ধ্বংসস্তূপের মাঝেও গাজায় রমজানের আবহ স্বস্তি ও আশার আলো

গাজা, ১৯ ফেব্রুয়ারি – অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর গাজায় প্রথমবারের মতো পালিত হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা শহরের ধ্বংসস্তূপ আর ভেঙে পড়া ভবনের মাঝেও রাস্তায় রাস্তায় টাঙানো হয়েছে ছোট ফানুস ও রঙিন বাতির মালা। এই দৃশ্য ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত মানুষের মনে সামান্য হলেও স্বস্তি ও আশার আলো জ্বালিয়েছে।
সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই ফিলিস্তিনিরা চেষ্টা করছেন পবিত্র এই মাসকে স্বাগত জানিয়ে উৎসবের আবহ ফিরিয়ে আনতে। ঐতিহাসিক ওমারি মসজিদে কয়েক ডজন মুসল্লি প্রথম রমজানের ফজরের নামাজ আদায় করেন। শীতের তীব্রতা উপেক্ষা করে ভারী জ্যাকেট গায়ে দিয়েই তারা নামাজে শরিক হন।
গাজা শহরের বাসিন্দা আবু আদম বলেন, ‘দখলদারিত্ব, মসজিদ-স্কুল ধ্বংস আর আমাদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরেও আমরা আল্লাহর ইবাদতের জন্য এখানে এসেছি। গত রাতেও হামলা হয়েছে, তবুও আমাদের সংকল্প ভাঙেনি।’ নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, বুধবার সকালে গাজা শহরের পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলেও একটি শরণার্থী শিবিরে গোলাবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। তবে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের গাজায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় হতাহতের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে। গাজার দক্ষিণাঞ্চলে আল-মাওয়াসি এলাকায় হাজার হাজার মানুষ এখনো ত্রিপল ও অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও পুনর্গঠনের কাজ শুরু হতে সময় লাগছে। তাবুতে বসবাসকারী নিবিন আহমেদ বলেন, ‘এই রমজান আনন্দের হলেও সেই আনন্দ যেন দমবন্ধ হয়ে আছে। যারা শহীদ হয়েছেন, নিখোঁজ বা আটক আছেন, তাদের অভাব তীব্রভাবে অনুভব করছি।’ তিনি জানান, আগে রমজানের টেবিল নানা পদের খাবারে ভরা থাকত এবং আত্মীয়-স্বজনের কোলাহলে ঘর মুখর থাকত। কিন্তু এখন মূল্যবৃদ্ধির কারণে খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন সহায়তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সীমিত পণ্য প্রবেশ ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে অধিকাংশ মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
শহরের পশ্চিমে তাবুতে বসবাসরত ৩৭ বছর বয়সী মাহা ফাথি বলেন, ‘সব ধ্বংস আর কষ্টের মাঝেও রমজান আমাদের জন্য বিশেষ। যুদ্ধের সময় সবাই টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিল, কিন্তু এখন মানুষ আবার একে অপরের কষ্ট অনুভব করতে শুরু করেছে।’ তিনি জানান, পরিবার ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে সেহরির প্রস্তুতি ও সামান্য সাজসজ্জা তাদের মনে কিছুটা হলেও আনন্দ ফিরিয়ে এনেছে। গাজার মধ্যাঞ্চলে দেইর আল-বালাহ সমুদ্র সৈকতে ফিলিস্তিনি শিল্পী ইয়াজিদ আবু জারাদ বালুর ওপর আরবি ক্যালিগ্রাফিতে ‘স্বাগতম রমজান’ লিখে উৎসবের আমেজ ছড়িয়েছেন।
পাশের তাবু শিবিরের শিশুরা তা কৌতূহলভরে দেখেছে। তাবুতে বসবাসকারী ৪৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ আল-মাধুন বলেন, ‘আশা করি এটাই তাবুতে কাটানো আমাদের শেষ রমজান। সন্তানরা যখন ফানুস চায় বা পছন্দের খাবারে ভরা ইফতারের টেবিলের স্বপ্ন দেখে, তখন অসহায় লাগে। তবুও আমরা ধ্বংসস্তূপের মাঝেই আনন্দ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করি।’
এ এম/ ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬









