ভারতের ইতিহাসের বৃহত্তম প্রতিরক্ষা চুক্তি: ১১৪টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার পথে দিল্লি

ভারত, ১০ ফেব্রুয়ারি – ইতিহাসের অন্যতম বড় সামরিক কেনাকাটার প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারত। ভারতীয় বিমান বাহিনীর মাল্টি রোল ফাইটার এয়ারক্রাফট বা এমআরএফএ কর্মসূচির অধীনে ফ্রান্স থেকে ১১৪টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল চুক্তিটি চলতি সপ্তাহেই ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেতে পারে বলে জানা গেছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ দিল্লি সফরে আসার ঠিক আগেই এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে এনডিটিভির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন এই চুক্তিটি চূড়ান্ত হলে তা হবে ভারতের সামরিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রয় সংক্রান্ত চুক্তি। নতুন এই চুক্তিতে কেবল যুদ্ধবিমান কেনাই নয় বরং ভারতের মাটিতে রাফাল উৎপাদনের বিষয়টিতেও জোর দেওয়া হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী প্রায় ১০০টি রাফাল যুদ্ধবিমান ভারতেই তৈরি করা হবে যা দেশটির মেক ইন ইন্ডিয়া কর্মসূচির একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এর ফলে ফ্রান্সের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান প্রযুক্তি ভারতের হাতে আসবে এবং দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব আরও গভীর হবে। এই বিপুল সংখ্যক বিমান যুক্ত হলে ফ্রান্সের বাইরে রাফাল ব্যবহারকারী হিসেবে ভারতের অবস্থান হবে অত্যন্ত শক্তিশালী। দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট এই যুদ্ধবিমান আকাশে আধিপত্য বিস্তার ও নিখুঁত হামলা চালানোর ক্ষমতার জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। বর্তমানে ভারতীয় বিমান বাহিনীর বহরে ৩৬টি রাফাল যুদ্ধবিমান সক্রিয় রয়েছে যার মধ্যে সর্বশেষ সি ভ্যারিয়েন্টের বিমানটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর পাশাপাশি নৌবাহিনীর জন্য ২৬টি এম ভ্যারিয়েন্টের রাফাল কেনার জন্য প্রায় ৬৩ হাজার কোটি টাকার আরেকটি চুক্তি এর মধ্যেই স্বাক্ষরিত হয়েছে। নৌবাহিনীর ওই চুক্তিতে চারটি টুইন সিট প্রশিক্ষণ বিমান এবং রক্ষণাবেক্ষণসহ লজিস্টিক সহায়তার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এনডিটিভির তথ্যমতে ২০৩০ সালের মধ্যে এসব বিমান সরবরাহ করা হতে পারে। নৌবাহিনীর জন্য নির্ধারিত এম ভ্যারিয়েন্টের রাফালগুলো আইএনএস বিক্রান্ত ও আইএনএস বিক্রমাদিত্য নামের দুটি বিমানবাহী রণতরীতে মোতায়েন করা হবে।
অন্যদিকে ভারতীয় বিমান বাহিনীর কাছে থাকা রাফালগুলো হরিয়ানার আম্বালার গোল্ডেন অ্যারোজ স্কোয়াড্রন এবং পশ্চিমবঙ্গের হাসিমারার ফ্যালকনস স্কোয়াড্রনে মোতায়েন করা হয়েছে। ভারতীয় বিমান বাহিনী ইতিমধ্যে রাফালকে সক্রিয় অভিযানে ব্যবহার করেছে। গত বছর মে মাসে পেহেলগাম হামলার পর অপারেশন সিঁদুর নামের সামরিক অভিযানে এই বিমানগুলো অংশ নেয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে ওই অভিযানে রাফাল থেকে আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল যা ২৫০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতেও নিখুঁত আঘাত হানতে সক্ষম। তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে ওই অভিযানে ভারতের একটি রাফাল ভূপাতিত হয়েছিল। প্রসঙ্গত রাফাল যুদ্ধবিমান ইরাক ও লিবিয়ার মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলেও সফলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই যুদ্ধবিমানগুলো দীর্ঘপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং হ্যামার স্ট্যান্ড অফ স্ট্রাইক অস্ত্রসহ অত্যাধুনিক রাডার ও ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ব্যবস্থায় সজ্জিত। উৎপাদন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে গত বছরের জুনে ফ্রান্স ও ভারত ডাসল্ট অ্যাভিয়েশন এবং টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমস লিমিটেডের মধ্যে প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি ঘোষণা করে।
এই চুক্তির আওতায় হায়দরাবাদে টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমস একটি অত্যাধুনিক উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করবে যেখানে রাফাল যুদ্ধবিমানের কাঠামোগত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ তৈরি করা হবে। ২০২৮ সালে এই কারখানা থেকে প্রথম ফিউজলাজ বা বিমানের কাঠামো বের হওয়ার কথা রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতি মাসে দুটি সম্পূর্ণ ফিউজলাজ তৈরি করা হবে এবং চূড়ান্ত সংযোজনের কাজ হবে ফ্রান্সের বোর্দোর কাছে মেরিনিয়াক কারখানায়। এদিকে ভারতীয় নৌবাহিনী ভবিষ্যতে তাদের বহরে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা বা ডিআরডিও বর্তমানে এই বিশেষ ধরনের যুদ্ধবিমান তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
এ এম/ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬









