ঋণের পাহাড় ও ভঙ্গুর অর্থনীতির সাতটি ‘মহাসংকট’ নিয়েই যাত্রা শুরু নতুন সরকারের

ঢাকা, ২০ ফেব্রুয়ারি – সদ্যোবিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনকাল শেষে নির্বাচিত সরকারের কাঁধে চেপেছে ভঙ্গুর অর্থনীতির বিশাল বোঝা। অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফেরানোর প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে চরম অব্যবস্থাপনা, ব্যবসায়ীদের আস্থাহীনতায় বিনিয়োগে খরা, রাজস্ব আয়ে বড় ঘাটতি এবং উচ্চ সুদের হারের কারণে রুগ্ণ হয়ে পড়েছে বেসরকারি খাত। এমন এক সংকটময় মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারকে দায়িত্ব নিতে হয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই অর্থনীতিতে বর্তমানে সাতটি ‘মহাসংকট’ জেঁকে বসেছে, যা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই সাতটি সংকটের মধ্যে রয়েছে ২৩ লাখ কোটি টাকার ঋণের পাহাড়, সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ, লাগামহীন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ২১ লাখ মানুষের কর্মহীনতা, রাজস্ব আয়ের নিম্নগতি, স্থবির বেসরকারি বিনিয়োগ এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়নে ধীরগতি। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে অজনপ্রিয় কিন্তু সাহসী কিছু সংস্কারের পথে হাঁটতে হবে।
বিদায়ি অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ পরবর্তী অর্থমন্ত্রীর জন্য রেখে যাওয়া নোটে অর্থনীতির এই দুরবস্থার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে নিম্নমানের কর আদায়, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং দুর্বল শাসনব্যবস্থা অর্থনীতির গভীরে প্রোথিত হয়ে গেছে। এর ফলে সরকারের বাজেট ঘাটতি মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) তথ্যমতে, দেশের মোট ঋণের বোঝা দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ কোটি টাকায়। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ১৬ লাখ কোটি টাকার বেশি এবং বৈদেশিক ঋণ সাত লাখ কোটি টাকার ওপরে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে পুরনো ঋণের কিস্তি শোধ করতে সরকারকে নতুন করে ঋণ নিতে হচ্ছে। শুধু ২০২৫-২৬ অর্থবছরেই ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যয় হবে প্রায় ১.২৫ লাখ কোটি টাকা।
আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় ক্ষত হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ১৬ শতাংশ। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, জানুয়ারি মাসে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৭৭ শতাংশে। কর্মসংস্থান সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে। এসডিজি বাস্তবায়নে সিটিজেন প্ল্যাটফর্মের জরিপ বলছে, ২০২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে দেশে প্রায় ২১ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে। সরকারের রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতিও হতাশাজনক। বর্তমানে কর-জিডিপি অনুপাত নেমে এসেছে ৬.৮ শতাংশে, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন।
অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া নতুন পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে সরকারি কোষাগারে বছরে অতিরিক্ত এক লাখ কোটি টাকার বেশি বোঝা বাড়বে। পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করতে হলে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন এবং জ্বালানি সংকট দূর করা অপরিহার্য। গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে যেন কারখানার উৎপাদন ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এআইইউবি-এর সহযোগী অধ্যাপক ড. হুমায়রা ফেরদৌস মন্তব্য করেছেন, গত ১৮ মাস ধরে চলা অস্থিরতায় অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে ব্যবসায়ীদের দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া জরুরি। আগামী দিনগুলোতে এই বিশাল অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই নতুন সরকারকে এগিয়ে যেতে হবে।
এস এম/ ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬









