মধ্যপ্রাচ্য

ইসলামে নিরাপদ জনপদের গুরুত্ব ও আদর্শ সমাজ গঠনের রূপরেখা

মক্কা, ১৪ ফেব্রুয়ারি – মানুষ জন্মগতভাবেই সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধ জীবনযাপনের জন্য মানুষের প্রথম ও প্রধান প্রয়োজন হলো নিরাপদ জনপদ। যেখানে জীবন, সম্পদ, সম্মান, ধর্ম ও মত প্রকাশের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে, সেখানেই একটি আদর্শ মানব সমাজ গড়ে ওঠে। ইসলাম যেহেতু পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, তাই ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রসহ সব পর্যায়েই নিরাপত্তার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে এই ধর্ম। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে নিরাপদ জনপদের গুরুত্ব, দোয়া, দৃষ্টান্ত এবং বাস্তব প্রয়োগ সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। নিরাপত্তা আল্লাহর এক মহান নিয়ামত। নিরাপত্তা এমন একটি নিয়ামত যার মূল্য মানুষ বিপদে না পড়া পর্যন্ত উপলব্ধি করতে পারে না।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, যিনি তাদের ক্ষুধা থেকে খাদ্য দিয়েছেন এবং ভয় থেকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। এই আয়াতে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে খাদ্যের মতোই নিরাপত্তাও আল্লাহর বড় নিয়ামত। ক্ষুধা ও ভয় নামক এই দুই মানবিক দুর্দশা দূর করাই একটি সভ্য সমাজের মৌলিক শর্ত। নিরাপদ জনপদের গুরুত্ব বোঝাতে কোরআনে ইবরাহিম (আ.) এর দোয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি মক্কাকে কেন্দ্র করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন যে হে আমার রব, এই জনপদকে নিরাপদ করে দিন এবং এর অধিবাসীদের ফলমূল দ্বারা রিজিক দিন। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো তিনি প্রথমে নিরাপত্তার দোয়া এবং এরপর রিজিকের দোয়া করেছেন। অর্থাৎ ইসলামী দৃষ্টিতে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পূর্বশর্ত হলো নিরাপত্তা। নিরাপদ জনপদ ছাড়া ইবাদতের স্বাধীনতা সম্ভব নয়। ইসলামে ইবাদতের জন্য শান্ত ও নিরাপদ পরিবেশ অপরিহার্য। ভয়ভীতি, সন্ত্রাস ও অরাজকতা থাকলে মানুষ আল্লাহর ইবাদতে মনোযোগী হতে পারে না। কোরআনে বলা হয়েছে যারা ঈমান এনেছে এবং ঈমানের সঙ্গে জুলুম মিশ্রিত করেনি, তাদের জন্যই রয়েছে নিরাপত্তা এবং তারাই হেদায়েতপ্রাপ্ত। এ আয়াত থেকে বোঝা যায় যে ঈমান ও নিরাপত্তা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। ন্যায়বিচার ও জুলুমমুক্ত সমাজই প্রকৃত নিরাপত্তার ভিত্তি। হাদিসে নিরাপত্তার গুরুত্ব সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিরাপত্তাকে মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

তিনি বলেন যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় সকাল করে যে তার জান ও মাল নিরাপদ, শরীর সুস্থ এবং দিনের খাবার তার কাছে আছে, সে যেন পুরো দুনিয়া লাভ করেছে। এই হাদিসে জান ও মালের নিরাপত্তা, শারীরিক সুস্থতা এবং ন্যূনতম জীবিকার কথা এসেছে। এগুলোর মধ্যে প্রথমেই নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে যা নিরাপদ জনপদের অপরিহার্যতা প্রমাণ করে। মদিনা একটি আদর্শ নিরাপদ জনপদের দৃষ্টান্ত। হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় একটি নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলেন। মদিনা সনদ ছিল ইতিহাসের প্রথম লিখিত সামাজিক চুক্তি যেখানে মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের জান ও মাল এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। এই রাষ্ট্রব্যবস্থায় আইনের শাসন ছিল, ধর্মীয় সহনশীলতা বজায় ছিল এবং দুর্বলদের অধিকার সংরক্ষিত ছিল। ফলে মদিনা পরিণত হয়েছিল শান্তি ও নিরাপত্তার এক অনন্য দৃষ্টান্তে। ইসলাম নিরাপত্তাহীনতাকে ভয়াবহ বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কোরআনে একটি জনপদের দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা হয়েছে আল্লাহ একটি জনপদের উদাহরণ দিয়েছেন যা ছিল নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ এবং চারদিক থেকে তার রিজিক আসত। অতঃপর তারা আল্লাহর নিয়ামতের অকৃতজ্ঞতা করল, ফলে আল্লাহ তাদের ক্ষুধা ও ভয়ের পোশাক পরিয়ে দিলেন।

এই আয়াত প্রমাণ করে নিরাপত্তা হারানো মানে সভ্যতা ও স্থিতিশীলতার পতন। ইসলাম নিরাপদ সমাজ গঠনের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, জান ও মালের হেফাজত এবং সন্ত্রাস ও বিশৃঙ্খলা নিষেধ করার নির্দেশনা দিয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ, সন্ত্রাস, মাদক, দুর্নীতি ও সামাজিক অবক্ষয়ের ফলে নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে। এমন পরিস্থিতিতে ধর্মীয় নির্দেশনা অনুসরণ করে ন্যায়বিচার, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া টেকসই নিরাপত্তা সম্ভব নয়। নিরাপদ জনপদ শুধু পার্থিব স্বস্তির বিষয় নয়, বরং এটি ধর্ম পালনের পূর্বশর্ত। তাই সব পর্যায়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবার নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।

এ এম/ ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

 


Back to top button
🌐 Read in Your Language