নানা বিতর্ক ও অভিযোগের মুখে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বিদায়

ঢাকা, ২৬ ফেব্রুয়ারি – দেশের অর্থনীতিতে শুদ্ধি অভিযানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত নানামুখী বিতর্ক ও অভিযোগের বোঝা মাথায় নিয়ে বিদায় নিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। অর্থনীতির আকাশে আশার সঞ্চার করে তিনি পুঁজিবাজার, ব্যাংকিং খাত এবং বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর অনিয়ম ও অর্থপাচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করেছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশনায় দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ১১টি যৌথ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু দেড় বছর অতিক্রান্ত হলেও কোনো দৃশ্যমান ফলাফল বা অর্থপাচারের প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি এসব কমিটি। বরং এই দীর্ঘ সময়ে তদন্তের নামে সৃষ্ট অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা তলানিতে ঠেকেছে এবং পুঁজিবাজারে স্থবিরতা নেমে এসেছে।
বিদায়ের মুহূর্তে সাবেক এই গভর্নরের বিরুদ্ধে দুবাইয়ে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর তিনি তাঁর মেয়ে মেহরিন সারা মনসুরের নামে দুবাইয়ের অভিজাত আল জাদ্দাফ এলাকায় প্রায় ৪৫ কোটি টাকা মূল্যে একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এই অভিযোগটি সামনে আনেন। যদিও ড. মনসুর এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, কিন্তু দুবাই ল্যান্ড ডিপার্টমেন্টের নথিপত্রে মালিকানায় তাঁর ও তাঁর মেয়ের নাম থাকার বিষয়টি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এছাড়া দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র ১৪ মাসে ১৪ বার বিদেশ সফর এবং বিদেশে ১০০ দিন কাটানো নিয়েও ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় তাঁর নেওয়া পদক্ষেপগুলো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে উন্নীত করার ফলে ঋণের সুদহার ১৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, যা শিল্প ও ব্যবসা খাতের জন্য চরম সংকট বয়ে আনে। অথচ এত কড়াকড়ির পরেও মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নামেনি। উল্টো কঠোর নজরদারির নামে ব্যবসায়িক পরিবেশে ভীতি সঞ্চার করায় নতুন বিনিয়োগে ভাটা পড়েছে। সমালোচকরা বলছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক ফল বয়ে এনেছে।
গভর্নরের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের অভিযোগও কম নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বা বিএফআইইউ থেকে স্পর্শকাতর তথ্য নিয়মবহির্ভূতভাবে সংগ্রহ করে একটি বিশেষ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জব্দকৃত ব্যাংক হিসাব সচলের তদবির বাণিজ্য করা হয়েছে। এছাড়া ব্যয় সংকোচন নীতি উপেক্ষা করে প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের বিলাসবহুল গাড়ি কেনার অভিযোগও রয়েছে তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়া এই গভর্নর ব্যাংক একীভূতকরণ ও খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের মতো কিছু উদ্যোগ নিলেও শেষ পর্যন্ত আস্থার সংকট ও বিতর্কের জেরে তাঁর মেয়াদ শেষ হলো।
এস এম/ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬









