবর্তনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো এমকিউ ২৫ স্টিংগ্রে ড্রোন।
এটি মূলত একটি চালকবিহীন আকাশযান যা মাঝ আকাশে অন্যান্য যুদ্ধবিমানকে জ্বালানি সরবরাহ করতে পারে। একই সঙ্গে মার্কিন নেভি ষষ্ঠ প্রজন্মের এফ এ এক্সএক্স ফাইটার জেট তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এই অত্যাধুনিক বিমানগুলো স্টিলথ প্রযুক্তি এবং ড্রোন নিয়ন্ত্রণের বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন হবে। ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে বিমানবাহী রণতরীগুলো কেবল পাইলট চালিত বিমানের ওপর নির্ভর করবে না বরং এগুলো হবে ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের একটি ভ্রাম্যমাণ লঞ্চিং প্যাড। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এটি এখন নিজেকে একটি নতুন রূপে সাজিয়ে নিচ্ছে এবং চীনের নৌ প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেদ করতে এই রণতরীগুলোই হবে আমেরিকার প্রধান হাতিয়ার।
এস এম/ ৬ মার্চ ২০২৬









