
বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন আজও বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারের চোখে উজ্জ্বল। কিন্তু সেই স্বপ্নের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে আরেকটি বাস্তবতা, দূরের দেশে সন্তানের দৈনন্দিন নিরাপত্তা নিয়ে এক ধরনের নিরন্তর উদ্বেগ। গত কয়েক বছরে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাজ্যসহ নানা দেশে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আকস্মিক মৃত্যুসংবাদ বারবার এসেছে। প্রতিবারই ঘরে ঘরে প্রশ্ন উঠেছে, একটি দুর্ঘটনা, একটি অসতর্ক মুহূর্ত কিংবা শরীরের ভেতরের অদৃশ্য কোনো বিপর্যয় কীভাবে মুহূর্তে সব থামিয়ে দেয়। অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোও তরুণ চালকদের ঝুঁকিপূর্ণ ড্রাইভিং এবং সড়ক নিরাপত্তার প্রসঙ্গকে বারবার সামনে এনেছে। নিউ সাউথ ওয়েলসের নিউক্যাসলে দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর মৃত্যু সেই উদ্বেগকে নতুন করে উসকে দেয়, কারণ ঘটনাটি কেবল একটি সড়ক দুর্ঘটনা নয়, দেশের বাইরে পড়তে যাওয়া তরুণদের জীবনযাপনের বাস্তবতা এবং কমিউনিটির দায়বদ্ধতাকেও একসঙ্গে আলোচনায় টেনে আনে।
নিউ সাউথ ওয়েলসের নিউক্যাসল শহরের মেফিল্ড ইস্ট এলাকায় ২০২৫ সালের ৩০ আগস্ট রাত আনুমানিক ১১টা ১৫ মিনিটে মেইটল্যান্ড রোডে একটি গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, একটি টয়োটা করোলা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তা ছেড়ে বিদ্যুতের খুঁটিতে আঘাত করে, এরপর গাড়িটিতে আগুন ধরে যায়। আশপাশের লোকজন দ্রুত এগিয়ে এসে চালক ইফতেখার আলম রাফী (২৪) এবং তার পেছনের সিটে থাকা নাজমুস সাকিব আলিফ (১৯) -কে বের করে আনতে সক্ষম হন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, চালকের পাশে সামনের সিটে বসা মুহতাসিম কামাল চৌধুরী মাহিন (২২) এবং ঠিক তার পেছনের সিটে বসা আদিব ফারহান (১৯) গাড়ির ভেতরেই আটকা পড়েন। দমকল বাহিনী এসে তাদের উদ্ধার করে জন হান্টার হাসপাতালে (John Hunter Hospital) নিয়ে গেলেও ভোর ৫ টার দিকে চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন যে, মারাত্মকভাবে অগ্নিদগ্ধ এই দুই তরুণ জীবনের কাছে হেরে গেছেন।
গাড়িতে থাকা চারজনই ছিলেন নিউক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি (IT) বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ইফতেখার আলম রাফী মাস্টার্স করছিলেন, আর বাকি তিনজন ছিলেন স্নাতক পর্বের ছাত্র।
নিহত আদিব ফারহান ছিলেন ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার দরবারপুর ইউনিয়নের জগৎপুর গ্রামের ভুঁইয়া বাড়ির সন্তান। তার বাবা মোশাররফ হোসেন বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির বর্তমান পরিচালক এবং অতীতে একাধিকবার সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আদিব ছিলেন একাধারে মেধাবী এবং স্বপ্নবাজ। ও লেভেল এবং এ লেভেলে দুর্দান্ত ফলাফল করার পর ফুল স্কলারশিপ নিয়ে মাত্র ছয় মাস আগে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
অন্যদিকে, মুহতাসিম কামাল চৌধুরী মাহিনের বাবা ঢাকায় গার্মেন্টস সেক্টরে ব্যবসা করেন। তাঁদের দেশের বাড়ি দিনাজপুরে, পরিবার থাকেন ঢাকার উত্তরায়। পারিবারিক তথ্য অনুযায়ী, মাহিন ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি উচ্চশিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় আসেন। পরিচিতজনেরা জানিয়েছেন, মাহিন ও আদিব একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বে বাঁধা ছিলেন। আদিবের বাবা মোশাররফ হোসেন বলেন, দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগে বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে আদিবের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। আদিব জানিয়েছিল, সে নিজে রান্না করবে এবং অ্যাসাইনমেন্টের কিছু কাজ বাকি আছে। ১৬ নভেম্বর ২০২৫ তার দেশে আসার টিকিটও কাটা ছিল। কিন্তু নিয়তি তাকে চিরস্থায়ী ঠিকানায় পাঠিয়ে দিল।
আদিব ও মাহিনের অকাল মৃত্যুতে নিউক্যাসলে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে নেমে আসে শোকের ছায়া। তাদের পরিচিতজনরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, যে রুমটিতে তারা আগের রাতেও একসাথে ঘুমিয়েছেন, সেখানে পড়ে ছিল তাদের বাক্সবন্দি নতুন জুতো, ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি আর রঙিন সব স্বপ্ন। মায়ের হাতে আদর করে গুছিয়ে দেওয়া যে পাঞ্জাবিগুলো ঈদে পরবে বলে আগাম দিয়েছিলেন, সেগুলো বাক্সবন্দি হয়েই ফিরে গেছে। নানান আনুষ্ঠানিকতা শেষে নিথর দেহগুলো ফিরতে সময় লেগেছে দীর্ঘ ২০ দিন।
দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ইফতেখার আলম রাফী এবং নাজমুস সাকিব আলিফকে জন হান্টার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আলিফের পরিবার জানায়, তিনি ঢাকার অ্যাপল ট্রি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়াশোনা করেছেন এবং ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পুলিশ ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চালকের বিরুদ্ধে সড়ক নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী গুরুতর অভিযোগের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
নিউক্যাসলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী কমিউনিটি তুলনামূলকভাবে ঘনিষ্ঠ। পড়াশোনা, খণ্ডকালীন কাজ, বাসাভাড়া, রান্নাবান্না, পরিবহন, সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে তারা অনেক সময় বন্ধুদের ওপরই ভরসা রাখে। ফলে এমন দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে শোকটা শুধু ব্যক্তিগত থাকে না, পুরো কমিউনিটির ওপর নেমে আসে। আদিব ও মাহিনের ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে।
নিউক্যাসলের এই ঘটনার আগে ও পরে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর আরও কিছু সংবাদ কমিউনিটিকে নাড়া দিয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে সিডনির একটি আবাসিক এলাকায় গাড়িচাপায় প্রাণ হারান লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর পৌরসভার বাসিন্দা মো. ইসমাইল হোসেন। ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (UTS)-এর এই শিক্ষার্থী মাত্র এক বছর আগে বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন।
ঘটনার দিন রাতে নিজ বাসার কাছেই তিনি মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হন। তার এক বন্ধু ড্রাইভিং অনুশীলনের সময় স্টিয়ারিং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে গাড়িটি পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইসমাইলকে চাপা দেয় এবং ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
এদিকে ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর দক্ষিণ পূর্ব মেলবোর্নে বসবাসরত ২২ বছর বয়সী বাংলাদেশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আলিম আল রাফির আকস্মিক মৃত্যুর খবর কমিউনিটিতে আরেক দফা শোকের ঢেউ তোলে। কমিউনিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সোমবার রাত ১১টা ৩০ মিনিটে তিনি হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। অস্ট্রেলিয়ায় রাফির কোনো নিকট আত্মীয় বা অভিভাবক না থাকায় বিষয়টি দ্রুতই এক মানবিক সংকটে রূপ নেয়। বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যরা এটিকে কেবল শোকবার্তা হিসেবে নয়, মানবিক দায়িত্ব হিসেবেও দেখেন। তারা রাফির পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মরদেহ দ্রুত দাফন বা দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেন।
এই দুটো খবর, আর নিউক্যাসলের আদিব ও মাহিনের মৃত্যু, একসঙ্গে দেখলে অভিভাবকদের উদ্বেগ আরও স্পষ্ট হয়। কারণ এখানে মৃত্যুর ধরন এক নয়, তবু অনিশ্চয়তা একই। কখনও সড়ক দুর্ঘটনা, কখনও শরীরের হঠাৎ বিপর্যয়, আর কখনও দূরদেশে একা থাকা অবস্থায় জরুরি মুহূর্তে পাশে পরিবার না থাকার বাস্তবতা।
প্রশ্ন কেবল শোকের নয়, দায়িত্বের প্রশ্নও। শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ড্রাইভিং সচেতনতা, রাতের যাত্রায় ঝুঁকি বোঝার শিক্ষা, মানসিক চাপ মোকাবিলায় পরিবার এবং কমিউনিটি সাপোর্ট, জরুরি অবস্থায় দ্রুত সহায়তার কার্যকর কাঠামো, এসব নিয়ে অভিভাবক, শিক্ষার্থী, কমিউনিটি সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। স্বপ্নের মূল্য যাতে একটি অনিয়ন্ত্রিত মুহূর্তে এমন চূড়ান্ত ক্ষতিতে না রূপ নেয়, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমানো এই মেধাবীদের হারিয়ে যাওয়া কেবল তাদের পরিবারের নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশের এক অপূরণীয় ক্ষতি। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে থাকে এক একটি অসমাপ্ত গল্প। আদিব, মাহিন, ইসমাইল এবং আলিমের গল্পগুলো তেমনই বিষাদময় আখ্যান, যা আমাদের দীর্ঘদিন ভাবিয়ে রাখবে, সতর্ক করবে, এবং দায়িত্বশীল হতে শেখাবে।
আল্লাহ শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোকে কঠিন শোক সহ্য করার ধৈর্য দান করুন। এই অসহনীয় ক্ষতির ভার বহন করার শক্তি দিন, বুকের ভেতরের হাহাকারকে সহনীয় করে তুলুন। যে মা সন্তান হারিয়ে দিশেহারা, যে বাবা চোখের পানি লুকিয়ে নির্বাক হয়ে যান, যে ভাইবোন শূন্য ঘরে বারবার ফিরে তাকায়, তাদের সবাইকে সান্ত্বনা দিন।
তথ্যসূত্র:
ABC News (২ সেপ্টেম্বর ২০২৫)
Newcastle Herald (২ সেপ্টেম্বর ২০২৫)
NBN News (৩১ আগস্ট ২০২৫)









