জাতীয়

গণভোট ও নির্বাচনের দ্বিমুখী ফলাফল: সংস্কার প্রস্তাব বনাম দলীয় রাজনীতির সমীকরণ

গোপালগঞ্জ, ১৯ ফেব্রুয়ারি – এবারের জাতীয় নির্বাচনে দুটি ভিন্ন ব্যালটের ব্যবস্থা ছিল। এর একটি প্রস্তাবিত সংস্কারের ওপর গণভোট এবং অন্যটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিএনপি বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করেছে। অন্যদিকে গণভোটে সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে বা ‘হ্যাঁ’ জিতেছে প্রায় একই রকম দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাধিক্যে। আপাতদৃষ্টিতে ভোটের ফলাফল সরল মনে হলেও আসনভিত্তিক দলীয় ভোট এবং ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের ব্যবচ্ছেদে উঠে এসেছে ভিন্ন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা।

গণভোটে ‘না’-এর পক্ষে ৩১ শতাংশের বেশি ভোট পড়লেও বিএনপির জয়ে কোনো ভাটা পড়েনি। নির্বাচনী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গোপালগঞ্জের তিনটি আসনেই গণভোট প্রদানের সংখ্যা দলীয় ভোট প্রদানের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি। সেখানে গণভোটে অংশ নেওয়া ভোটারদের বড় একটি অংশ সংস্কারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। গোপালগঞ্জ-১, ২ এবং ৩ আসনে বিজয়ী প্রার্থীরা বিপুল ভোট পেলেও সংস্কার প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট পড়েছে প্রচুর। ফ্যাসিবাদ সহযোগী ও সমর্থক গোষ্ঠী এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নব্য বিএনপি সমর্থকদের একাংশ ‘না’ ভোটে সিল দিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই চিত্র দেখা গেছে মাদারীপুর, শরীয়তপুরসহ বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলে। মাদারীপুর-২ আসনে সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়েছে মাত্র ৪০৬ ভোটের ব্যবধানে।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে ‘না’ ভোটের আধিক্য লক্ষ্য করা গেছে। চট্টগ্রাম-৮, ১২, ১৩ এবং সিলেটের সুনামগঞ্জ-২ সহ পার্বত্য জেলাগুলোতে সংস্কারের বিপক্ষে রায় এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, কওমি আলেমদের একাংশের নেতিবাচক প্রচারণা এবং ভুল ব্যাখ্যার কারণে ধর্মপ্রাণ ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল। বিশেষ করে সংস্কার প্রস্তাব পাস হলে ধর্মীয় মূল্যবোধ ক্ষুণ্ন হতে পারে, এমন প্রচারণা চট্টগ্রাম অঞ্চলের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। এছাড়াও স্থানীয় অলিগার্ক বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংস্কার বিরোধী অবস্থানও এখানে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যেও গণভোট নিয়ে বিভ্রান্তি ছিল। জুলাই সনদ ও সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে দলের অবস্থান তৃণমূল পর্যায়ে পরিষ্কার না থাকায় অনেক কর্মী ‘না’ ভোট দিয়েছেন। ঝিনাইদহ-১ এবং নেত্রকোনা-৪ আসনে বিএনপির জনপ্রিয় প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয়লাভ করলেও ওই আসনগুলোতে সংস্কার প্রস্তাবের বিপক্ষে রায় এসেছে।

ঝিনাইদহে সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামান এবং নেত্রকোনায় লুতফুজ্জামান বাবর বিশাল ব্যবধানে জিতলেও তাদের নিজ আসনে ‘না’ ভোট জয়ী হয়েছে। এই দ্বিমুখী ফলাফলের কারণে ভবিষ্যতে সংবিধান সংশোধন ও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

এসএএস/ ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language