
অস্ট্রেলিয়ার নীল আকাশের নিচে সিডনির লাকেম্বা অনেক বাঙালির কাছে আপন শহরের মতো। এ এলাকার হালডন স্ট্রিটকে অনেকেই ‘লিটল বাংলাদেশ’ বলে চেনেন, কেউ আবার বলেন “বাঙালিপাড়া” কিংবা “বাংলা টাউন”। আশপাশের বিপণিবিতানগুলোতে দেশি মাছ, শাকসবজি, মসলা, চালডাল থেকে শুরু করে দেশি ধাঁচের পোশাক-পরিচ্ছেদও পাওয়া যায়।
রমজান মাসে লাকেম্বার চিত্র বদলে যায়। রাত নামলেই এখানে জমে ওঠে ‘Nights during Ramadan’ ধরনের এক উৎসবমুখর আয়োজন, যেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ সমবেত হন। এটি অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসী সমাজের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। আরব, তুর্কি, লেবানিজ, দক্ষিণ এশীয়, আফ্রিকানসহ বহু সংস্কৃতির সহাবস্থান এখানে চোখে পড়ে, আর পাশাপাশি সিডনির বাঙালি ও বাংলাদেশি উপস্থিতিরও একটি দৃশ্যমান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে লাকেম্বা।
সম্প্রতি লাকেম্বাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। কট্টর ডানপন্থী দল ওয়ান নেশনের নেত্রী সিনেটর পলিন হ্যানসন এই শহরতলিকে “নো গো জোন” বা “নিষিদ্ধ এলাকা” বলে আখ্যায়িত করে বিতর্কটির অবতারণা করেন। তিনি এক সাক্ষাৎকারে মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপস্থিতিকে সামনে এনে লাকেম্বাকে অনিরাপদ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। এই মন্তব্য সিডনির বাংলাদেশি ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে, একই সঙ্গে বহুত্ববাদী অস্ট্রেলিয়ায় সহাবস্থানের ধারণাকেও প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়। পালটা জবাবে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্কসহ শীর্ষ রাজনীতিকেরা মন্তব্যটিকে “লজ্জাজনক”, “বিভেদ সৃষ্টিকারী” এবং “ভুল ও নিষ্ঠুর” বলে আখ্যা দিয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশিদের আগমনের ইতিহাস খুব দীর্ঘ নয়, তবে গত কয়েক দশকে এ উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মূলত সত্তরের দশকের শেষভাগ এবং আশির দশকের শুরুতে স্বল্পসংখ্যক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও পেশাজীবী এখানে আসতে শুরু করেন। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে তুলনামূলকভাবে সহজতর অভিবাসন প্রক্রিয়া এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশি অভিবাসনের প্রবাহ আরও দৃশ্যমান হয়।
শুরুতে বাংলাদেশি পরিবারগুলো মেলবোর্ন ও সিডনির নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও, নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে সিডনির লাকেম্বা, রকডেল ও ক্যাম্পসি এলাকায় তাদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে ঘন হতে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব উপশহর নতুন অভিবাসীদের জন্য প্রথম ঠিকানায় পরিণত হয়, আর এখানেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে কমিউনিটির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নেটওয়ার্ক। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে, যার একটি বড় অংশ সিডনিতে বসবাস করেন।
অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিতে বাংলাদেশি অভিবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য। কেউ পড়াশোনা শেষ করে আইটি বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চাকরি করেছেন, কেউ নার্সিং বা কেয়ার সেক্টরে জায়গা করে নিয়েছেন, কেউ আবার ছোট ব্যবসা দিয়ে শুরু করে বড় উদ্যোগে গেছেন। বর্তমান প্রজন্ম অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার পেশায় দৃঢ়ভাবে উপস্থিত। সিডনি, মেলবোর্ন ও ব্রিসবেনে বাংলাদেশিদের মালিকানাধীন নানা ধরনের ব্যবসাও গড়ে উঠেছে, যেমন রিয়েল এস্টেট সেবা, গ্রোসারি শপ, রেস্টুরেন্ট, ট্রাভেল এজেন্সি ইত্যাদি।
অস্ট্রেলিয়া বর্তমানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। সিডনি ইউনিভার্সিটি, এনএসডব্লিউ এবং মোনাশ ইউনিভার্সিটির মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কয়েক হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন, যা দুই দেশের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে।
অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার নাগরিক পরিসরে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণও ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিভিন্ন সিটি কাউন্সিলে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাউন্সিলররা নির্বাচিত হয়ে আসছেন। কমিউনিটি বোর্ড, স্কুল কমিটি, প্যারেন্ট অ্যাসোসিয়েশন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের তৃণমূল পর্যায়ে বাংলাদেশি ভলান্টিয়ার ও কর্মীদের উপস্থিতি আগের চেয়ে বেশি দেখা যায়। এই অংশগ্রহণের বড় শক্তি হলো পরিচয়ের বহুমাত্রিকতা। একজন একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক, আবার নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির ধারক।
প্রবাসজীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও গড়ে উঠেছে বাঙালিদের নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। চলে সাহিত্যচর্চা, আছে খেলাধুলার ক্লাব, এবং সামাজিক সহায়তার বিভিন্নমুখী কার্যক্রম। প্রতিবছর সিডনি অলিম্পিক পার্কে আয়োজিত ‘বৈশাখী মেলা’ এখন অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম বড় জাতিগত উৎসবে পরিণত হয়েছে, যেখানে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে।
লাকেম্বার সঙ্গে বাঙালিদের সম্পর্ক অনেকটাই বাস্তব প্রয়োজন থেকে গড়ে উঠেছে। তুলনামূলক সাশ্রয়ী আবাসন, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট, দোকানপাট এবং বহুজাতিক পরিবেশ নতুন অভিবাসীদের লাকেম্বায় টেনে আনে। ধীরে ধীরে এখানে বাঙালি দোকান, গ্রোসারি, ট্রাভেল এজেন্সি, রেস্টুরেন্ট, টিউটরিং সেবা, ছোটখাটো কনসালটেন্সিসহ নানান ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। রমজানের রাতের বাজার কেন্দ্র করে লাকেম্বা আরও পরিচিতি পায়। এই বাজার এখন শুধু ধর্মীয় আয়োজনে সীমাবদ্ধ নয়, বরং অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম বড় স্ট্রিট ফুড ইভেন্টে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালে রাতের এই আয়োজনে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫১ হাজার দর্শনার্থী সমাগমের কথা জানিয়েছে স্থানীয় কাউন্সিল।
এত মানুষের উপস্থিতি একটি বাস্তব বার্তা দেয়। এই শহরতলি বর্জনের জায়গা নয়, এটি অংশগ্রহণের জায়গা। ধর্ম, বর্ণ, পরিচয় ভিন্ন হলেও বহু মানুষ এখানে আসে একসঙ্গে হাঁটতে, খাবার কিনতে, কথা বলতে, এবং এই বহুসাংস্কৃতিক জীবনের স্বাদ নিতে। এই চিত্রের সঙ্গে “নিষিদ্ধ এলাকা” তত্ত্ব সহজে মেলে না।
সিনেটর পলিন হ্যানসন যখন এই এলাকাকে অনিরাপদ বলে আখ্যা দেন, তখন সরকারি অপরাধ পরিসংখ্যান এবং স্থানীয় পর্যবেক্ষণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। বিভিন্ন সূচকে দেখা যায়, লাকেম্বা সম্পর্কে সামগ্রিক নিরাপত্তা ধারণা একরকম নয়, এবং এটি সিডনির অনেক এলাকার মতোই একটি স্বাভাবিক শহরতলি, যেখানে জনসমাগমের মৌসুমে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও বাড়ানো হয়। তাই “নো গো জোন” ধরনের সার্বজনীন তকমা বাস্তবতাকে সরলীকরণ করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে রাজনীতির উত্তাপ বাড়ে, আর তখনই অভিবাসী সমাজকে লক্ষ্য করে ভয় বা সন্দেহ তৈরি করার ভাষা দেখা যায়। “নো গো জোন” ধরনের বাক্য এ কারণেই বিপজ্জনক। এটি একটি এলাকাকে কলঙ্কিত করে, সেখানে বসবাসকারী মানুষকে সন্দেহের চোখে তুলে ধরে, এবং সামাজিক আস্থাকে ক্ষয় করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক যে ভাষায় বলেছেন “ভুল ও নিষ্ঠুর”, সেটি কেবল রাজনৈতিক শালীনতার প্রশ্ন নয়, সামাজিক নিরাপত্তা ও সংহতির প্রশ্নও।
অস্ট্রেলিয়ার বুকে লাকেম্বা কেবল একটি জনপদ নয়, এটি অভিবাসী জীবনের বহু গল্পের ঠিকানা। এখানকার মসজিদ, মন্দির ও গির্জাগুলোর সহাবস্থান অস্ট্রেলিয়ার বহুত্ববাদের বাস্তব রূপও দেখায়। রাজনৈতিক বক্তব্যের উত্তাপে কোনো এলাকাকে এক লাইনের তকমায় আটকে দিলে বাস্তব মানুষ, বাস্তব জীবন এবং সহাবস্থানের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আড়ালে চলে যায়। সিডনির “বাংলা টাউন” লাকেম্বা তার নিজস্ব পরিচয়ে উজ্জ্বল থাকুক, শান্তি, সম্প্রীতি এবং বহুত্ববাদের এক পরিচ্ছন্ন দৃষ্টান্ত হিসেবে।
তথ্যসূত্র:
Australian Broadcasting Corporation (১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
Reuters (১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)









