আইন-আদালত

তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল, অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার

ঢাকা, ২৪ ফেব্রুয়ারি – ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। ওই আন্দোলনে অনেক ছাত্র রক্ত দিয়েছেন। পরে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ছাত্র হত্যার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শুরু হয়। সেখানে চিফ প্রসিকিউটরের দায়িত্বে ছিলেন অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর ২২ ফেব্রুয়ারি তার নিয়োগ বাতিল করা হয়। ঠিক এ সময়ই তার বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। তবে তাজুল ইসলাম এসব অভিযোগকে মিথ্যা, বানোয়াট ও ব্যক্তিগত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলে দাবি করেন।

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল করে সরকার। তার জায়গায় নতুন চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পান অ্যাডভোকেট মো. আমিনুল ইসলাম। সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার তাজুল ইসলামকে অ্যাটর্নি জেনারেলের পদমর্যাদায় চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। জুলাই আন্দোলন–সংক্রান্ত বেশিরভাগ মামলা তিনি পরিচালনা করেন।

চিফ প্রসিকিউটরের পদ ছাড়ার দিনই ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট ‘চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ার’কে টাকা আয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে।

কাজী মোস্তাফিজুর রহমান আহাদ নামে একটি ফেসবুক আইডি থেকে ‘ট্রাইব্যুনালে সেটলিং বাণিজ্য ও রাজসাক্ষী নাটক: কেন সরতে হচ্ছে তাজুল ইসলামকে?’ শিরোনামে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। সেখানে প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ দুটি মন্তব্য করেন। ওই মন্তব্যে তিনি তাজুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনেন।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন এবং আশুলিয়া থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) শেখ আবজালুল হককে ‘অ্যাপ্রুভার’ বা রাজসাক্ষী করা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সুলতান মাহমুদ। শহীদ আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এক পুলিশ কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেওয়া এবং চানখাঁরপুল এলাকায় ‘গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়া’ একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে আসামি না করে সাক্ষী করার অভিযোগও করেন তিনি।

চিফ প্রসিকিউটর পদে নিয়োগ বাতিলের পর দুপুরে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তাজুল ইসলাম। তখন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদের আনা অভিযোগ নিয়ে তাকে প্রশ্ন করা হয়। সে সময় তার পাশে ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম।

একজন সাংবাদিক জানতে চান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে, যেগুলো আগে কখনও তোলা হয়নি, শেষ মুহূর্তে এসব অভিযোগ আনার বিষয়টি তিনি কীভাবে দেখছেন। জবাবে তাজুল ইসলাম বলেন, কে কী ব্যক্তিগত অভিযোগ করছে, সেগুলো তারা আমলে নিচ্ছেন না। ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে কেউ কিছু বললে সে বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য নেই।

আরেক সাংবাদিক বলেন, প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ স্পষ্ট অভিযোগ করেছেন যে তামীম সাহেবের রুমে এসআই আবজালুলের স্ত্রী একটি ভারী ব্যাগ নিয়ে এসেছিলেন এবং সেটি আপনাকে জানানো হয়েছিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘না, এটা আমার জানা নেই।’ সাংবাদিক আবার বলেন, আপনাকে জানানো হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তখন তাজুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের অভিযোগ তারা তদন্ত করে দেখেছেন এবং সেগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। তার ভাষায়, ব্যক্তিগত হিংসা থেকে কেউ এমন কথা বললে তা দুর্ভাগ্যজনক। তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া স্বচ্ছ ছিল এবং আদালতের মাধ্যমেই তা প্রমাণিত হয়েছে। এখন কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে মিথ্যা অভিযোগ করলে দেশের মানুষ ও গণমাধ্যম সব জানে কীভাবে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিচার হয়েছে। ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে কেউ কিছু বললে তা তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন না।

এর আগে তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ দ্বিতীয়বার স্বাধীন হয়েছে। তিনি বলেন, ছাত্রদের আত্মত্যাগ যেন ভুলে না যাওয়া হয়। এ সময় তিনি মামলার অগ্রগতি ও কার্যক্রম নিয়েও কথা বলেন। তার মতে, নতুন সরকার এসেছে, তাই তাদের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে তাদের লোকজন দায়িত্ব নেবে—এটাই স্বাভাবিক। তবে যারা গুম-খুনের শিকার হয়েছেন এবং জুলাই আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের স্বজনরা যেন সঠিক বিচার পান।

নতুন চিফ প্রসিকিউটরকে মামলা পরিচালনায় সব ধরনের সহযোগিতা করবেন বলেও জানান তাজুল ইসলাম।

এনএন/ ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language