
আটলান্টিক মহাসাগরের নীল জলরাশির বুকে জেগে থাকা এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের নাম ‘লিটল সেন্ট জেমস’। দূর থেকে দেখলে একে স্বর্গের এক টুকরো অংশ মনে হতে পারে। ধবধবে সাদা বালুচর, পাম গাছ আর বিলাসবহুল অট্টালিকা। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে এই দ্বীপটিই হয়ে উঠেছে বিশ্বের সবচেয়ে কুখ্যাত স্থান। মানচিত্রে এর অস্তিত্ব খুঁজে পেতে বেগ পেতে হতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এটি নাম লিখিয়েছে ‘পাপের দ্বীপ’ নামে, আর কিছু গণমাধ্যমে একে ‘Sin Island’ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এই দ্বীপের একচ্ছত্র মালিক ছিলেন জেফ্রি এপস্টেইন। তিনি একজন আমেরিকান কোটিপতি এবং রহস্যময় বিনিয়োগকারী। যার বন্ধু তালিকায় ছিলেন বিশ্বের দাপুটে রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে রাজপুত্র, নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী এবং হলিউড সুপারস্টাররা।
জেফ্রি এপস্টেইন কোনো সাধারণ অপরাধী ছিলেন না। উচ্চবিত্ত সমাজে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন এক ধরনের অঘোষিত ‘কিংমেকার’ ও দক্ষ ‘নেটওয়ার্কার’ হিসেবে। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে সাধারণ এক গণিত শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও, সামান্য শিক্ষকতা থেকে কীভাবে তিনি অঢেল সম্পদের মালিক হলেন এবং প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠতা অর্জন করলেন, তা আজও বহু প্রশ্নের জন্ম দেয়।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এপস্টেইন তো মারা গেছেন ২০১৯ সালে, তবু ২০২৬ সালে এসে কেন আবার বিশ্বজুড়ে এত আলোচনার ঝড়। এর নেপথ্যে রয়েছে একাধিক আইনি প্রক্রিয়া এবং নথি উন্মুক্ত হওয়ার ধারাবাহিকতা। ২০১৫ সালে ভার্জিনিয়া জুফ্রে গিসলেইন ম্যাক্সওয়েলের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন, সেই মামলার ডিসকভারি পর্যায়ের বহু নথি দীর্ঘদিন সিল ছিল। এরপর ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে নিউ ইয়র্কের বিচারক লোরেটা প্রেসকা ওই মামলার সঙ্গে যুক্ত নথিপত্র জনসমক্ষে আনার নির্দেশ দেন। আর সাম্প্রতিকভাবে ২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ‘Epstein Files Transparency Act’ অনুসারে প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন পৃষ্ঠার নথি প্রকাশের ঘোষণা দেয়, যার পর নতুন করে বৈশ্বিক বিতর্ক তীব্র হয়। এই ফাইলগুলো কেবল কাগজের স্তূপ নয়, এগুলো হলো ক্ষমতার অপব্যবহারের এক জীবন্ত দলিল। জেফ্রি এপস্টেইন এবং তার সহযোগী গিসলেইন ম্যাক্সওয়েলের অন্ধকার কর্মকাণ্ডের প্রমাণ হিসেবে এই বিশাল নথিপত্র উন্মোচনের পর থেকে বের হয়ে আসছে এমন সব তথ্য, যা শুনলে গা শিউরে ওঠে।
এপস্টেইনের বিরুদ্ধে তদন্তের সূত্রপাত হয়েছিল অনেক আগেই। ২০০৫ সালে ফ্লোরিডায় প্রথম তার বিরুদ্ধে এক নাবালিকাকে যৌন হেনস্তার অভিযোগ ওঠে। কিন্তু ক্ষমতার দাপট কতখানি হতে পারে, তার প্রমাণ মেলে ২০০৮ সালে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় একটি অতি বিতর্কিত ও সমালোচিত ‘নন-প্রসিকিউশন এগ্রিমেন্ট’ বা সমঝোতার মাধ্যমে তিনি বড় ধরনের সাজা থেকে বেঁচে যান। মাত্র ১৩ মাস জেল খাটেন তিনি, তাও আবার দিনের বেলা বাইরে নিজের অফিসে কাজ করার অনুমতি নিয়ে! এই অধ্যায়কে বহু সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষক আধুনিক বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখেন। তৎকালীন প্রসিকিউটর আলেকজান্ডার অ্যাকোস্টা পরবর্তীতে ট্রাম্প প্রশাসনে শ্রমমন্ত্রী হয়েছিলেন, কিন্তু এই কলঙ্কজনক সমঝোতার দায়ে তাকে পদত্যাগ করতে হয়।
এপস্টেইনের ব্যক্তিগত জেটের কুখ্যাত ডাকনাম ছিল ‘ললিটা এক্সপ্রেস’। এটি কেবল একটি বিমান ছিল না, ছিল এপস্টেইনের অন্ধকার বলয়ের চলমান মঞ্চ। নথি এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই জেটে করে নামিদামি অতিথিদের নিয়ে যাওয়া হতো তার ব্যক্তিগত দ্বীপে। তবে এই যাতায়াতের উল্লেখ মানেই অপরাধে জড়িত থাকা নয়। আদালত নথি ও সাক্ষ্যভিত্তিক অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি নাবালিকাসহ কিশোরীদের শোষণ ও পাচারের একটি নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন এবং ক্ষমতাবানদের কাছ থেকে সুবিধা আদায়ে সম্পর্ককে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতেন। ফাইলে থাকা ফ্লাইং লগ বা বিমানের যাতায়াত তালিকা থেকে জানা যায়, কারা কোথায় গিয়েছেন এবং কার সঙ্গে ছিলেন। এই নামগুলোই এখন বিশ্বজুড়ে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছে, কারণ তারা রাষ্ট্রক্ষমতা, রাজপরিবার এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতির শীর্ষ চূড়ায় বসা মানুষ।
ফাইলগুলোতে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন ব্যক্তির নাম রয়েছে। উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন। তিনি এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন এবং কয়েকবার তার বিমানে ভ্রমণ করেছেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। যদিও ক্লিনটন দাবি করেছেন তিনি এপস্টেইনের অপরাধ সম্পর্কে জানতেন না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামও কিছু জবানবন্দি বা যোগাযোগের প্রসঙ্গে এসেছে, তবে সাম্প্রতিক প্রকাশিত নথিতে তার দ্বীপে যাতায়াত বা অপরাধে সম্পৃক্ততার স্পষ্ট প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি।
এপস্টেইনের জালে কেবল রাজনীতিকরাই নয়, আটকা পড়েছিলেন সিলিকন ভ্যালি ও বিশ্ব অর্থনীতির মোড়লরাও। ২০২৬ সালের সর্বশেষ ফাইলগুলোতে বিল গেটস এবং ইলন মাস্কের মতো ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে।
নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৩ সালে এপস্টেইন নিজেকেই একটি ই-মেইল পাঠিয়েছিলেন যেখানে বিল গেটসের ব্যক্তিগত জীবনের সংঘাতের কথা উল্লেখ ছিল। অভিযোগ উঠেছে, রুশ ব্রিজ খেলোয়াড় মিলা আন্তোনোভা এবং অন্যান্য নারীদের সাথে বিল গেটসের ‘বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক’ তৈরির সুযোগ করে দিতেন এপস্টেইন। এমনকি বিল গেটস যখন এপস্টেইনের একটি চ্যারিটি ফান্ডে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান, তখন এই তথ্যের ভিত্তিতে তাকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টাও করা হয়।
ফাইলগুলোতে ইলন মাস্ক ও এপস্টেইনের মধ্যে ২০১২-১৩ সালের বেশ কিছু ই-মেইল আদান-প্রদানের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১২ সালের নভেম্বরে এপস্টেইন মাস্ককে জিজ্ঞেস করেছিলেন, হেলিকপ্টারে করে তার দ্বীপে কতজন আসবে। উত্তরে মাস্ক লিখেছিলেন, “সম্ভবত শুধু তালুলাহ (মাস্কের তৎকালীন স্ত্রী) আর আমি। আপনার দ্বীপে সবচেয়ে উন্মত্ত পার্টি (Wildest Party) কোন দিন বা রাতে হবে?”। যদিও মাস্ক পরবর্তীতে দাবি করেছেন তিনি কখনো সেই দ্বীপে যাননি।
ভার্জিন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ব্র্যানসনের সাথে এপস্টেইনের গভীর সখ্যতার প্রমাণ মিলেছে ই-মেইলে। ২০১৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ব্র্যানসন এপস্টেইনকে লিখেছিলেন, “আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে সত্যিই দারুণ লাগল। তবে শর্ত হলো, যখনই আসবেন, আপনার হারেমকে (সঙ্গী) সঙ্গে নিয়ে আসতে হবে”। ব্র্যানসনের মুখপাত্র পরে দাবি করেছেন, ‘হারেম’ বলতে এপস্টেইনের প্রাপ্তবয়স্ক কর্মীদের বোঝানো হয়েছিল।
এপস্টেইন ফাইলসের সাম্প্রতিক উন্মোচনে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী ব্যক্তিদের নাম সবচেয়ে বেশি চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক এবং জেফ্রি এপস্টেইনের মধ্যে অত্যন্ত নিবিড় ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। ফাঁস হওয়া নথি অনুযায়ী, এহুদ বারাক এপস্টেইনের নিউ ইয়র্কের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে একাধিকবার অবস্থান করেছেন। এমনকি ড্রোন কোম্পানি এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক চুক্তিতেও এপস্টেইনের পরামর্শ নিতেন তিনি।
২০১৬ সালে জেফ্রি এপস্টেইন তার ব্যক্তিগত বিমানে করে একা প্যারিস থেকে রিয়াদে গিয়েছিলেন সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (MBS)-এর সাথে দেখা করতে। নথিতে উল্লেখ আছে, সেই সফর শেষে এপস্টেইন একটি অত্যন্ত মূল্যবান উপহার পেয়েছিলেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাসক মোহাম্মদ বিন জায়েদ (MBZ) -এর নামও নথিতে এসেছে, বিশেষ করে সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যাকাণ্ডের পরের সময়কার বিভিন্ন গোপন বার্তা বিনিময়ে।
ইউরোপের রাজপরিবার থেকে শুরু করে ফ্যাশন দুনিয়ার সম্রাট কেউই বাদ যাননি এপস্টেইনের এই জাল থেকে। যুক্তরাজ্যের রাজপুত্র অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে ভার্জিনিয়া জুফ্রে সরাসরি যৌন নির্যাতনের অভিযোগ আনেন। ফাইলগুলোতে সেই ভয়াবহ ঘটনার বিশদ বর্ণনা রয়েছে, যা ব্রিটিশ রাজপরিবারকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকটে ফেলে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি তার রাজকীয় উপাধি ও সামরিক সম্মান ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে নতুন নথি প্রকাশের পর নরওয়ের রাজপরিবার ঘিরেও আলোচনার ঢেউ ওঠে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নরওয়ের ক্রাউন প্রিন্সেস মেটে মারিটের নাম নথিতে বহুবার এসেছে এবং ২০১১ থেকে ২০১৪ সময়কালের ইমেইল যোগাযোগের কথাও উল্লেখ রয়েছে। এ নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে অনুতাপ প্রকাশ করেছেন বলেও সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং প্রভাবশালী রাজনীতিক পিটার ম্যান্ডেলসনের সাথে এপস্টেইনের গভীর সখ্যতার ছবি ও নথি প্রকাশিত হয়েছে।
কানাডীয় ফ্যাশন মোগল পিটার নিগার্ডের নামও কিছু নথি ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রসঙ্গ হিসেবে এসেছে। তবে এপস্টেইনের নেটওয়ার্কের সঙ্গে নিগার্ডের সম্পর্কের ধরন নিয়ে তথ্য এখনও স্পষ্ট নয় এবং বিষয়টি নানা সূত্রে ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
এপস্টেইনের মৃত্যুর পর অনেকেই ভেবেছিলেন বিচার থমকে যাবে। কিন্তু তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী গিসলেইন ম্যাক্সওয়েল ২০২১ সালে দোষী সাব্যস্ত হন। আদালতের রায় অনুযায়ী, তিনি বছরের পর বছর ধরে নাবালিকাদের ফাঁদে ফেলে শোষণের এই নীল নকশায় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২২ সালে তাকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ম্যাক্সওয়েলই ছিলেন সেই ব্যক্তি, যিনি উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়েদের প্রলোভন দেখিয়ে এপস্টেইনের কাছে নিয়ে আসতেন।
প্রতিবেদনের পাতায় পাতায় উঠে এসেছে শোষণের একটি সংগঠিত কাঠামোর ইঙ্গিত। তদন্ত সংশ্লিষ্ট নথি এবং ভুক্তভোগীদের বয়ানে দেখা যায়, আর্থ সামাজিকভাবে দুর্বল পরিবার বা অনিশ্চিত জীবনের কিশোরীদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে যোগাযোগ তৈরি করা হতো। প্রথমে বলা হতো কাজ, পরিচিতি বা সহজ আয়ের কথা। পরে ধীরে ধীরে তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ত, ভয় দেখানো হতো, এবং অনেক ক্ষেত্রেই তাদের বাধ্য করা হতো নিজেদের মতো আরও নতুন কিশোরী খুঁজে আনতে।
নথিপত্র অনুযায়ী, এই কিশোরীদের বড় একটি অংশ আসত যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার পাম বিচ, নিউ ইয়র্ক এবং নিউ মেক্সিকোর নিম্নবিত্ত এলাকাগুলো থেকে। কিন্তু এপস্টেইনের ক্ষুধার বিস্তার কেবল আমেরিকার সীমানায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তার নেটওয়ার্ক বিস্তৃত ছিল পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে (বিশেষ করে রাশিয়া ও ইউক্রেন), ফ্রান্সের প্যারিসে এবং দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশে। সেখান থেকে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন দেখিয়ে পাচার করা হতো এই কিশোরীদের।
এপস্টেইনের ডান হাত হিসেবে পরিচিত গিসলেইন ম্যাক্সওয়েল এই শিকার ধরার কাজে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তিনি শপিং মল, স্কুল ক্যাম্পাস, এমনকি বিউটি পার্লারগুলোতে গিয়ে সাধারণ কিশোরীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাতেন। তাদের সামনে ‘মডেলিং ক্যারিয়ার’, ‘উচ্চশিক্ষা’ বা ‘বিলাসবহুল জীবন’-এর প্রলোভন দেওয়া হতো। অনেক সময় ৩০০ থেকে ৫০০ ডলারের বিনিময়ে কেবল ‘ম্যাসেজ’ করার কথা বলে তাদের এপস্টেইনের প্রাসাদে নিয়ে আসা হতো। একবার সেই প্রাসাদে ঢোকার পর শুরু হতো বিভীষিকা। তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হতো এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে কিংবা ড্রাগস খাইয়ে দিনের পর দিন শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার চালানো হতো।
এপস্টেইনের ‘লাইফ ইনস্যুরেন্স’ সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এপস্টেইনের দ্বীপে এবং তার নিউ ইয়র্কের ম্যানশনগুলোতে প্রতিটি কক্ষে গোপন ক্যামেরা ও লিসেনিং ডিভাইস বসানো ছিল। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যখন সেখানে যেতেন, তাদের অন্তরঙ্গ ও অনৈতিক মুহূর্তগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ভিডিও করে রাখা হতো। এটি ছিল এপস্টেইনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। তার ‘লাইফ ইনস্যুরেন্স’। তিনি জানতেন, যতদিন এই ভিডিওগুলো তার কাছে থাকবে, ততদিন বিশ্বের কোনো আইন তাকে স্পর্শ করতে পারবে না।
২০১৯ সালে কারাগারে এপস্টেইনের মৃত্যু সরকারিভাবে আত্মহত্যা হিসেবে নথিভুক্ত হলেও, জনমনে সন্দেহ পুরোপুরি থামেনি। নানা প্রশ্ন উঠেছে কারাগারের নজরদারি, প্রটোকল মানা, এবং নিরাপত্তা ঘাটতি নিয়ে। আর এই অনিশ্চয়তার কারণেই কেউ কেউ মনে করেন, তিনি যদি বিচার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতামূলক অবস্থান নিতেন, তবে হয়তো বিশ্বের অনেক বড় বড় ‘রাঘব-বোয়ালদের’ ক্ষমতার মসনদ চিরতরে ধুলোয় মিশে যেত। ফলে এই মৃত্যুকে অনেক বিশ্লেষক ‘রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হত্যাকাণ্ড’ বলে সন্দেহ করেন, যার উত্তর আজও অমীমাংসিত।
এপস্টেইন ফাইলস প্রকাশ হওয়ার পর অনেক রাঘব-বোয়ালদের মুখোশ খুলে গেছে। জেফ্রি এপস্টেইন কবরে চলে গেলেও তার পাপের সাম্রাজ্যের অনেক অংশীদার এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। এপস্টেইন ফাইলস তাই কেবল একটি কেলেঙ্কারি নয়, ক্ষমতা, প্রভাব এবং জবাবদিহির সম্পর্ক নিয়ে বৈশ্বিক প্রশ্নের এক দীর্ঘ আখ্যান।
তথ্যসূত্র:
U.S. Department of Justice (৩০ জানুয়ারি ২০২৬)
PBS NewsHour (১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
Associated Press (২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
The Guardian (২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
Al Jazeera (৩০ জানুয়ারি ২০২৬)









