সম্পাদকের পাতা

পোশাকে রুচির গোপন জ্যামিতি বিসপোকের গল্প

নজরুল মিন্টো

মানুষের জীবন এক অসমাপ্ত ক্যানভাস; প্রতিদিনই আমরা নিজস্ব রঙে আঁকি ভিন্ন ভিন্ন ছবি। শিল্পীর মতোই তুলির টানে স্বপ্নের জগৎ গড়ে তুলি, তেমনি নিজের দেহ–মন ও জীবনকে সাজাই পছন্দের ঢঙে। কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পোশাক বা গৃহসজ্জা ছিল একরকম ছাঁচে বাঁধা; কারখানার মেশিনে তৈরি, সবার জন্য একই মাপের, একই রঙের। অথচ মানুষের স্বপ্ন তো একেকজনের আলাদা! সেখানেই জন্ম নিল এক বিশেষ ধারণা, “Bespoke”, অর্থাৎ একান্ত নিজের জন্য তৈরি একান্ত নিজস্ব জিনিস।

আশির দশকের কোনো এক সময় কানাডার The Globe and Mail পত্রিকার এক পূর্ণ পৃষ্ঠা বিজ্ঞাপনে আমার চোখ আটকে যায়। এটি ছিল একটি স্যুটের প্রচার। “Bespoke” শব্দটা যেন হঠাৎ করেই আমার জীবনে প্রবেশ করল। একজন দর্জি একখানা স্যুটের জন্য এক লক্ষ ডলারের বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন, এমন দৃশ্য আমাকে যেমন বিস্মিত করল তেমনি কৌতূহলীও করে তুলল।

পরে সুযোগ হলো সেই দর্জির সঙ্গে সাক্ষাতের। জানতে পারলাম তিনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত, তবে স্থায়ীভাবে থাকেন হংকংয়ে। তাঁদের পরিবার প্রজন্ম ধরে এই পেশায়। বছরে কয়েকবার তিনি টরন্টোতে এসে কোনো পাঁচতারকা হোটেলে অস্থায়ী স্টুডিও খুলে বসেন। সেখানে গ্রাহকের দেহের প্রতিটি রেখা ও ভাঁজ মেপে নেন, কাপড়ের স্যাম্পল বই খুলে ধরেন, গ্রাহক বেছে নেন পছন্দের ফ্যাব্রিক। এরপর তিনি হংকংয়ে ফিরে গিয়ে শুরু করেন নিখুঁত সেলাইয়ের কাজ। কয়েক সপ্তাহ পর স্যুটটি নিয়ে উড়ে আসেন। প্রথমে ট্রায়াল হয়, সব মিললে ফাইনাল ফিটিং ও ডেলিভারি।

এরপর আরও একজনের সঙ্গে দেখা হলো। তিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত, পেশায় টেইলার, তিনিও থাকেন হংকংয়ে, তবে টরন্টো শহরে তাঁর একটি স্টুডিও আছে। জানালেন, তাঁর ক্লায়েন্টদের বেশিরভাগই কর্পোরেট দুনিয়ার শীর্ষ কর্মকর্তা। নিজেকে আলাদা করে তুলতেই তারা এই ব্যয়বহুল পোশাক পছন্দ করেন। তাঁদের পোশাকে তাই ব্যক্তিত্বের ছাপ সেলাই করা থাকে।

শুধু স্যুট নয়, এই পৃথিবীতে বিসপোক ধারণা ছড়িয়ে গেছে নানা জিনিসে। একবার এক ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা। তাঁর চোখে ছিল এক অদ্ভুত সৌন্দর্য, কারণ তিনি যে চশমাটি পরেছেন তা কোনো সাধারণ দোকানের নয়। সেটি নিউ ইয়র্কের এক বিশেষ ডিজাইনারের কাছে গিয়ে তাঁর মুখের গড়নের সঙ্গে মিলিয়ে বানানো। দাম প্রায় ৩,০০০ ডলার। তাঁর আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিমা বুঝিয়ে দিল, এই চশমা কেবল দৃষ্টি সংশোধনের যন্ত্র নয়, বরং এক ধরনের আভিজাত্যের পরিচয়।

আমার এক কলকাতার বন্ধু একদিন কথায় কথায় জানালেন, তাঁর শহরের এক প্রখ্যাত সংবাদপত্র সম্পাদক প্রতিদিন যে জুতো পরে বের হন সেটি লন্ডনের এক নির্দিষ্ট দোকানে তৈরি করা একটি bespoke জুতো। ওই জুতোর দাম ন্যূনতম ৫,০০০ পাউন্ড। তিনি যখন হাঁটেন, তখন তাঁর পদক্ষেপে শুধু শব্দ হয় না, সঙ্গে বয়ে যায় এক ধরনের মর্যাদার সুর।

“Bespoke” শব্দটি এসেছে ইংরেজি bespeak শব্দ থেকে, যার অর্থ আগেই বলা বা অর্ডার দেওয়া। ১৬শ শতাব্দী থেকেই এই শব্দ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। লন্ডনের বিখ্যাত স্যাভিল রো, যা আজও বিশ্বের সেরা দর্জিদের ঠিকানা, সেখান থেকেই মূলত “Bespoke Tailoring” ধারণার সূচনা।

রাজপরিবারের জমকালো আনুষ্ঠানিকতা থেকে শুরু করে পার্লামেন্টের গম্ভীর করিডোর, সর্বত্র বিসপোক দৃশ্যমান, এক ধরনের প্রোটোকল। যেন মানুষ বলছে, আমি ভিড়ের অংশ নই, আমি নিজের মাপে আঁকা একক মানচিত্র। আজকাল শুধু স্যুট নয়, জুতো, শার্ট, চশমা, ব্যাগ, এমনকি শাড়ি ও গহনার জগতেও বিসপোক এক বিশেষ ধারা হয়ে উঠেছে।

একটি ক্লাসিক বিসপোক স্যুটের জন্য উত্তর আমেরিকায় সাধারণত ৩,০০০ ডলার থেকে ৮,০০০ ডলার ব্যয় করা হয়। কারও কারও ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ১০,০০০ থেকে ১২,০০০ ডলারে গিয়েও থামে না, বিশেষত হাতে সেলাই, আর দুর্লভ উল হলে।

একেকটি শার্ট, কলার রোল, প্ল্যাকেট, গাসেট এবং হাতে বসানো বোতামসহ, সব মিলিয়ে দাম সাধারণত ২০০ থেকে ৪০০ ডলার।

জুতোর কথা আলাদা করে বলতে হয়। ইংল্যান্ড ও ইতালির ঐতিহ্যবাহী কর্মশালার কারিগরেরা এক জোড়া জুতো বানাতে দীর্ঘ সময় নেন। মাপ নেওয়া, পায়ের ছাঁচ (লাস্ট) খোদাই, একাধিকবার ফিটিং এবং প্যাটিনা দেওয়াসহ কয়েকটি ধাপ পার হতে হয়। দাম সাধারণত শুরু প্রায় ১,০০০ ডলার থেকে। বিশেষ চামড়া ও হাতে পালিশ হলে ১০,০০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।

শিল্পী, সংগীতজ্ঞ, টিভি অভিনেতা বা জনমুখী রাজনীতিকের কাছে বিষয়টি রঙিন। রেড কার্পেটের আলো, ক্যামেরার অ্যাপারচার এবং দর্শকের দৃষ্টি, সবকিছুর সঙ্গে তাল মিলাতে তারা খোঁজেন এমন পোশাক যা শরীরে সবচেয়ে নির্ভুলভাবে বসে, এমন জুতো যার শব্দে তাল থাকে, এমন চশমা যার ছায়া মুখে বুদ্ধিমত্তার আভা ফেলে।

কেউ কেউ বলবেন, এ কেবল বিলাস। কিন্তু বিলাসও কখনও কখনও জীবনচর্যা, যেখানে মানুষ নিজের ভিতরের ছায়াকে বাইরে প্রকাশ করে। যেখানে ভিড়ের ভিতরেও দাঁড়িয়ে বলা যায়, “এটি আমার, একান্ত আমার।”


Back to top button
🌐 Read in Your Language