মেট্রোরেলের নতুন দুই পথে ব্যয় দ্বিগুণ, কিলোমিটারপ্রতি খরচ ৩৬১৮ কোটি টাকা

ঢাকা, ২২ ফেব্রুয়ারি – রাজধানীর উত্তরা থেকে মতিঝিল মেট্রোরেল নির্মাণে যে অর্থ ব্যয় হয়েছিল, নতুন দুটি পথে মেট্রোরেল নির্মাণে তার দ্বিগুণেরও বেশি খরচ হতে চলেছে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল। তবে নতুন দুটি পথে এই খরচ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে প্রতি কিলোমিটারে ৩ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা।
নতুন দুই মেট্রোরেল পথে মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এই বিপুল ব্যয়ের বিষয়টি মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্পকেই এখন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিপুল ব্যয়ে মেট্রোরেল নির্মাণের বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি এবং বিষয়টি এখন নির্বাচিত বিএনপি সরকারের বিবেচনার ওপর নির্ভর করছে। নির্মাণকাজ শুরুর অপেক্ষায় থাকা মেট্রোরেলের দুটি পথের মধ্যে একটি হলো কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর এবং নর্দ্দা থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত বিস্তৃত এমআরটি লাইন ১, যার দৈর্ঘ্য ৩১ কিলোমিটারের বেশি।
অন্যটি সাভারের হেমায়েতপুর থেকে মিরপুর ও গুলশান হয়ে ভাটারা পর্যন্ত বিস্তৃত এমআরটি লাইন ৫ উত্তর, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ২০ কিলোমিটার। এই দুটি লাইনেরই কিছু অংশ উড়ালপথে এবং কিছু অংশ মাটির নিচ দিয়ে বা পাতালপথে নির্মাণ করা হবে। বিশ্লেষকদের মতে মেট্রোরেল নির্মাণে এই অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধির মূল কারণ হলো দরপত্রে প্রতিযোগিতার সুযোগ সীমিত থাকা। বর্তমানে শুধুমাত্র জাপানি ঠিকাদারদের মধ্যেই এই প্রতিযোগিতা সীমাবদ্ধ রয়েছে। ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদ জানিয়েছেন যে দুটি প্রকল্পের অর্থায়নে জাপানি ঋণদাতা সংস্থা জাইকা বেশ কিছু কঠিন প্রকৌশলগত শর্ত জুড়ে দিয়েছে।
এর ফলে ঠিকাদার নিয়োগে প্রতিযোগিতা কমে গেছে এবং ব্যয় অত্যধিক বেড়ে গেছে। উল্লেখ্য যে মেট্রোরেল নির্মাণে ঋণ প্রদানকারী দেশ জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার শর্তের কারণে জাপানি কোম্পানিগুলোই কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকে। এদিকে ঢাকার উত্তরা থেকে মতিঝিল পথে মেট্রোরেলের সম্প্রসারিত অংশ কমলাপুর পর্যন্ত যাবে এবং মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের কাজ এখনো চলমান রয়েছে। নতুন এমআরটি লাইন ১ প্রকল্পটি ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে অনুমোদন পায় যেখানে সরকারি প্রাক্কলনে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। তবে ঠিকাদারদের প্রস্তাবিত দর অনুযায়ী এখন প্রকল্পের ব্যয় ৯৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছাবে বলে ডিএমটিসিএলের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
অন্যদিকে লাইন ৫ উত্তর প্রকল্পটি ২০১৯ সালের অক্টোবরে অনুমোদিত হয় এবং এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা, যা এখন বেড়ে ৮৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে। ডিএমটিসিএলের বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে ভারতের মতো দেশে প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় হয় ১৫০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা, যেখানে তারা ঋণের ক্ষেত্রে এমন কোনো শর্ত মানে না যা প্রতিযোগিতাকে ক্ষুণ্ন করে। জাইকার কাছে এই বাড়তি ব্যয়ের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তারা জানায় যে দরপত্র মূল্যায়নের এই পর্যায়ে কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়। ডিএমটিসিএল সূত্র জানায় যে গত বছরের ১৮ জুন কচুক্ষেত থেকে ভাটারা পর্যন্ত অংশের দরপত্রে জাপানের তাইসি ও দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং যৌথভাবে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়, কিন্তু তাদের প্রস্তাবিত দর প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে ৩৯১ শতাংশ বেশি ছিল।
ঠিকাদারদের অস্বাভাবিক ব্যয় প্রস্তাবের পেছনে যোগসাজশের সন্দেহ করছেন ডিএমটিসিএল কর্মকর্তারা। দরপত্র প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে শিমুজি করপোরেশন এবং তাইসি ও স্যামসাং গ্রুপ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দরপত্র জমা দিচ্ছে। এমতাবস্থায় প্রকল্প দুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনে চিঠি দিয়েছে। বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক মনে করেন প্রতিযোগিতার অভাবেই এই বিপুল ব্যয়ের বোঝা চাপছে এবং ঋণের শর্ত পরিবর্তন করা জরুরি। এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকায় মেট্রোরেলের পাশাপাশি মনোরেল চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর নতুন সরকার এই ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলোর বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয় সেটাই এখন দেখার বিষয়।
এস এম/ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬









