
কানাডার মূলধারার রাজনীতিতে এক বিশাল নাটকীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বসন্তের আগাম হাওয়া বইতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আনুগত্যের দেয়াল ভেঙে অন্টারিও নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টির (NDP) অন্যতম শীর্ষ নেতা ও জনপ্রিয় এমপিপি ডলি বেগম ফেডারেল লিবারেল পার্টিতে যোগদানের ঘোষণা দিয়েছেন। মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে লিবারেল পার্টি অব কানাডার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয় যে, স্কারবরো সাউথওয়েস্ট আসনের আসন্ন ফেডারেল উপ-নির্বাচনে ডলি বেগম প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির নেতৃত্বাধীন লিবারেল দলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
কানাডার আইনসভায় নির্বাচিত প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপিপি হিসেবে ডলি বেগম যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন, এবার ফেডারেল রাজনীতিতে তাঁর এই পদার্পণ দেশজুড়ে বিশেষ করে অভিবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির মাঝে এক নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে।
ডলি বেগম ২০১৮ সাল থেকে স্কারবরো সাউথওয়েস্টের প্রাদেশিক এমপিপি হিসেবে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। কুইন্স পার্কে তিনি কেবল একজন আইনপ্রণেতা ছিলেন না, বরং অন্টারিও এনডিপি-র ডেপুটি লিডার এবং বিরোধী দলের একজন শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। টানা তিনটি নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়লাভ করে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সাধারণ মানুষের হৃদয়ে তাঁর শেকড় কতটা গভীরে।
তবে প্রাদেশিক রাজনীতি থেকে ফেডারেল বা কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তাঁর এই উত্তরণ কেবল ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের পরিবর্তন নয়, বরং কানাডার বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণের এক বিশাল মোড় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে বিল ব্লেয়ারের মতো একজন হেভিওয়েট নেতার শূন্য আসনে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হওয়া লিবারেলদের জন্য বড় এক কৌশলগত বিজয়।
গত সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) স্কারবরো সাউথওয়েস্টের দীর্ঘদিনের এমপি এবং কানাডার সাবেক পুলিশ প্রধান বিল ব্লেয়ার ঘোষণা দেন যে, তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নিচ্ছেন এবং যুক্তরাজ্যে কানাডার পরবর্তী হাই কমিশনার হিসেবে নতুন কূটনৈতিক দায়িত্ব গ্রহণ করছেন। ২০১৫ সাল থেকে ব্লেয়ার এই আসনে লিবারেলদের আধিপত্য বজায় রেখেছিলেন, যেখানে প্রতিবারই তিনি গড়ে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছেন।
ব্লেয়ারের এই বিদায়ের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই লিবারেল পার্টি ডলি বেগমের মতো একজন তুখোড় নেতাকে তাদের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রীতিমতো চমকে দিয়েছে। লিবারেল পার্টি অব কানাডার প্রেসিডেন্ট সাচিত মেহরা তাঁর বিবৃতিতে বলেন, “ডলি বেগমের জনসেবার রেকর্ড অতুলনীয়। তিনি কেবল একজন দক্ষ রাজনীতিক নন, বরং সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির নতুন টিমে ডলি বেগমের মতো নেতৃত্বের সংযুক্তি কানাডাকে আরও সমৃদ্ধ করবে।”
ডলি বেগম তাঁর আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে লিবারেল দলে যোগ দেওয়ার কারণ হিসেবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির দূরদর্শী নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “আমি গত সাত বছর ধরে স্কারবরো সাউথওয়েস্টের মানুষের জন্য লড়াই করেছি। তবে দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে আমার মনে হয়েছে, আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ার জন্য কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কাজ করা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির নেতৃত্বে আমি সেই লক্ষ্য অর্জন করতে চাই।”
ডলি বেগম আরও যোগ করেন যে, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা এবং কানাডাকে একটি ঐক্যবদ্ধ ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ নিতে তিনি প্রস্তুত। তাঁর এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই ‘কানাডিয়ান ড্রিম’ বা অভিবাসীদের সফলতার এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
মৌলভীবাজারের মনুনদী পাড়ের মেয়ে ডলি বেগমের এই রাজনৈতিক উত্থান কানাডায় বসবাসরত লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশির জন্য এক গর্বের মুহূর্ত। তিনি প্রথম বাংলাদেশি-কানাডিয়ান হিসেবে প্রাদেশিক আইনসভায় গিয়ে যে পথ দেখিয়েছিলেন, এবার অটোয়ার পার্লামেন্ট হিলে তাঁর পদধ্বনি শোনার অপেক্ষায় অভিবাসীরা। স্কারবরো সাউথওয়েস্ট এলাকাটি বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের আবাসস্থল। ফলে ডলি বেগমের এই দলবদল এই নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের মাঝেও নতুন মেরুকরণ তৈরি করছে।
ডলি বেগমের ফেডারেল রাজনীতিতে প্রবেশ কানাডার রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের সূচনা করলো। একজন অভিবাসী নারী হিসেবে তিনি যেভাবে মূলধারার রাজনীতিতে নিজের স্থান করে নিয়েছেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। আগামী উপ-নির্বাচনে তাঁর জয় কেবল একজন ব্যক্তির জয় হবে না, তা হবে দীর্ঘদিনের শ্রম ও সততার স্বীকৃতি।
কুইন্স পার্ক থেকে অটোয়ার পার্লামেন্ট হিলের পথে ডলি বেগমের এই ঐতিহাসিক যাত্রা আমাদের জন্য গর্বের। তাঁর নতুন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই। আমরা বিশ্বাস করি, ফেডারেল পর্যায়ে তাঁর বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর আরও কার্যকরভাবে জনস্বার্থের পক্ষে ভূমিকা রাখবে। ‘দেশে বিদেশে’ পরিবারের পক্ষ থেকে ডলি বেগমের এই নতুন অধ্যায়ের জন্য রইল আন্তরিক শুভকামনা।
তথ্যসূত্র:
- Liberal Party of Canada (৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
- CityNews (৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)









