
পূর্ব লন্ডনের এক প্রান্তে বেথনাল গ্রিন। শহরের এই অংশটা দিনের বেশিরভাগ সময়ই ব্যস্ত থাকে। বাসের সারি, ফুটপাথে মানুষের চলাচল, ছোট দোকান আর খাবারের দোকানের চাঞ্চল্যে এলাকাটি যেন কখনও থামে না। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের একটি বড় কমিউনিটি গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে মুসলিম অভিবাসীরা এই এলাকাটিকে নিজেদের নতুন ঠিকানা বানিয়ে গড়ে তুলেছেন ব্যবসা, রেস্তোরাঁ, সাংস্কৃতিক উদ্যোগ, কমিউনিটি সংগঠন এবং ধর্মীয় কেন্দ্র, যা শুধু উপাসনার স্থান নয়, অনেকের কাছে ভরসার ঠিকানাও।
ঘটনার শুরু ২০০৪ সালে। বেথনাল গ্রিন আর তার আশপাশের এলাকায় তখন এক ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল আস্থা ও শ্রদ্ধার এক দৃঢ় বলয়। তাঁর নাম আব্দুল হালিম খান। স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে তিনি ছিলেন প্রভাবশালী একজন ধর্মীয় নেতা। কথার ভঙ্গি, ধর্মীয় ব্যাখ্যার আত্মবিশ্বাস এবং মানুষের সংকটকে হাতের মুঠোয় নেওয়ার দক্ষতায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন পরামর্শদাতা, মধ্যস্থতাকারী, এবং বহু পরিবারের কাছে সমস্যার মুহূর্তে শেষ আশ্রয়ের নাম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তদন্তে বেরিয়ে আসে, সেই আশ্রয়ের ভেতরেই ধীরে ধীরে জমেছিল এমন এক অন্ধকার, যা বাইরে থেকে দেখা যায়নি বহু বছর।
সম্প্রতি পূর্ব লন্ডনের স্নারেসব্রুক ক্রাউন কোর্টে (Snaresbrook Crown Court) যখন আব্দুল হালিম খানের অপরাধের খতিয়ান পড়া হচ্ছিল, তখন আদালতের গুমোট স্তব্ধতা ভেঙে দিচ্ছিল ভুক্তভোগীদের কান্নার আওয়াজ। এটি কেবল একটি মামলা নয়, এটি বিশ্বাসের চরম বিশ্বাসঘাতকতা, আধ্যাত্মিক জবরদস্তি এবং এক দশকের এক দীর্ঘ ‘ব্ল্যাক ম্যাজিক’ ট্র্যাজেডি।
কোর্টে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, আব্দুল হালিম খান পূর্ব লন্ডনের একটি মসজিদে ইমাম হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তবে এটি হোয়াইটচ্যাপেল রোডের ইস্ট লন্ডন মসজিদ নয়। স্থানীয় মুসলিম কমিউনিটির মধ্যে তাঁর পরিচিতি ছিল প্রভাবশালী ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে, আর সেই পরিচিতিই ছিল তাঁর প্রধান ঢাল। তদন্তকারীদের ভাষায়, তিনি বিশ্বাসের জায়গায় ঢুকেছিলেন ধীরে ধীরে। পরিচয়, আস্থা, পরামর্শ, সহানুভূতি, এরপর নিয়ন্ত্রণ। ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিস জানায়, সাতজন নারী ও কিশোরী ছিলেন তাঁর ভুক্তভোগী, যাদের মধ্যে তিনজন অপরাধের সময় ছিলেন কম বয়সী কিশোরী। সবাই ছিলেন স্থানীয় মুসলিম কমিউনিটির সদস্য। অভিযোগ অনুযায়ী এসব অপরাধ চলেছে ২০০৪ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত।
তদন্তে উঠে এসেছে শিউরে ওঠা এক বর্ণনা। আব্দুল হালিম খান তাঁর শিকারদের বেছে নিতেন অত্যন্ত সুকৌশলে। মেট্রোপলিটন পুলিশ জানায়, এই সময়জুড়ে তিনি একের পর এক ভুক্তভোগীর ওপর প্রভাব বিস্তার করেন। যাদের জীবনে তখন পারিবারিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন বা নিরাপত্তাহীনতার চাপ ছিল, তাদেরই তিনি টেনে নিতেন নিজের বলয়ে। কারও বয়স ছিল অল্প, এমনকি একজন ছিল মাত্র ১২ বছরের কিশোরী। এরপর তিনি ভয়কে হাতিয়ার বানাতেন। বলতেন অমঙ্গল ঘনিয়ে আসছে, পরিবার বিপদে পড়বে, আর সেই বিপদ ঠেকাতে হলে তাঁকে নির্জনে দেখা করতে হবে। ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিস (CPS) অনুযায়ী, তিনি ভুক্তভোগীদের ফ্ল্যাট বা নিরিবিলি লুকানো জায়গায় নিয়ে যেতেন, যেন কেউ জানতে না পারে।
এই মামলার সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল তাঁর তথাকথিত আধ্যাত্মিক ক্ষমতার গল্প। প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি দাবি করতেন তিনি বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী এবং আধ্যাত্মিক সেশনের সময় তাঁর শরীরে একটি ‘জ্বীন’ ভর করে। কখনও বলতেন, তিনি জ্বীনের ছদ্মবেশে কথা বলছেন বা কাজ করছেন। এই দাবিকে সামনে রেখে তিনি কিশোরী ও নারীদের ওপর বারবার যৌন নির্যাতন চালাতেন। ভয়, বিভ্রান্তি আর ধর্মীয় কর্তৃত্বের চাপে অনেক ভুক্তভোগীর প্রতিরোধ ভেঙে পড়ত, এবং পরে তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠত, শুদ্ধিকরণের নামে তাদের সঙ্গে আসলে কী ঘটানো হয়েছে।
নির্যাতনের পর তিনি শিকারদের চোখে চোখ রেখে হুমকি দিতেন। বলতেন, কেউ যদি পরিবার বা পুলিশকে জানায়, তবে তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তি আর কালো জাদুর প্রভাবে তাদের পরিবার ধ্বংস হয়ে যাবে। ভুক্তভোগীরা কেবল নিজেদের নয়, বাবা-মা এবং ভাই-বোনের ক্ষতির আশঙ্কায় বছরের পর বছর ধরে এই সত্য বুকের ভেতর চাপা রেখেছিলেন।
অন্ধকারের পর্দাটি প্রথম সরতে শুরু করে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। ততদিনে আব্দুল হালিম খানের সেই কিশোরী শিকারটি সাবালিকা হয়েছে। শৈশবের সেই ক্ষত তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। অবশেষে অসীম সাহসিকতা সঞ্চয় করে সে তার স্কুলের একজন শিক্ষকের কাছে পুরো বিষয়টি খুলে বলে। একটি বাক্য, একটি স্বীকারোক্তি, আর তাতেই খুলতে শুরু করে বহু বছরের জট।
লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে তদন্তে নামে, যার সাংকেতিক নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন স্পেয়ারব্যাঙ্ক’ (Operation Sparebank)। তদন্তে নেতৃত্ব দেন ডিটেকটিভ সার্জেন্ট সারা ইয়েমস। অনুসন্ধান এগোতেই একের পর এক করে আরও ভুক্তভোগী সামনে আসতে থাকেন। তদন্তকারীরা বলেন, সাতজন সারভাইভার যে সাহস করে এগিয়ে এসেছেন, সেটাই এই মামলার মূল ভিত্তি। পুলিশ মোট ৫০ জনের বেশি সাক্ষীর জবানবন্দি সংগ্রহ করে এবং ১০টি মোবাইল ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা চালায়। এসব তথ্যপ্রমাণ মিলিয়েই এক দশকের অপরাধের ধারাবাহিক ছবিটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তদন্তের অগ্রগতির পর ২০২৩ সালের ১৬ মার্চ আব্দুল হালিম খানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়। স্কাই নিউজ জানায়, আদালতে তিনি বরাবরের মতোই সব অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং এটিকে ‘প্রতিহিংসামূলক ষড়যন্ত্র’ বলে দাবি করেন। কিন্তু জুরির সামনে যে তথ্য, সাক্ষ্য এবং অভিযোগগুলোর ধারাবাহিক কাঠামো উপস্থাপিত হয়, তা শেষ পর্যন্ত তাঁর দাবি টিকতে দেয়নি। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, শুক্রবার, স্নারেসব্রুক ক্রাউন কোর্ট তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন।
রায়ে আদালত আব্দুল হালিম খানকে মোট ২১টি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করেন। স্কাই নিউজের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে ছিল ৯টি ধর্ষণ, ৫টি ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুকে ধর্ষণ, ৪টি যৌন নিপীড়ন, ২টি ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুর যৌন নিপীড়ন, এবং ১টি “assault by penetration” যা আইনি পরিভাষায় জোরপূর্বক অনুপ্রবেশজনিত যৌন আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত। প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, তিনি পূর্ব লন্ডনের ওল্ড ফোর্ড রোড এলাকায় বসবাস করতেন।
আদালতের রায় আসার সঙ্গে সঙ্গে ৫৪ বছর বয়সী এই ভণ্ড ইমামের মুখোশ চিরতরে খসে পড়ে। বর্তমানে তিনি কারাগারে উচ্চ নিরাপত্তা হেফাজতে রয়েছেন। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী ১৪ মে ২০২৬ তারিখে তাকে চূড়ান্ত সাজা প্রদান করা হবে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধের ধরন ও সংখ্যার কারণে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড, এমনকি যাবজ্জীবন সাজাও হতে পারে।
উল্লেখযোগ্য যে, ব্রিটেনে বহু বছর আগের যৌন অপরাধও তদন্তের আওতায় আসছে এবং বিচার সম্ভব হচ্ছে। যেমন সাফোক পুলিশ জানিয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ইপসউইচ ক্রাউন কোর্টে হাফেজ আশরাফ উদ্দিন নামে ৭১ বছর বয়সী এক সাবেক ধর্মীয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে বহু বছর আগের অপরাধের মামলায় তাকে ১২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, এবং তাকে আজীবনের জন্য সেক্স অফেন্ডার রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সময় পেরিয়ে গেলেও অভিযোগ জানানোর সাহস এবং তদন্তের দৃঢ়তা যে বিচার এনে দিতে পারে, এই ঘটনাগুলো সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।
তথ্যসূত্র:
Crown Prosecution Service (১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
Metropolitan Police (১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
Sky News (১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
Suffolk Police (নভেম্বর ২০২৫)









