সম্পাদকের পাতা

জর্জিয়ায় ডে-কেয়ারে নিষ্পাপ শিশুদের নিয়ে বাংলাদেশি শিক্ষিকার ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা

নজরুল মিন্টো

উত্তর আমেরিকার যান্ত্রিক জীবনে বাবা-মায়ের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের জায়গা হলো ডে-কেয়ার সেন্টার। বুকভরা বিশ্বাস আর একরাশ ভরসা নিয়ে প্রতিদিন সকালে বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের রেখে যান এসব প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু সেই বিশ্বাস যে কতটা ভঙ্গুর হতে পারে এবং স্নেহের আড়ালে কতটা ভয়ংকর নিষ্ঠুরতা লুকিয়ে থাকতে পারে, তার এক জ্বলন্ত প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের রিফাত তাহমিন খলিল (দিয়া)। শিশুদের মমতা দিয়ে আগলে রাখার বদলে তিনি তাদের নিয়ে মেতে উঠেছিলেন এক পৈশাচিক ‘ফাইট ক্লাব’ খেলায়।

জর্জিয়ার ইভান্স (Evans) এলাকার নামী ডে কেয়ার সেন্টার Discovery Zone Kids। ২০২৫ সালের ২৮ জুলাইয়ের এক বিকেলে, চারদিকে যখন ঘরে ফেরার ব্যস্ততা, ঠিক তখনই এক মা সেখানে এসে নিজের দুই সন্তানকে নিতে গিয়ে থমকে দাঁড়ান। ছয় বছর বয়সী কন্যা ও নয় বছর বয়সী পুত্রের মুখ মলিন, চোখ দুটো টলমল, কান্না চাপা দেওয়ার চেষ্টা যেন তাদের পুরো শরীরে কাঁপন তুলে দিচ্ছিল। বাড়ি ফেরার পরই শুরু হয় আসল রহস্যের উন্মোচন। কান্নাভেজা কণ্ঠে শিশুরা তাদের মাকে জানায়, শিক্ষিকা ‘মিস খলিল’ তাদের একে অপরের সঙ্গে মারামারি করতে বাধ্য করেছেন। এই কথা শুনে মুহূর্তে মায়ের বুকের ভেতর জমে ওঠে আতঙ্ক, আর ভরসার জায়গাটিই যেন হঠাৎ করে অচেনা হয়ে ওঠে।

ঘটনাটি শুনেই ওই মা ছুটে যান কলাম্বিয়া কাউন্টি শেরিফ অফিসে। অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ এবং ডে-কেয়ার কর্তৃপক্ষ যখন সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা শুরু করে, তখন পর্দায় ভেসে ওঠে এক নারকীয় দৃশ্য। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ৩৭ বছর বয়সী রিফাত তাহমিন খলিল শিশুদের যত্ন করার বদলে তাদের উসকে দিচ্ছেন মারামারির জন্য। দুই অবুঝ ভাইবোনকে তিনি একে অপরের বিরুদ্ধে লড়তে বাধ্য করেন। কিন্তু তার নিষ্ঠুরতা সেখানেই থেমে থাকেনি।

তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, লড়াইয়ের এক পর্যায়ে রিফাত খলিল প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তিনি ছয় বছর বয়সী ছোট্ট মেয়েটিকে সজোরে আঁকড়ে ধরেন এবং মুহূর্তের মধ্যে তাকে শূন্যে তুলে একটি প্লাস্টিকের চেয়ারে ছুড়ে মারেন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তিনি শিশুটিকে ধরে একাধিকবার সজোরে ঝাঁকুনি দিচ্ছেন, যা একটি ছোট্ট শিশুর শরীরের জন্য ছিল অপূরণীয় ক্ষতির কারণ। এরপর তিনি নয় বছর বয়সী ছেলেটিকে প্ররোচিত করেন তার ছোট বোনের দিকে প্লাস্টিকের চেয়ার ছুড়ে মারার জন্য। একজন শিক্ষিকার এমন পৈশাচিক আচরণ দেখে হতবাক হয়ে যান খোদ তদন্তকারী কর্মকর্তারাও।

ঘটনাটি যখন চূড়ান্ত রূপ নিচ্ছিল, তখনই ভাগ্যক্রমে অন্য একজন শিক্ষিকা সেই কক্ষে প্রবেশ করেন। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তিনি দ্রুত এক শিশুকে উদ্ধার করে কক্ষের বাইরে নিয়ে যান। সেই অন্য শিক্ষিকার সময়োচিত হস্তক্ষেপ না থাকলে এই নির্যাতনের পরিণতি যে আরও কতটা ভয়াবহ হতো, তা ভাবলে আজও কেঁপে ওঠেন অভিভাবকরা।

এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার প্রেক্ষিতে গত ৪ আগস্ট ২০২৫ তারিখে কলাম্বিয়া কাউন্টি শেরিফ অফিস রিফাত তাহমিন খলিলকে গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে মামলাটি কলাম্বিয়া কাউন্টি সুপিরিয়র কোর্টে চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। রিফাতের বিরুদ্ধে শিশুদের প্রতি প্রথম মাত্রার নিষ্ঠুরতা (Cruelty to Children in the 1st Degree)-র তিনটি পৃথক অভিযোগ আনা হয়েছে। আমেরিকার আইন অনুযায়ী এটি একটি অতি গুরুতর অপরাধ (Felony)। প্রতিটি অভিযোগের জন্য তার সর্বনিম্ন পাঁচ বছর থেকে সর্বোচ্চ বিশ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ, অপরাধ প্রমাণিত হলে রিফাতকে জীবনের একটি বড় সময় কাটাতে হবে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। বর্তমানে তিনি ৭৫,৩০০ ডলারের বন্ডে জামিনে থাকলেও আদালত তার ওপর কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। তিনি কোনো অবস্থাতেই শিশুদের আশেপাশে থাকতে পারবেন না এবং কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারবেন না।

এই ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর জর্জিয়াসহ পুরো উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশি কমিউনিটিতে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, রিফাতের এই ব্যক্তিগত অপরাধ পুরো কমিউনিটির ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করেছে।

ইভান্সের Discovery Zone Kids কর্তৃপক্ষ এই ঘটনার পর তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর ঘোষণা দিয়েছে। তারা রিফাতকে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত করেছে এবং শিশুদের পরিবারের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। তবে এই ক্ষমা কি সেই নিষ্পাপ শিশুদের মনের ক্ষত মুছতে পারবে? শিশু মনোবিজ্ঞানীদের মতে, নিরাপত্তার বদলে যদি শিশুর মনে আতঙ্কের ছাপ পড়ে, তবে তা মুছে যায় না সহজে। এই ট্রমা কাটাতে লাগবে দীর্ঘ সময়, ধৈর্য এবং পেশাগত সহায়তা।

তথ্যসূত্র:

WRDW (Jul 29, 2025)
The Independent (Aug 5, 2025)


Back to top button
🌐 Read in Your Language