রাশিয়ায় চাকরির প্রলোভনে যুদ্ধদাস বানানো হচ্ছে বাংলাদেশি তরুণদের

মস্কো, ৪ মার্চ – উচ্চ বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে এবং বেসামরিক চাকরির কথা বলে বাংলাদেশি তরুণদের রাশিয়ায় পাচার করছে একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচার চক্র। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে মারণাস্ত্র এবং জোরপূর্বক পাঠানো হচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখভাগে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ফর্টিফাই রাইটস ও ট্রুথ হাউন্ডসের এক সাম্প্রতিক যৌথ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল কিন্তু শারীরিকভাবে সক্ষম পুরুষদের লক্ষ্যবস্তু করছে এই চক্রটি।
মানবাধিকার সংগঠন দুটির প্রকাশিত ৬২ পৃষ্ঠার এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে জনবল সংগ্রহ করে রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে সরবরাহ করা হচ্ছে। দালালচক্র প্রথমে ভুয়া বা বেসামরিক কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভুক্তভোগীদের রাশিয়ায় নিয়ে যায়। এরপর রুশ ভাষায় লেখা চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়, যা অধিকাংশ ভুক্তভোগী পড়তেই পারেন না। পরবর্তীতে তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে বা সরাসরি তাদের রুশ সামরিক ঘাঁটিতে স্থানান্তর করা হয় এবং সেখান থেকে ইউক্রেনের রণাঙ্গনে ঠেলে দেওয়া হয়।
বেঁচে ফেরা ভুক্তভোগীদের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে অমানবিক নির্যাতনের চিত্র। মাকসুদুর রহমান নামের এক ভুক্তভোগী জানান, তিনি অর্থনৈতিক চাপের কারণে দালালদের কথায় বিশ্বাস করেছিলেন। তাকে বলা হয়েছিল সামরিক যুদ্ধের সঙ্গে তার কাজের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। কিন্তু মস্কো পৌঁছানোর পর তার কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয় এবং পরে জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে যুক্ত করা হয়। প্রতিবাদ করলে তাদের ওপর চালানো হয় নির্যাতন এবং জানানো হয় যে তাদের যুদ্ধের জন্য ‘ক্রয়’ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই এই তরুণদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে। অনেকে স্থলমাইন ও ড্রোন হামলায় আহত হয়েছেন, কেউবা নিহত হয়েছেন। তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং পালানোর চেষ্টা করলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। রাজবাড়ীর আরমান মণ্ডল এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক তরুণের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দালালরা তাদের সঙ্গে চরম প্রতারণা করেছে। অনেক পরিবার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে তাদের সন্তানদের বিদেশ পাঠিয়ে এখন নিঃস্ব।
ফর্টিফাই রাইটস ও ট্রুথ হাউন্ডস এই ঘটনাকে স্পষ্টতই মানবপাচার হিসেবে অভিহিত করেছে। তারা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন এই পাচারচক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। সংগঠন দুটির মতে, এটি কোনো সাধারণ অভিবাসন নয় বরং পদ্ধতিগত শোষণ। আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন করে রাশিয়া ভিনদেশি নাগরিকদের তাদের যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহলের পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এস এম/ ৪ মার্চ ২০২৬









