সম্পাদকের পাতা

মিনিয়াপোলিসে বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত আলিয়া রহমানের আটক নিয়ে তোলপাড় (ভিডিও সংযুক্ত)

নজরুল মিন্টো

যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপোলিস শহরটি আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। দেশটির আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষমতা, বর্ণবাদ, প্রতিবাদের অধিকার এবং অভিবাসন রাজনীতির টানাপোড়েন যে কত দ্রুত একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তার সাম্প্রতিক উদাহরণ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী আলিয়া রহমানের আটক হওয়ার ঘটনা। কৃষ্ণাঙ্গ নারী রেনি গুড নিহত হওয়ার প্রতিবাদ যখন শহরজুড়ে উত্তেজনা ছড়াচ্ছিল, ঠিক তখনই Immigration and Customs Enforcement (ICE) এজেন্টদের হাতে আলিয়ার আটক এবং গাড়ির জানালা ভেঙে তাকে টেনেহিঁচড়ে বের করে আনার ভিডিও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই ঘটনা এখন আন্তর্জাতিক সংবাদ শিরোনামে, কারণ এখানে কেবল একজন ব্যক্তিকে আটক করার প্রশ্ন নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের ধরন, মানবিকতার সীমা এবং নাগরিক অধিকারের বাস্তব চিত্রও উঠে এসেছে।

আলিয়া রহমানের আটককে অনেকেই আকস্মিক বলে দেখলেও ঘটনাপ্রবাহ বলছে, এর পেছনে ছিল এক সপ্তাহের তীব্র টানাপোড়েন। এর ঠিক এক সপ্তাহ আগে মিনিয়াপোলিসে ICE এজেন্ট জোনাথন রসের গুলিতে রেনি গুড নামের এক নারী নিহত হন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভাষ্য ছিল, এটি আত্মরক্ষার ঘটনা। কিন্তু এই ব্যাখ্যা শহরের বহু মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত করতে পারেনি। বরং প্রতিবাদের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে রাস্তায় রাস্তায়। সেই বিক্ষোভের আবহ, পুলিশের উপস্থিতি, ফেডারেল এজেন্টদের তৎপরতা, সব মিলিয়ে শহরটি তখন ছিল টানটান স্নায়ুচাপে।

এই প্রেক্ষাপটেই গত মঙ্গলবার ICE তাদের একটি নিয়মিত immigration enforcement operation পরিচালনা করছিল। তখন একদল বিক্ষোভকারী তাদের পথরোধ করে দাঁড়ায়। ফেডারেল এজেন্টদের অভিযোগ, আলিয়া রহমান তার গাড়ি দিয়ে ICE-এর যান চলাচলে বাধা দিচ্ছিলেন। ঘটনার ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, মুখে মাস্ক পরা এজেন্টরা এক পর্যায়ে আলিয়ার গাড়ির কাঁচ ভেঙে তাকে টেনে বের করে আনেন। মুহূর্তটি ছিল তীব্র উত্তেজনাময়, কারণ সেই সময় আলিয়া চিৎকার করে বলছিলেন তিনি একজন “প্রতিবন্ধী” এবং তিনি “ডাক্তারের কাছে যাচ্ছিলেন”। দর্শকদের অনেকের চোখে এটি ছিল মানবিক আকুতির প্রকাশ। কিন্তু সেই বক্তব্য উপেক্ষা করেই তাকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

আলিয়া রহমানকে ঘিরে বিতর্ক আরও ঘনীভূত হওয়ার বড় কারণ তার পরিচয় ও পেশাগত প্রেক্ষাপট। তিনি ৪৩ বছর বয়সী, জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিক। তার মা উইসকনসিনের, আর বাবা বাংলাদেশি। তিনি কেবল একজন আন্দোলনকারী নন, বরং উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবীও। তিনি ইন্ডিয়ানার পারডু ইউনিভার্সিটি থেকে বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং সাইবার সিকিউরিটি ক্ষেত্রে সার্টিফাইড প্রফেশনাল (CISSP)। তিনি ‘নিউ আমেরিকা’স ওপেন টেকনোলজি ইনস্টিটিউট’-এ ফেলো হিসেবে কাজ করেছেন। পাশাপাশি ‘ওয়েলস্টোন’-এর মতো প্রভাবশালী প্রগতিশীল সংগঠনের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া গত এক দশক ধরে তিনি ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন এবং ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে তার আটকের ভিডিও শুধু রাস্তার একটি সংঘর্ষ হিসেবে থাকেনি, এটি দ্রুত পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক বার্তা ও সামাজিক প্রতীকে।

ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার স্বার্থে আলেয়াকে সাময়িকভাবে আটক করা হয়েছিল। পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়নি। এই তথ্য একদিকে ঘটনার তীব্রতা কিছুটা কমালেও, অন্যদিকে নতুন প্রশ্নও তুলেছে। যদি অভিযোগই না থাকে, তাহলে কাঁচ ভেঙে টেনে বের করে আনার মতো পদক্ষেপ কতটা প্রয়োজনীয় ছিল? মিনিয়াপোলিসের মানবাধিকার সংগঠনগুলো ICE -এর এই আচরণকে মারমুখী বলে আখ্যা দিয়েছে এবং ঘটনার তদন্ত দাবি করেছে।

তথ্যসূত্র:

New York Post: (15 January 2026)


Back to top button
🌐 Read in Your Language