জাতীয়

নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিন অর্থনৈতিক সংস্কার ও সুশাসনের চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ, ১৫ ফেব্রুয়ারি – জাতীয় নির্বাচনের পর একটি নতুন সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে তখন জনগণের প্রত্যাশা কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয় বরং শাসনব্যবস্থার চরিত্র এবং নীতির অগ্রাধিকারের দৃশ্যমান পরিবর্তন। বিশেষ করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে যখন অর্থনীতি বহুমাত্রিক চাপে রয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী তখন প্রথম ১০০ দিন হয়ে ওঠে একটি নীতিগত রিসেটের সময়। এই সময়ে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব না হলেও সরকার কোন পথে হাঁটবে এবং কাদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে তা এই সময়েই নির্ধারিত হয়।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা ছাড়া অন্য কোনো সংস্কার টেকসই হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেবল বাজার তদারকি বা ভ্রাম্যমাণ আদালত যথেষ্ট নয় বরং প্রয়োজন একটি সমন্বিত ইকোনমিক স্ট্যাবিলাইজেশন ফ্রেমওয়ার্ক যেখানে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট খাতের কার্যকর সমন্বয় থাকবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ চেইনের দুর্বলতা ডেটাভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে চিহ্নিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সংকোচনমূলক কিন্তু ভারসাম্যপূর্ণ মুদ্রানীতি বাজারে তারল্য শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।

ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা নতুন সরকারের অন্যতম বড় পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। খেলাপি ঋণ ও দুর্বল তদারকি দীর্ঘদিন ধরে এই খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ করেছে। প্রথম ১০০ দিনেই একটি স্বাধীন ব্যাংকিং সংস্কার কমিশন গঠন করে প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র প্রকাশ এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার করা গেলে বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক সংকেত পৌঁছাবে। কর ব্যবস্থায় সংস্কার এবং বিলাসদ্রব্যে কর বাড়িয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে করছাড় দিলে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির পাশাপাশি করদাতার হয়রানি কমবে। বন্দর ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন নিশ্চিত করলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হবে।

দেশের বাণিজ্য ও শিল্পখাতের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই দীর্ঘদিন ধরে নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখছে। নতুন সরকারের উচিত প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই এফবিসিসিআইসহ সকল জাতীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্য সংগঠনের নির্বাচন সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করা। স্বাস্থ্য খাতে বৈষম্য সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। শহরভিত্তিক বিশেষায়িত সেবা বাড়লেও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এখনো মানসম্মত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। তাই উপজেলা পর্যায়ে টেলিমেডিসিন সংযোগ বাধ্যতামূলক করা এবং সরকারি হাসপাতালের ওষুধ সরবরাহ ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনা প্রয়োজন। ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন বাস্তবতা হলেও ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে এই অগ্রগতি ঝুঁকির মুখে পড়বে।

একটি জাতীয় সাইবার রেসপন্স টাস্কফোর্স গঠন এবং তথ্য সুরক্ষা আইন শক্তিশালী করা জরুরি। একই সঙ্গে ডিজিটাল রূপান্তরের পরবর্তী ধাপে বাংলাদেশকে প্রযুক্তি ব্যবহারকারী থেকে প্রযুক্তি নির্মাতা রাষ্ট্রে পরিণত হতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে এআই ডিপ্লোমেসি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথ গবেষণার মাধ্যমে ধাপে ধাপে অভ্যন্তরীণ সেমিকন্ডাক্টর সক্ষমতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রস্তুতির জন্য উদ্ভাবন ও দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে।

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা পর্যায়ে আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং কৃষকদের সরাসরি ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাকে শিল্পখাতের সঙ্গে যুক্ত করে কারিকুলাম হালনাগাদ করলে তরুণদের কর্মসংস্থান সম্ভাবনা বাড়বে। জ্বালানি খাতে স্বচ্ছ নিরীক্ষা প্রকাশ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি ও রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্যকরণ করা হলে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমবে। বিশেষ করে আসিয়ান দেশগুলোতে রপ্তানি বাড়াতে শুল্ক সুবিধা ও লজিস্টিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে হালাল খাদ্য উৎপাদনে স্বাভাবিক সুবিধা রাখে যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ভূমিকা রাখতে পারে। প্রশাসনিক সংস্কার ছাড়া এসব উদ্যোগের সাফল্য টেকসই হবে না।

প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ এবং মেধাভিত্তিক নীতি অনুসরণ আস্থা বাড়াবে। দুর্নীতি দমন কমিশন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সরকারকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে। স্কিলড মাইগ্রেশনকে একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই একটি ন্যাশনাল স্কিলড মাইগ্রেশন রোডম্যাপ তৈরি করা যেতে পারে। সরকার যদি কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদাকে একীভূত করতে পারে তবে অভিবাসী কর্মীদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। সবশেষে রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্প্রীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা বিভাজন কমিয়ে সমঝোতার পথ তৈরি করবে। প্রথম ১০০ দিন কোনো জাদুকরী সমাধানের সময় না হলেও এটি একটি শক্ত ভিত নির্মাণের সুযোগ। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে এই সময়টিকে কাজে লাগাতে পারলে জনগণের আস্থা পুনর্গঠিত হবে এবং টেকসই রাষ্ট্র নির্মাণের পথ সুগম হবে।

এ এম/ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language