খামেনি হত্যায় মোদির নীরবতার কড়া সমালোচনা করলেন সোনিয়া গান্ধী

নয়াদিল্লি, ৩ মার্চ – যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নীরবতার কড়া সমালোচনা করেছেন কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। মঙ্গলবার সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি এই সমালোচনা করেন।
সোনিয়া গান্ধী লিখেছেন, আন্তর্জাতিক আলোচনা চলাকালীন কোনো ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করা সমসাময়িক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে একটি গভীর ও গুরুতর ফাটল। খামেনির মৃত্যু এবং ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর আক্রমণের ঘটনায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনো কোনো শোক প্রকাশ বা সামরিক হামলার নিন্দা জানাননি। এই নীরবতার সমালোচনা করতে গিয়ে সোনিয়া গান্ধী ১৯৯৪ সালের একটি ঐতিহাসিক ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
সে বছর পাকিস্তান কাশ্মীর প্রশ্নে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনে ভারতের বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনার উদ্যোগ নিয়েছিল। ইসলামি সহযোগিতা সংস্থাকে জোটবদ্ধ করে এই প্রস্তাব পাসের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সে সময় ইরান ভারতের পাশে দাঁড়িয়ে সেই উদ্যোগ বানচাল করে দেয়। কাশ্মীর সমস্যার আন্তর্জাতিকীকরণ ঠেকাতে ইরানের সেই ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সোনিয়া গান্ধী বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, সেই ইরানের রাষ্ট্রপ্রধানের হত্যার নিন্দার পাশাপাশি ভারতের প্রধানমন্ত্রী এখনো শোক পর্যন্ত জ্ঞাপন করেননি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে তুলে ধরা ভারত যদি কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন বিনা প্রতিবাদে মেনে নেয়, তবে অন্যদের কাছে তারা বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। ১৯৯৪ সালে ভারতীয় কূটনীতির সেই সাফল্যের পেছনে ছিল এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস। তার ঠিক আগের বছর দ্বিতীয়বারের মতো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন বেনজির ভুট্টো। তিনি উদ্যোগী হয়েছিলেন কাশ্মীর নিয়ে একটি প্রস্তাব জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনে পেশ করার।
প্রস্তাবটি পাস হলে কাশ্মীর সমস্যা নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠত। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পিভি নরসিমা রাও বুঝতে পেরেছিলেন যে, ইরান রাজি না হলে সর্বসম্মতির অভাবে ওআইসি প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারবে না। অসুস্থ শরীর নিয়ে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীনেশ সিং সবার অলক্ষ্যে কয়েক ঘণ্টার জন্য তেহরান সফর করেছিলেন। তীব্র ঠান্ডার মধ্যে দীনেশ সিংকে স্ট্রেচারে করে বিশেষ বিমানে তেহরানে নিয়ে যাওয়া হয়। তেহরান বিমানবন্দরে প্রটোকল ভেঙে তাকে স্বাগত জানান ইরানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলী আকবর বেলায়েতি।
দীনেশ সিং প্রেসিডেন্ট আকবর হাশেমি রাফসানজানির হাতে প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের ব্যক্তিগত অনুরোধপত্র তুলে দেন। পরবর্তীতে ওআইসির প্রস্তাব পেশের সময় ইরান বাধা দেয়। তারা জানায়, ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশই তাদের বন্ধু এবং বিবাদের মীমাংসা নিজেদের আলোচনার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। এতে পাকিস্তানের প্রস্তাবটি আটকে যায়। নরসিমা রাও তখন রাষ্ট্রীয় স্বার্থে রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে জাতিসংঘে বিরোধী দল বিজেপির শীর্ষ নেতা অটল বিহারি বাজপেয়ীকে ভারতীয় প্রতিনিধিদলের নেতা করে পাঠিয়েছিলেন। দলে ছিলেন ফারুক আবদুল্লাহ, যিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন যে, কাশ্মীরে আসতে হলে তার মৃতদেহ পেরিয়ে আসতে হবে।
সোনিয়া গান্ধী তার নিবন্ধে উল্লেখ করেন, ইরান সেদিন ভারতকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল এবং পাকিস্তান প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল। আজকের ইরান থেকে ভারতের এভাবে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া তাকে বিস্মিত করেছে বলে তিনি জানান। সোনিয়া বলেন, নীরবতার অর্থ দায়িত্ব এড়ানো, অথচ ভারত বিশ্ব বিবেকের কণ্ঠস্বর হতে চেয়েছিল।
এসএএস/ ৩ মার্চ ২০২৬









