মধ্যপ্রাচ্য

ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে আক্রান্ত দোহা ও দুবাই: উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতায় বড় আঘাত

দোহা, ২ মার্চ – উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য নিজেদের শহরের বুকে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা কিংবা আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের ধোঁয়া দেখা একসময় ছিল প্রায় অকল্পনীয় অভিজ্ঞতা। তবে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাতের নতুন পর্যায়ে দোহা, দুবাই ও মানামায় আঘাত হানার পর সেই কঠিন বাস্তবতাই এখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে যে এসব দেশ কি সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে নাকি শেষ পর্যন্ত সংযমের পথই বেছে নেবে। গতকাল ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে কেঁপে ওঠে দোহা, দুবাই ও মানামা।

এতে কেবল কাঁচ বা কংক্রিটই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বরং ভেঙে পড়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোর দীর্ঘদিনের স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তিও। বিশ্লেষকদের মতে দেশগুলো এখন এক কঠিন সংকটের মুখোমুখি। পাল্টা আঘাত করে তারা ইসরায়েলের পক্ষে যুদ্ধের অংশীদার হবে নাকি নিজেদের শহরে আগুন জ্বলতে দেখেও নিষ্ক্রিয় থাকবে তা এখন বড় প্রশ্ন। নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি আবুধাবির অধ্যাপক মনিকা মার্কস আল জাজিরাকে জানান যে মানামা, দোহা বা দুবাইয়ে বোমা পড়ার ঘটনা এখানকার মানুষের কাছে ঠিক ততটাই অবিশ্বাস্য যতটা অবিশ্বাস্য আমেরিকানদের কাছে সিয়াটল বা মিয়ামিতে বোমা পড়ার ঘটনা।

শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানের পাল্টা জবাব হিসেবে ইরান এই আক্রমণ পরিচালনা করে। উল্লেখ্য যে ওই যৌথ অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন এবং অন্তত ১৪৮ জন প্রাণ হারান। এর প্রতিশোধ নিতে ইরান ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে। এই হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৮ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া দুবাই বিমানবন্দর, মানামার বহুতল ভবন এবং কুয়েত বিমানবন্দরেও ক্ষেপণাস্ত্র বা এর ধ্বংসাবশেষ আঘাত হানে। রিয়াদ ও দোহার আকাশেও ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে।

উপসাগরীয় দেশগুলো শুরু থেকেই এই সংঘাত এড়াতে চেয়েছিল। হামলার আগের কয়েক সপ্তাহ ধরে ওমান ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ মধ্যস্থতার চেষ্টা করছিল। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল বুসাইদি জানিয়েছিলেন যে শান্তি আলোচনার পথ সুগম ছিল কারণ ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরু করে পরিস্থিতি বদলে দেয়। অধ্যাপক মনিকা মার্কস বলেন যে উপসাগরীয় দেশগুলো এই যুদ্ধকে ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসতে দেখেছে এবং তা ঠেকাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। তারা আশঙ্কা করেছিল যে কোণঠাঁসা ইরান পরাজয় মেনে নেওয়ার চেয়ে প্রতিবেশীদের জিম্মি করার পথ বেছে নিতে পারে।

কিংস কলেজ লন্ডনের লেকচারার রব গেস্ট পিনফোল্ড মনে করেন উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো তাদের বৈধতা রক্ষা করা। ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো তাদের জন্য মানহানিকর হতে পারে আবার হাত গুটিয়ে বসে থাকাও সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। দুই বিশ্লেষকই মনে করেন যে উপসাগরীয় দেশগুলো শেষ পর্যন্ত পদক্ষেপ নিতে পারে তবে তা হবে তাদের নিজেদের শর্তে। রব গেস্ট পিনফোল্ডের মতে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে আকাশসীমা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার বদলে তারা পেনিনসুলা শিল্ড ফোর্সের মতো নিজস্ব যৌথ বাহিনীর মাধ্যমে অভিযান চালাতে পারে।

এতে তারা প্রমাণ করতে পারবে যে তারা কারও অনুসারী নয় বরং নিজেদের নিরাপত্তায় নিজেরাই নেতৃত্ব দিচ্ছে। উপসাগরীয় নেতাদের অন্যতম বড় উদ্বেগ হলো তাদের অবকাঠামো। মনিকা মার্কস সতর্ক করে বলেন যে বিদ্যুৎ গ্রিড বা পানি শোধন কেন্দ্রে আঘাত লাগলে পরিস্থিতি দুঃস্বপ্নে রূপ নিতে পারে। প্রচণ্ড গরমে এসি ও বিশুদ্ধ পানি ছাড়া মরুভূমির এই দেশগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে এবং পর্যটন ও বিনিয়োগ বড় ধাক্কা খাবে। এত দিন উপসাগরীয় দেশগুলো হুতি বা হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল কিন্তু এখন তারা সরাসরি রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। গত সেপ্টেম্বরে কাতারে হামাস নেতাকে হত্যার পর অনেকেই ইসরায়েলকে বড় হুমকি মনে করতে শুরু করেছিল তবে ইরানের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আঞ্চলিক হিসাব নতুন করে বদলে দিয়েছে। আকাশচুম্বী অট্টালিকায় ক্ষেপণাস্ত্রের দাগ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে নিরাপদ দূরত্বে থাকার সুযোগ দ্রুত শেষ হয়ে আসছে।

এস এম/ ২ মার্চ ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language