
কানাডার রাজনীতি যেন এক বিশাল দাবার বোর্ড, যেখানে চালগুলো নির্ধারিত হয় জনসেবার নিরিখে। এখানে রাজনীতির ময়দান অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন এবং সুশৃঙ্খল। অটোয়ার পার্লামেন্ট হিল থেকে শুরু করে টরন্টোর কুইন্স পার্ক কিংবা সিটি হল প্রতিটি স্তরই জনগণের স্বার্থে নিবেদিত। কানাডার রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি অনন্য দিক হলো, এখানে পদের চেয়ে কর্মকে বড় করে দেখা হয়। একজন ফেডারেল এমপি যখন প্রভিনশিয়াল বা প্রাদেশিক রাজনীতিতে ফিরে আসেন, কিংবা একজন মেয়র যখন কাউন্সিলর হওয়ার লড়াইয়ে নামেন, তখন সেটিকে কোনোভাবেই ক্ষমতার ‘অবনতি’ হিসেবে দেখা হয় না। বরং একে দেখা হয় নতুন উদ্যমে জনগণের কাছে যাওয়ার একটি সোপান হিসেবে। কানাডীয় রাজনীতিবিদদের মূল দর্শনই হলো যেখানেই সুযোগ পাওয়া যাবে, সেখান থেকেই জনসেবা নিশ্চিত করা।
বর্তমানে স্কারবরো সাউথওয়েস্ট কানাডার রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বিল ব্লেয়ারের পদত্যাগের ঘোষণা এবং যুক্তরাজ্যে কানাডার হাই কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর তাঁর ফেডারেল আসনটি শূন্য হয়। এই শূন্যস্থান ঘিরেই শুরু হয় রাজনৈতিক অদলবদলের এক দ্রুত স্রোত। এর পরদিন ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অন্টারিও এনডিপির ডেপুটি লিডার ও এমপিপি ডলি বেগমকে ফেডারেল লিবারেল প্রার্থী করা হয়, এবং তিনি এনডিপি থেকে পদত্যাগ করেন। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নাটক আরও ঘনীভূত হয়, যখন লিবারেল এমপি নেট এরস্কিন স্মিথ জানান যে, তিনি ডলি বেগমের ছেড়ে দেওয়া প্রাদেশিক আসনে নির্বাচন করবেন, পাশাপাশি অন্টারিও লিবারেল পার্টির নেতৃত্বের দৌড়েও নামবেন।
নাথানিয়েল এরস্কিন-স্মিথ বা নেট এরস্কিন-স্মিথ। এই নামটি বর্তমান কানাডীয় রাজনীতিতে এক অমিত সম্ভাবনার নাম। তারুণ্যের তেজ, মেধা আর জনগণের সাথে মিশে যাওয়ার অদ্ভুত এক ক্ষমতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। টরন্টোর এই অঞ্চলে তাঁর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। নেটের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা এই স্কারবরো এবং টরন্টো এলাকাতেই। তাঁর পারিবারিক পটভূমি এবং ব্যক্তিগত জীবন অত্যন্ত স্বচ্ছ ও অনুপ্রেরণামূলক।

নেট এরস্কিনের বাবা ও মা দুজনেই ছিলেন শিক্ষক। ফলে ছোটবেলা থেকেই একটি রুচিশীল ও জ্ঞানভিত্তিক পরিবেশে তিনি বেড়ে উঠেছেন। কুইন্স ইউনিভার্সিটি থেকে রাজনীতি ও আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে তিনি লন্ডনের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর স্ত্রী অ্যামিও একজন পেশাদার পুষ্টিবিদ। তাঁদের পারিবারিক জীবন অত্যন্ত সাদামাটা অথচ আধুনিক। ব্যক্তিগত জীবনে নেট একজন নিরামিষভোজী এবং প্রাণী অধিকার নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করেন।
টরন্টোর বাংলাদেশি কমিউনিটির কাছে নেট এরস্কিন-স্মিথ এক অতি পরিচিত মুখ। এখানকার বাঙালিরা তাঁকে শুধু একজন এমপি হিসেবে নয়, বরং একজন আপনজন হিসেবে দেখেন। বাংলাদেশি কমিউনিটির বহু সামাজিক বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নেটের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তাঁর অমায়িক ব্যবহার এবং মানুষের কথা ধৈর্য ধরে শোনার অভ্যাস তাঁকে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তুলেছে। অনেক অভিবাসী বাংলাদেশি মনে করেন, নেট এরস্কিন-স্মিথ এমন একজন রাজনীতিবিদ যিনি অভিবাসীদের সংকট এবং স্বপ্নগুলো খুব কাছ থেকে অনুধাবন করেন। গত ওন্টারিও লিবারেল লিডারশিপ রেসে তিনি দ্বিতীয় হয়েছিলেন, যা প্রমাণ করে দলের ভেতর ও বাইরে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কতটা প্রবল।
নেট এরস্কিন-স্মিথ তাঁর বিবৃতিতে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তাঁর মূল লক্ষ্য এখন ওন্টারিও লিবারেল পার্টিকে পুনর্গঠন করা। বর্তমান প্রাদেশিক সরকারের ‘অযোগ্যতা’ এবং ‘স্বার্থান্বেষী’ রাজনীতির বিপরীতে তিনি এক প্রগতিশীল ও শক্তিশালী ওন্টারিও গড়তে চান। তাঁর এই অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে, একজন দক্ষ রাজনীতিকের কাছে অটোয়ার গ্ল্যামারাস ফেডারেল পদের চেয়ে নিজ প্রদেশের মানুষের সেবা করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ডলি বেগমের ফেডারেল রাজনীতিতে যাত্রা এবং নেট এরস্কিন স্মিথের প্রাদেশিক রাজনীতিতে প্রবেশ, এই দুই দিকের স্রোত স্কারবরো সাউথওয়েস্টের রাজনীতিকে এক নতুন মোড়ে নিয়ে গেছে। ফেডারেল স্তরে বিল ব্লেয়ারের আসন শূন্য হওয়ায় সেখানে উপনির্বাচনের প্রক্রিয়া এগোবে ফেডারেল নিয়ম অনুযায়ী। অন্যদিকে ডলি বেগমের এমপিপি পদ শূন্য হওয়ায় কুইন্স পার্কের জন্য উপনির্বাচন ডাকবেন অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড, সাধারণভাবে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই। এই সময়টায় নেট এরস্কিন স্মিথ ফেডারেল পার্লামেন্টে দায়িত্ব পালন করলেও তাঁর রাজনৈতিক মনোযোগ ক্রমেই কুইন্স পার্কের দিকেই সরে যাচ্ছে।
কানাডার রাজনীতিতে ফেডারেল থেকে প্রাদেশিক, কিংবা প্রাদেশিক থেকে ফেডারেল এই যাতায়াতই গণতন্ত্রের একটি দৃশ্যমান সৌন্দর্য। এখানে ক্ষমতার চেয়ে দায়িত্ববোধ, এবং পদমর্যাদার চেয়ে কাজের পরিসর অনেক সময় বড় হয়ে ওঠে। নেট এরস্কিন স্মিথের মতো তরুণ রাজনীতিবিদরা সেই ধারণাকেই সামনে আনছেন, যেখানে রাজনীতির মানে কেবল উচ্চ পদ নয়, বরং যেখানে মানুষকে সবচেয়ে বেশি কাজে লাগা যায় সেখানেই দাঁড়ানো। এখন স্কারবরোর ভোটাররা অপেক্ষায় আছেন, উপনির্বাচনের মাঠে তিনি নিজেকে কীভাবে নতুন করে প্রমাণ করেন, আর তাঁর এই নতুন যাত্রা প্রাদেশিক রাজনীতিতে কী বার্তা রেখে যায়। অভিনন্দন নেট এরস্কিন স্মিথ।
তথ্যসূত্র:
CityNews (৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
Global News (৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
Liberal Party of Canada (৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)









