সম্পাদকের পাতা

টরন্টো পুলিশের অন্ধকার অধ্যায়

নজরুল মিন্টো

কানাডার মতো উন্নত বিশ্বে পুলিশ বাহিনীকে সাধারণত বলা হয় জনআস্থার শেষ দুর্গ। এখানে পুলিশের ইউনিফর্ম মানে শুধু কর্তৃত্ব নয়, দায়িত্বের কঠোর শৃঙ্খলা। টরন্টোর মতো শহরে মানুষ বিশ্বাস করে, জরুরি মুহূর্তে যে হাতটা দরজায় কড়া নাড়বে, সেটি হবে নিরাপত্তার হাত। কিন্তু যখন সেই হাতই গোপনে অপরাধচক্রের সঙ্গে হাত মেলায়, তখন ভাঙে শুধু একটি নিয়ম নয়, ভাঙে আস্থার ভিত্তিপ্রস্তর। টরন্টো পুলিশের অন্দরমহলে যে ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র উন্মোচিত হয়েছে, তা কোনো হলিউড থ্রিলার সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়।

৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। টরন্টো ও আশপাশের এলাকার আটটি ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে একযোগে অভিযান পরিচালিত হয়। ইয়র্ক রিজিওনাল পুলিশ জানায়, এ অভিযানে সাতজন টরন্টো পুলিশ সার্ভিসের সক্রিয় কর্মকর্তা এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহ মোট ২৭ জনকে গ্রেপ্তার ও অভিযুক্ত করা হয়েছে সংগঠিত অপরাধ এবং দুর্নীতির তদন্তে, যার নাম Project South।

৫৬ বছর বয়সী কনস্টেবল টিমোথি বার্নহার্ড যখন নিজের প্রাতঃরাশ শেষ করছিলেন, তখনই ইয়র্ক রিজিওনাল পুলিশের গোয়েন্দারা তাকে ঘিরে ফেলেন। কোনো সিনেমার ক্লাইম্যাক্সের মতো তাকে নির্দেশ দেওয়া হয় নিজের সার্ভিস রিভলভার এবং ব্যাজ জমা দিতে। ১৭টি গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত বার্নহার্ডের চোখের সামনেই তার সাজানো ড্রয়ার থেকে বেরিয়ে আসে অপরাধীদের সাথে যোগাযোগের এনক্রিপ্টেড ফোন এবং অবৈধ লেনদেনের নথিপত্র। একই সময় সার্জেন্ট রবার্ট ব্ল্যাককে যখন আটক করা হয়, তখন তিনি পুলিশেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। সবার সামনে তাকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটি টরন্টো পুলিশ সার্ভিসের কর্মকর্তাদের জন্য ছিল এক চরম লজ্জার মুহূর্ত।

ইয়র্ক পুলিশ এবং সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ঘুষ গ্রহণ, পুলিশি কম্পিউটার সিস্টেমে অননুমোদিত প্রবেশ করে ব্যক্তিগত তথ্য বের করা, অপরাধীদের কাছে সেই তথ্য পৌঁছে দেওয়া, মাদক পাচারে সহায়তা, এবং একটি সংশোধনাগার কর্মকর্তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত অভিযোগ।

তদন্তের সূত্রপাত ২০২৫ সালের জুনে, এবং ঘটনাটি ছিল সত্যিই শিউরে ওঠার মতো। ইয়র্ক রিজিওনাল পুলিশ বলছে, তারা তখন একটি বাড়িতে হত্যার ষড়যন্ত্র ঠেকাতে সক্ষম হয়। ২০ জুন একটি সন্দেহভাজন গাড়ি ওই বাড়ির দিকে এগিয়ে আসে এবং সেখানে অবস্থানরত ইয়র্ক পুলিশের চিহ্নিত ক্রুজারের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়, ঘটনাস্থল থেকে দুই কিশোরসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু নাটকীয়তা ছিল শুধু গ্রেপ্তারে নয়। এই ঘটনার পর তদন্তকারীদের মাথায় সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্নটি উঠে আসে, যে সংশোধনাগার ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করা হয়েছিল, তার ঠিকানা ও ব্যক্তিগত তথ্য অপরাধীদের হাতে পৌঁছাল কীভাবে। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ধীরে ধীরে খুলতে থাকে তথ্যফাঁস এবং যোগসাজশের জাল, এবং Project South নামের দীর্ঘ তদন্ত এক অন্ধকার দুনিয়ার দরজা খুলে দেয়।

তদন্তে উঠে এসেছে যে, টরন্টোর কুখ্যাত ‘টো-ট্রাক’ শিল্পের সাথে এই কর্মকর্তাদের গভীর সখ্য ছিল। অবৈধ গাঁজা(cannabis)-র ডিসপেনসারি বা দোকানগুলোকে পুলিশের অভিযান থেকে বাঁচাতে এই কর্মকর্তারা নিয়মিত মোটা অঙ্কের ঘুষ গ্রহণ করতেন। শুধু তাই নয়, কোকেন ও ফেন্টানিলের মতো মারণাঘাতী মাদক পাচারেও তারা সরাসরি সহায়তা দিয়েছেন বলে প্রমাণ পেয়েছে ইয়র্ক রিজিওনাল পুলিশ। এপি নিউজ জানিয়েছে, তদন্তকারীরা ব্রায়ান দা কস্তাকে নেটওয়ার্কের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে দেখছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই ঘটনায় সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় অস্ত্র নয়, তথ্য। একটি ঠিকানা, একটি নাম, একটি গাড়ির নম্বর, অথবা কারও ব্যক্তিগত পরিচয়পত্রের কাগজ, এসব যখন পুলিশের ডেটাবেস থেকে বেরিয়ে অপরাধীদের হাতে যায়, তখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শক্তিটাই উল্টো দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, তদন্তকারীরা অভিযোগ করছেন কিছু কর্মকর্তা ব্যক্তিগত পরিচয় সংক্রান্ত নথি তথা ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট ও হেলথ কার্ডের মতো পরিচয়পত্রও চুরি করেছিলেন।

এখানে পুলিশের ভুলটা আরও বড় হয়ে ওঠে কারণ তারা অপরাধ করছে এমন অবস্থান থেকে, যেখানে সাধারণ নাগরিকের চেয়ে তাদের ক্ষমতা বহুগুণ। তারা জানে কীভাবে নজর এড়িয়ে তথ্য বের করতে হয়। তারা জানে কোন তথ্য কার কাছে গেলে কতটা ক্ষতি হতে পারে। এই জ্ঞানই যখন অপরাধচক্রের সহায় হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেটি সাধারণ অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্রীয় আস্থার ওপর আঘাত।

টরন্টো পুলিশের এই নজিরবিহীন কলঙ্কজনক অধ্যায় সামনে আসার পর, টরন্টো পুলিশ সার্ভিসের নেতৃত্ব স্বীকার করেছে, এটি বাহিনীর জন্য একটি বেদনাদায়ক এবং লজ্জাজনক মুহূর্ত। সাধারণ মানুষের আস্থা যখন তলানিতে, তখন টরন্টো পুলিশ সার্ভিস (TPS) এবং সিটি প্রশাসন বাধ্য হয়েই আমূল সংস্কারের পথে হাঁটছে। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে টরন্টো পুলিশ চিফ মাইরন ডেমকিউ (Myron Demkiw) এবং মেয়র অলিভিয়া চাউ (Olivia Chow) বেশ কিছু বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছেন।

অভিযুক্তদের তালিকায় বাবা ও ছেলের একসঙ্গে থাকা বিষয়টি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। এপি এবং দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, জন মেডলি সিনিয়র এবং জন মেডলি জুনিয়র নামের দুই ব্যক্তি এই মামলায় অভিযুক্ত, যাদের একজন অবসরপ্রাপ্ত এবং অন্যজন সক্রিয় কর্মকর্তা। তথ্যফাঁসের অভিযোগে এই পারিবারিক যোগসূত্র জনআস্থার সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অনেক শহরের মতো টরন্টোতেও এখন থেকে ডিউটিরত প্রত্যেক অফিসারের জন্য বডি ক্যামেরা বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। নতুন সংস্কারে যুক্ত হয়েছে একটি বিশেষ ধারা ক্যামেরার ফুটেজ কেবল পুলিশের কাছেই থাকবে না, বরং একটি স্বাধীন তদারকি সংস্থা (Civilian Oversight Body) নিয়মিতভাবে এই ফুটেজগুলো রেন্ডম চেক (Random Check) করবে। যাতে করে রাস্তার মোড়ে বা অন্ধকারের আড়ালে কোনো অনৈতিক লেনদেনের সুযোগ না থাকে।

টরন্টো পুলিশ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো (CPD) এবং নিউইয়র্ক পুলিশের (NYPD) সংস্কার মডেলগুলো পর্যালোচনা করছে। শিকাগো পুলিশে যখন ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল, তখন তারা ‘আর্লি ইন্টারভেনশন সিস্টেম’ (Early Intervention System) চালু করেছিল। এই সফটওয়্যারটি কোনো অফিসারের আচরণের ছোটখাটো বিচ্যুতি দেখলেই সংকেত দেয়, যা তাকে বড় অপরাধী হওয়া থেকে বিরত রাখতে সাহায্য করে। টরন্টো এখন একই ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) ভিত্তিক সিস্টেম চালুর পরিকল্পনা করছে।

টরন্টোর সাধারণ নাগরিকরা এখন বিচারিক প্রক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি কেবল কয়েকজনের শাস্তির ঘটনা হবে না, এটি হবে পুরো বাহিনীর জন্য কঠোর নজির। আর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলেও, Project South ইতিমধ্যেই একটি বাস্তবতা সামনে এনেছে, পুলিশি ডেটাবেসের অপব্যবহার কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

নীল উর্দির মর্যাদা ফিরবে কি না, সেটি এখন নির্ধারিত হবে আদালতের প্রমাণ, বাহিনীর আত্মসমালোচনা, এবং ভবিষ্যৎ জবাবদিহির মানদণ্ডে। টরন্টো একটাই উত্তর চাইছে, যে হাতে নিরাপত্তা তুলে দেওয়া হয়েছিল, সে হাত আর কখনো অপরাধের সঙ্গে মিশে যাবে না। বর্তমানে শুরু হওয়া এই কঠোর সংস্কার অন্তত আশার আলো দেখাচ্ছে।

তথ্যসূত্র:

York Regional Police (৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
AP News (৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
The Guardian (৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)


Back to top button
🌐 Read in Your Language