জাতীয়

উত্তরাঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের ‘হেলথ সিটি’ ও টিকা উৎপাদনে চীনের সহায়তা চাইলেন ড. ইউনূস

ঢাকা, ৩১ জানুয়ারি – প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে চীন-বাংলাদেশ অংশীদারিত্ব ফোরামের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল সাক্ষাৎ করেছেন। গত বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে চীনের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, বিনিয়োগকারী, বায়োমেডিকেল বিশেষজ্ঞ, অবকাঠামো, ডিজিটাল ও আইন খাতের প্রতিনিধি এবং শিল্প নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েস্ট চায়না স্কুল অব মেডিসিনের পরিচালক ও খ্যাতনামা বায়োমেডিকেল বিজ্ঞানী সিন-ইউয়ান ফু অধ্যাপক ইউনূসের দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করেন এবং বাংলাদেশের শিক্ষাবিদদের সঙ্গে যৌথভাবে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। শুক্রবার সকালে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।

বৈঠকে ওয়ালভ্যাক্স বায়োটেকনোলজির পরিচালনা পর্ষদের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা অ্যান্ড্রু জিলং ওং এবং ওয়ালভ্যাক্স বায়োটেকের সিঙ্গাপুর শাখার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউচিং ইয়াও বাংলাদেশে তাদের কাজের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। অন্তত ২২টি দেশে টিকা রপ্তানিকারক এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে পিসিভি ও এইচপিভি টিকা উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাই করছে। যুক্তরাজ্য ও ইন্দোনেশিয়ায় তাদের স্থানীয় সহযোগী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিনিধিদলে সিঙ্গাপুর রোবোটিকস সোসাইটি, ফোর্ডাল ল ফার্ম, বেইজিং উতং অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট, চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন এবং চায়না হুনান কনস্ট্রাকশন ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। চীনা প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থীদের মেধা ও সম্ভাবনার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটালাইজেশন নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের মতবিনিময়ের কথা জানান।

আলোচনায় অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস মাইক্রোক্রেডিট আন্দোলনের সূত্র ধরে চীনের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে চীনের প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে তিনি মানুষের জীবনে পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে সেই ধারণা অনুসরণ করে চীন নিজস্ব কর্মসূচি চালু করে। গত বছরের মার্চে চীন সফরের সময় প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেন যে প্রেসিডেন্ট তাকে জানিয়েছিলেন তিনি তার বই পড়েছেন এবং সেই নীতিগুলো অনুসরণ করেছেন যা তার জন্য আনন্দের মুহূর্ত ছিল। সরকার পরিবর্তন হলেও দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকার ওপর জোর দেন প্রধান উপদেষ্টা।

বৈঠকে স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও ডিজিটাল খাতে সহযোগিতার সুযোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রাধিকার তুলে ধরে অধ্যাপক ইউনূস জানান যে বর্তমানে স্বাস্থ্যখাতই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে চিকিৎসক ও রোগীর সংযোগ স্থাপন, চিকিৎসার ইতিহাস ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ এবং সহজে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যের কথা তিনি ব্যক্ত করেন। এছাড়া ওষুধ খাতে সামাজিক ব্যবসার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন যে অল্প খরচে উৎপাদিত ওষুধ উচ্চমূল্যে বিক্রি হওয়ার সংস্কৃতি বদলাতে হবে। মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়ে সামাজিক ব্যবসাভিত্তিক ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। কোভিড মহামারির সময় পেটেন্টমুক্ত টিকার পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থানের কথাও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।

আলোচনায় দেশের উত্তরাঞ্চলে একটি পূর্ণাঙ্গ হেলথ সিটি গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন অধ্যাপক ইউনূস। তিনি জানান যে সেখানে এক হাজার শয্যার আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, গবেষণা কেন্দ্র, টিকা উৎপাদন ও ওষুধ শিল্পসহ স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম একই স্থানে গড়ে তোলা হবে। এর ফলে প্রতিবেশী ভারত, নেপাল ও ভুটানের মানুষও উপকৃত হতে পারবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বৈঠক শেষে অধ্যাপক ইউনূস ধারাবাহিক সহযোগিতা ও সমর্থনের জন্য চীনা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

এনএন/ ৩১ জানুয়ারি ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language