মুক্তমঞ্চ

খেতাব বাতিলের রাজনীতি

আসিফ নজরুল

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখার জন্য বঙ্গবন্ধু সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের চার ধরনের খেতাব প্রদান করে। এর মধ্যে জীবিতদের জন্য সর্বোচ্চ খেতাব ছিল বীর উত্তম। এ খেতাবে ভূষিত মাত্র ৪৯ জন মুক্তিযোদ্ধার একজন ছিলেন প্রয়াত জিয়াউর রহমান। এর প্রায় ৪৮ বছর পরে শাজাহান খানের প্রস্তাবে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) ৯ ফেব্রুয়ারি জিয়াউর রহমানের বীর উত্তম খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জিয়াউর রহমানের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে বলে শাজাহান খান জানান।

বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডে জড়িত চারজনের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রাপ্ত বিভিন্ন খেতাব বাতিলের সুপারিশও করা হয় ৯ ফেব্রুয়ারির সভায়। বঙ্গবন্ধু হত্যায় এ চারজনের অপরাধ আদালতে প্রমাণিত। অন্যদিকে জিয়াউর রহমানের খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্ত হয় বিভিন্ন প্রচারণার ভিত্তিতে, কোনো প্রমাণিত অপরাধের ভিত্তিতে নয়।

জিয়াউর রহমানের খেতাব বাতিলের এই সিদ্ধান্তে দেশে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তিনি সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা করে গোটা জাতিকে উদ্দীপিত করেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের প্রধান ছিলেন। প্রশ্ন আসে, তাঁর খেতাব ৪৮ বছর পর অপ্রমাণিত অভিযোগে বাতিল করা গেলে খেতাব বাতিলের কাজটি ভবিষ্যতে কত দূর যেতে পারে? জিয়াউর রহমান ক্ষমতাসীন সরকারের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দলটির প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর খেতাব বাতিল রাজনৈতিক কারণে কি না, এটি রাজনীতিতে তিক্ততাকে আরও উসকে দেবে কি না, সেটি নিয়েও আলোচনার অবকাশ আছে।

জামুকা প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০২ সালে একটি আইনে। এই আইনবলে এর অন্যতম কাজ হচ্ছে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন ও সনদ প্রদান এবং ‘জাল ও ভুয়া সনদপত্র ও প্রত্যয়নপত্র’ বাতিলের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করা। জামুকার বৈঠকে জিয়াউর রহমানের খেতাব জাল বা ভুয়া এটি বলা হয়নি।

পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুসারে জিয়াউর রহমানের খেতাব বাতিলের কারণ সম্পর্কে বিভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। শাজাহান খান বলেছেন, জিয়ার খেতাব বাতিল হয়েছে বঙ্গবন্ধু হত্যার মদদ দেওয়ার জন্য। জামুকার প্রধান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজ্জাম্মেল হকের বক্তব্য অনুসারে জিয়াউর রহমান সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন, স্বাধীনতাবিরোধী লোকজন নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশত্যাগে সহায়তা করেছেন। আইনমন্ত্রী প্রশ্ন করেছেন, কেউ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নষ্ট করলে তাঁর কি খেতাব রাখার অধিকার আছে?

জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা কিছু অভিযোগ তথ্যগতভাবে সঠিক নয়। যেমন তখনকার সামরিক কর্মকর্তাদের বিভিন্ন গ্রন্থ অনুসারে, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা যখন হয়, তখন তিনি গৃহবন্দী ছিলেন। তাঁদের বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাটি হয় রক্তপাত এড়ানোর জন্য খালেদ মোশাররফের সঙ্গে তাঁদের আপস আলোচনার অংশ হিসেবে (সূত্র: এ–সম্পর্কিত মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী, লে. কর্নেল এম এ হামিদ ও মেজর হাফিজউদ্দিনের গ্রন্থ)। তবে পরবর্তী সময়ে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রে জিয়ার সহায়তা ছিল।

জিয়ার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু হত্যার মদদের অভিযোগ আওয়ামী লীগ প্রায়ই করে থাকে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে আওয়ামী লীগ আমলে দায়েরকৃত ও বিচারকৃত বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জিয়াকে আসামি করা হয়নি, এর রায়ে হত্যাকাণ্ডে জিয়ার সংশ্লিষ্টতার কথাও বলা হয়নি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড রোধে জিয়াসহ সেনাবাহিনীর তৎকালীন কর্তাব্যক্তিদের ব্যর্থতা ছিল। তবে এটি রোধের মূল দায়িত্ব ছিল তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল সফিউল্লাহ ও ঢাকার ৪৬ ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেডের কমান্ডার এবং রক্ষীবাহিনীর কর্মকর্তাদের।

জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের একজন বেনিফিশিয়ারি ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের ৯ দিন পর জিয়াকে সেনাবাহিনীর প্রধান করা হয়, তবে তাঁর ওপর স্থান দেওয়া হয় আরও দুজন সামরিক কর্মকর্তাকে। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানীকে প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয় এবং মেজর জেনারেল খলিলুর রহমানকে ‘চিফ অব ডিফেন্স’ স্টাফ নিয়োগ করা হয়। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে: বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে এ প্রেক্ষাপটে জিয়ার খেতাব কেড়ে নেওয়া হলে, মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানীর খেতাবও কেড়ে নেওয়ার যৌক্তিকতা তৈরি হয় কি না।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টে তিন বাহিনীর প্রধানদের দুজন ছিলেন বীর উত্তম খেতাবধারী, তাঁরাও বঙ্গবন্ধুর খুনি সরকারের কাছে আনুগত্য স্বীকার করেছিলেন। পরিস্থিতির চাপ ছিল, এ চাপ এড়ানোর জন্য পদত্যাগ করার সুযোগ তাঁদের ছিল। সেটি তাঁরা করতে পারেননি বলে তাঁদেরও কি খেতাব বাতিলের দাবি ওঠা সংগত? এ জাতিকে এভাবে কি প্রায় বীর উত্তম–শূন্য করে ফেলব আমরা? মুক্তিযুদ্ধের বীরদের এভাবে ছেঁটে ফেলা কি মুক্তিযুদ্ধেরই চরম অবমাননা হবে না?

জিয়া মুক্তিযুদ্ধের সংবিধানের মূলনীতি বাতিল করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লঙ্ঘন করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। সংবিধান থেকে জিয়া ধর্মনিরপেক্ষতা মূলনীতিটি বাতিল করেছিলেন সত্য। কিন্তু জিয়াউর রহমানের সংযোজন করা ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ আর এরশাদ প্রবর্তিত ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ সংবিধানে রেখেছে তো এখনকার আওয়ামী লীগ সরকারই। এগুলো কি ধর্মনিরপেক্ষতা?

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে বৃহত্তর অর্থে ১৯৭২ সালের সংবিধানের কথা বলা যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ১৯৭২ সালের সংবিধানের চরিত্রহরণ স্বাধীনতার পর প্রতিটি আমলেই হয়েছে (যেমন চতুর্থ, পঞ্চম, সপ্তম)। এ দেশের উচ্চ আদালত ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ বলে রায় দিয়ে জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত ব্যবস্থা রেখে দিয়েছেন। এসব শাসনতান্ত্রিক বিতর্কের বিষয়। ভুয়া নির্বাচন, অবাধ দুর্নীতি, চরম দলীয়করণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী। এটি কারা কতটুকু করেছে তা রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। এসব বিতর্ক মুক্তিযুদ্ধের সর্বোচ্চ খেতাব কেড়ে নেওয়ার ভিত্তি হতে পারে না।

জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ সত্যি। তিনি কয়েকজন চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধীকে মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়েছিলেন। এ জন্য তাঁর সমালোচনা হতে পারে। বঙ্গবন্ধু নিজে দেশ স্বাধীনের পর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকা পালনকারী কয়েকজন পুলিশ আর গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে আমলাতন্ত্রে রেখে দিয়েছিলেন, তিনি ১৯৭১ সালে গণহত্যার অন্যতম নায়ক জুলফিকার আলী ভুট্টোকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ করে নিয়েও এসেছিলেন। তৎকালীন রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় হয়তো এর প্রয়োজন ছিল। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, জিয়াউর রহমানের সমর্থকেরাও একই কথা বলে থাকেন। হতে পারে তাঁর সমর্থকেরা অসত্য বলছেন, হতে পারে জিয়াউর রহমানের উদ্দেশ্য ভালো ছিল না। কিন্তু এসব বিতর্ক খেতাব কেড়ে নেওয়ার ভিত্তি হয় কী করে?

জিয়ার খেতাব কেড়ে নেওয়ার সমর্থনে সরকারপক্ষ থেকে নোবেল পুরস্কার আর ডক্টরেট প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে। নোবেল প্রত্যাহারের কোনো তথ্য আমার জানা নেই। আর ডক্টরেট প্রত্যাহার হয়ে থাকে ডক্টরেট নকল— এ মর্মে তদন্ত প্রমাণিত হলে। তার সঙ্গে একজন সেক্টর কমান্ডারের যুদ্ধে অর্জিত খেতাবের কীভাবে তুলনা হয়?

আমাদেরই মতো যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে আমেরিকা, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, জিম্বাবুয়েসহ অনেক দেশ। স্বাধীনতাযুদ্ধের শৌর্যে-বীর্যে অর্জিত খেতাব এসব কোনো দেশে পরবর্তী সময়ে শুধু কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে বাতিল করা হয়েছে বলে আমার জানা নেই।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিক্ততা আর ঘৃণার শেষ নেই। এসব তিক্ততা জারি থাকলে বা বাড়লে অনৈক্য আর হানাহানি বাড়ে, দেশের অন্তর্নিহিত শক্তি কমে যায়, রাষ্ট্রসত্তা দুর্বল হয়ে পড়ে। কোনো কোনো মহলের জন্য তা লাভজনক হলেও দেশের জন্য তা চরম ক্ষতিকর।

মুক্তিযুদ্ধের খেতাব বাতিলকে কি এমন কোনো হাতিয়ারে পরিণত করার চেষ্টা চলছে?

আসিফ নজরুল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক

এন এইচ, ১৩ ফেব্রুয়ারি

Back to top button