শবে মেরাজের ঘটনা থেকে যে চারটি শিক্ষা পাওয়া যায়

রজব মাস মুসলমানদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। এই মাসকে তওবা ও আত্মশুদ্ধির মাস বলা হয়, পাশাপাশি এটিই রমজানের প্রস্তুতির শুরু। এই রজব মাসেই ইসলামের ইতিহাসের এক বিস্ময়কর ঘটনা ইসরা ও মেরাজ সংঘটিত হয়। ওই রাতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে জেরুজালেম হয়ে সপ্তম আসমানে গমন করেন এবং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করেন।
মেরাজের রাতে মহানবী (সা.) প্রথমে জেরুজালেমে পৌঁছে পূর্ববর্তী নবীদের ইমামতি করে নামাজ আদায় করেন। এরপর তিনি আসমানে আরোহণ করে আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সৌভাগ্য অর্জন করেন। সেই সময় মুসলিম উম্মতের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার হিসেবে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ নির্ধারিত হয়। তবে শুরুতে আল্লাহ তায়ালা প্রতিদিন ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছিলেন।
ফেরার পথে মহানবীর সঙ্গে হজরত মুসা (আ.)-এর সাক্ষাৎ হয়। তিনি নামাজের সংখ্যা জানতে চাইলে মহানবী তাকে ৫০ ওয়াক্তের কথা জানান। তখন মুসা (আ.) বলেন, উম্মত এত ভারী দায়িত্ব পালন করতে পারবে না এবং নামাজ কমানোর জন্য আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে অনুরোধ করেন। মুসা (আ.)-এর পরামর্শে মহানবী কয়েকবার আল্লাহর কাছে ফিরে যান এবং প্রতিবারই নামাজের সংখ্যা কমতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত তা পাঁচ ওয়াক্তে এসে দাঁড়ায়। এরপরও মুসা (আ.) আবার আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে বলেছিলেন, কিন্তু মহানবী (সা.) আর যাননি।
মহানবী (সা.) বলেন, বারবার আল্লাহর সামনে ফিরে গিয়ে নামাজ কমানোর আবেদন করতে তিনি লজ্জা অনুভব করছেন।
এই পুরো ঘটনা থেকে মুসলমানদের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়।
প্রথম শিক্ষা হলো, শোনা ও মানা। আল্লাহ যখন প্রথমে ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেন, তখন মহানবী (সা.) কোনো প্রশ্ন বা আপত্তি না তুলে আল্লাহর আদেশ মেনে নেন। তিনি শোনেন এবং মানেন। এতে মুসলমানদের জন্য স্পষ্ট বার্তা রয়েছে—আল্লাহ ও রাসুল যা নির্দেশ দেন, তা বিনা দ্বিধায় গ্রহণ করা।
দ্বিতীয় শিক্ষা হলো, উপদেশ গ্রহণের মানসিকতা। হজরত মুসা (আ.)-এর পরামর্শ না পেলে মহানবী নামাজ কমানোর জন্য আবেদন করতেন না। এটি প্রমাণ করে যে তিনি অন্যের কল্যাণকামী উপদেশ গ্রহণে সব সময় প্রস্তুত ছিলেন। এখান থেকে আমাদের শেখার বিষয় হলো, আমরা কি নিজের ভুল ধরিয়ে দেওয়া উপদেশ সহজভাবে গ্রহণ করতে পারি?
তৃতীয় শিক্ষা হলো, উম্মতের প্রতি মহানবীর গভীর ভালোবাসা। নামাজের সংখ্যা কমানোর জন্য বারবার আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া ছিল উম্মতের প্রতি তার নিঃস্বার্থ মমতার প্রকাশ। তিনি চাইলে নিজেই ৫০ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে পারতেন। কিন্তু তিনি উম্মতের কথা ভেবেছেন, যেন তারা কষ্টে না পড়ে এবং দ্বীনের পথে টিকে থাকতে পারে। এতে বোঝা যায়, উম্মতের প্রতি তার ভালোবাসা কতটা গভীর ছিল।
এখান থেকে আমাদের জন্য ভাবার বিষয় হলো, আমরা আমাদের মুসলিম ভাই-বোনদের জন্য কী করছি এবং তাদের কষ্ট লাঘবে আমাদের ভূমিকা কী।
চতুর্থ শিক্ষা হলো, আল্লাহর সামনে লজ্জাবোধ ও বিনয়। ৫০ ওয়াক্ত থেকে নামাজ কমতে কমতে যখন পাঁচ ওয়াক্তে এসে পৌঁছায়, তখন মহানবী (সা.) আর কমানোর আবেদন করেননি। কারণ তিনি তার প্রভুর সামনে লজ্জা অনুভব করেছিলেন। এই লজ্জাবোধ ও বিনয় আমাদের মাঝেও থাকা প্রয়োজন।
আমাদের নিজের ভেতর প্রশ্ন করা উচিত—নামাজ কাজা হলে আমরা কি সত্যিই লজ্জা অনুভব করি? কোনো অশালীন কিছু দেখার আগে আমাদের বিবেক কি আমাদের থামিয়ে দেয়?
মহানবী (সা.) তার জীবনে আল্লাহকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি উম্মতের কথা ভেবেছেন, অন্য নবীর উপদেশ গ্রহণ করেছেন, আবার একই সঙ্গে আল্লাহর সামনে বিনয় ও লজ্জাবোধকে কখনো উপেক্ষা করেননি। আমাদেরও এই শিক্ষাগুলো বুঝে জীবনে অনুসরণ করা উচিত।
এনএন









