সম্পাদকের পাতা

টরন্টোর তিন বাংলাদেশির ৩৬০ হাজার ডলারের জালিয়াতি

নজরুল মিন্টো

কানাডায় অভিবাসী বাংলাদেশিদের রয়েছে কয়েক দশকের এক উজ্জ্বল ইতিহাস। সততা, কঠোর পরিশ্রম আর মেধা দিয়ে অনেকেই এখানে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বিচ্ছিন্ন অপরাধের ঘটনায় বাংলাদেশি নাম জড়িয়ে পড়ায় কমিউনিটির ভাবমূর্তি নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। কখনো রিয়েল এস্টেট জালিয়াতি, কখনো আইনজীবীদের পেশাগত প্রতারণা, আবার কখনো গ্রোসারি বা রেস্তোরাঁ ব্যবসার আড়ালে অনৈতিক লেনদেনের সংবাদ প্রায়ই মূলধারার মিডিয়ায় শিরোনাম হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার যুক্ত হলো মারখাম শহরের একটি স্বনামধন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ৩৬০,০০০ ডলারের এক আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ।

কানাডার CityNews, CTV News ও CP24 টেলিভিশন চ্যানেলে সম্প্রতি প্রচারিত এক প্রতিবেদনে টরন্টো এবং আশপাশের এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে টরন্টোতে বসবাসরত বিশাল বাংলাদেশি কমিউনিটির মাঝে এই খবরটি এখন ‘টক অব দ্য টাউন’। ইয়র্ক রিজিওনাল পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এটি কোনো তাৎক্ষণিক ভুল নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় এক পরিকল্পিত জালিয়াতির অভিযোগ।

এই চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির কেন্দ্রে রয়েছেন ৩৬ বছর বয়সী বাংলাদেশি অভিবাসী জেনিফার হোসেন। টরন্টোয় বসবাসরত জেনিফার ওই ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানে সিনিয়র ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার সহযোগী হিসেবে নাম এসেছে ৪২ বছর বয়সী ফয়সল আহমেদ এবং ৬৪ বছর বয়সী ফরিদা আক্তার-এর। জানা গেছে, এ দু’জনও বাংলাদেশি অভিবাসী এবং তারাও টরন্টোতে বসবাস করেন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত একটি ‘ইনভয়েস ফ্রড’ বা বিল জালিয়াতি। ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি থেকে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা প্রায় নয় মাস ধরে জেনিফার হোসেন এবং তার দুই সহযোগীর বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটি থেকে উল্লেখিত অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

পুলিশ জানায়, সিনিয়র ম্যানেজার হিসেবে অর্থ অনুমোদনের ক্ষমতা ব্যবহার করে জেনিফার হোসেন ভুয়া ইনভয়েস তৈরি করতেন এবং সেই অর্থ ফয়সল আহমেদ ও ফরিদা আক্তারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাগুজে প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে ট্র্যান্সফার করতেন। পরে তারা ওই অর্থ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতেন। এভাবে প্রায় নয় মাসে ধাপে ধাপে প্রতিষ্ঠানটি থেকে ৩৬০,০০০ ডলারের বেশি অর্থ সরানোর অভিযোগ উঠেছে।

সব অপরাধীর মতোই অবশেষে জেনিফার হোসেনের মুখোশ উন্মোচিত হলো। সম্প্রতি জেনিফার হোসেন চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ অডিট টিম হিসাব পর্যালোচনা করে দেখতে পায়, একাধিক খাতে এমন ব্যয় দেখানো হয়েছে যার কোনো বাস্তব প্রমাণ মেলে না। অডিটের পর্যবেক্ষণগুলো মিলিয়ে সন্দেহ ঘনীভূত হলে মালিকপক্ষ বুঝতে পারে, প্রতিষ্ঠানটি পরিকল্পিত আর্থিক প্রতারণার শিকার হয়েছে। এরপর প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দায়ের করলে ইয়র্ক রিজিওনাল পুলিশ তাদের ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের মাধ্যমে তদন্ত শুরু করে।

তদন্তে দেখা যায়, অনুমোদিত অধিকাংশ বিলই ছিল ভুয়া এবং অর্থগুলো নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও অ্যাকাউন্টে যাচ্ছিল। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে টরন্টো এলাকা থেকে জেনিফার হোসেন, ফয়সল আহমেদ এবং ফরিদা আক্তারকে গ্রেপ্তার করে।

জেনিফার হোসেনের বিরুদ্ধে দুই দফায় ৫,০০০ ডলারের বেশি জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি অপরাধলব্ধ সম্পদ দখলে রাখা এবং অপরাধলব্ধ অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে বৈধ দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। কানাডীয় আইন অনুযায়ী, ৫,০০০ ডলারের বেশি জালিয়াতির সর্বোচ্চ সাজা ১৪ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

ফয়সল আহমেদ ও ফরিদা আক্তারের বিরুদ্ধে জালিয়াতি এবং অপরাধলব্ধ অর্থ দখলে রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদেরও কারাদণ্ড এবং আর্থিক জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে।

ইয়র্ক রিজিওনাল পুলিশ জেনিফার হোসেনের ছবি জনসম্মুখে প্রকাশ করেছে। তদন্তকারীদের ধারণা, তিনি অতীতেও অন্য কোথাও একই ধরনের পদ্ধতিতে জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। পুলিশ অনুরোধ করেছে, কোনো নিয়োগকর্তা যদি আগে তাকে নিয়োগ দিয়ে থাকেন এবং আর্থিক লেনদেনে সন্দেহজনক কিছু লক্ষ্য করেন, তবে যেন তথ্যসহ পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

কানাডায় বাংলাদেশিদের কষ্টার্জিত সুনাম আজ এ ধরনের গুটিকতক অপরাধীর কারণে বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে। মূলধারার মিডিয়ায় যখন বাংলাদেশি নাম বড় অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে আসে, তখন কমিউনিটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এবং অন্যান্য ভাষাভাষীদের কাছে সাধারণ বাংলাদেশিদের প্রতি অযৌক্তিক সন্দেহও তৈরি হয়। কানাডার মাটিতে উন্নত জীবন গড়ার স্বপ্ন নিয়ে এসে যারা জালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছেন, তারা শুধু নিজেদের ভবিষ্যৎই ধ্বংস করছেন না, বরং পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটির ভাবমূর্তিতে এক গভীর কালিমা লেপন করছেন। একই সঙ্গে কানাডায় বাংলাদেশি পেশাদারদের প্রতি আস্থার সংকটও তৈরি হচ্ছে। এই আস্থার সংকট কাটিয়ে ওঠা এখন আমাদের সকলের জন্যই এক বড় চ্যালেঞ্জ।

তথ্যসূত্র:
CityNews (৩ মার্চ ২০২৬)
CP24 (৩ মার্চ ২০২৬)
CTV News (৩ মার্চ ২০২৬)
York Regional Police News Release (৩ মার্চ ২০২৬)


Back to top button
🌐 Read in Your Language