সম্পাদকের পাতা

ব্রিটেনে কেয়ার ভিসার আড়ালে কোটি টাকার জালিয়াতি

নজরুল মিন্টো

লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে যখন কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে একের পর এক বিমান নামে, তখন সেই ভিড়ের মধ্যেই মিশে থাকেন হাজারো দক্ষিণ এশীয় তরুণ-তরুণী। চোখে তাদের নতুন জীবনের স্বপ্ন, হাতে ‘হেলথ অ্যান্ড কেয়ার’ ভিসার দামী পাসপোর্ট। কিন্তু এই পাসপোর্টের পেছনে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার বাস্তবতা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ও গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক অনুসন্ধান বলছে, যুক্তরাজ্যের সামাজিক সেবা খাত আজ ভয়াবহ এক জালিয়াতির জালে আটকা পড়েছে। যেখানে ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ পাউন্ডের বিনিময়ে বিক্রি হচ্ছে তথাকথিত ‘যোগ্যতা’, আর সেই কাগুজে যোগ্যতার চাপে বিপর্যস্ত হচ্ছে পুরো সেবা ব্যবস্থা।

তদন্তের সূত্র ধরে এগোলে দেখা যায়, এই জালিয়াতির শেকড় বিস্তৃত বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের শহর থেকে শুরু করে অচেনা গলিপথ পর্যন্ত। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা বা সিলেটের কোনো নামহীন ‘কনসালটেন্সি’ ফার্মে বসেই তৈরি হচ্ছে বড় বড় নার্সিং হোমে কাজ করার ‘অভিজ্ঞতা সনদ’।

একজন আবেদনকারীকে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর জন্য খরচ করতে হচ্ছে প্রায় ২৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা। এই বিপুল অংকের টাকার বিনিময়ে তাকে দেওয়া হচ্ছে একটি ‘ভুয়া কেয়ার সার্টিফিকেট’ এবং একটি স্পনসরশিপ লাইসেন্স (CoS)। অথচ বাস্তবে সেই ব্যক্তির হয়তো কোনো হাসপাতালে ইনজেকশন দেওয়ার তো দূর থাক, ব্যান্ডেজ করার অভিজ্ঞতাও নেই। তবুও কাগজে-কলমে তিনি হয়ে উঠছেন একজন ‘দক্ষ কেয়ারার’। এই ‘পেপার-কোয়ালিফাইড’ বা কাগুজে যোগ্য কর্মীরা যখন লন্ডনে পৌঁছান, তখন তারা জানেন না কীভাবে একজন মুম্মুর্ষু রোগীকে নাড়াচাড়া করতে হয় বা কোন ওষুধের কী কাজ।

এই জালিয়াতির সবচেয়ে বড় রহস্য লুকিয়ে আছে আবেদনকারীদের মূল উদ্দেশ্যে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, এই কর্মীদের একটি বড় অংশ প্রকৃতপক্ষে সেবাদানের মানসিকতা নিয়ে যুক্তরাজ্যে আসেননি। তাদের কাছে কেয়ার ভিসা ছিল কেবল যুক্তরাজ্যে প্রবেশের একটি সিঁড়ি।মূল লক্ষ্য হলো যে কোনো উপায়ে ব্রিটিশ ভূখণ্ডে পা রাখা। ৪০ লাখ টাকা খরচ করে যারা আসছেন, তারা জানেন যে কেয়ারারের সামান্য বেতনে এই টাকা শোধ করা সম্ভব নয়। ফলে তারা কাজের নাম করে যুক্তরাজ্যে ঢুকে দ্রুত ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ বা অবৈধ শ্রমবাজারে মিশে যাচ্ছেন।

অনেকে লন্ডনের বাইরের কোনো কেয়ার হোমে নামমাত্র যোগ দিয়ে কয়েক দিন পরেই সটকে পড়ছেন। তারা যোগ দিচ্ছেন গ্রোসারি স্টোর, কার-ওয়াশ বা টেক-অ্যাওয়ে শপগুলোতে, যেখানে নগদ টাকায় (Cash in hand) কাজ করা যায়। তাদের লক্ষ্য থাকে কয়েক বছর যেকোনোভাবে টিকে থাকা এবং পরে আইনি মারপ্যাঁচে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ তৈরি করা।

অনুসন্ধানে আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। অনেক ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বাংলাদেশিরাই তাদের আত্মীয়-স্বজনকে এই কেয়ার ভিসায় নিয়ে আসছেন। ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকার বিনিময়ে তারা বিভিন্ন কেয়ার হোম মালিকদের ম্যানেজ করে স্পনসরশিপের ব্যবস্থা করছেন। এতে একদিকে অযোগ্য ব্যক্তিরা কেয়ারার হিসেবে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন, অন্যদিকে প্রকৃত দক্ষ কর্মীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।

সবচেয়ে নাটকীয় এবং উত্তেজনাপূর্ণ অংশটি বেরিয়ে আসে যখন এই কর্মীরা কাজে যোগ দেন। যুক্তরাজ্যের স্ট্যাফোর্ডশায়ার কাউন্সিলের একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা রীতিমতো পিলে চমকানো। তহবিলের ১৫ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করা হচ্ছে এই বিদেশি কর্মীদের ‘মৌলিক জীবন দক্ষতা’ শেখাতে।

প্রশিক্ষণের নথিপত্রে দেখা গেছে, উচ্চশিক্ষিত দাবি করা এই কর্মীদের শেখানো হচ্ছে ছুরি ও কাঁটাচামচ দিয়ে কী করা হয়। অর্থাৎ কোনটি দিয়ে মাখন কাটতে হয় আর কোনটি দিয়ে তরকারি। টোস্টার, কেটলি বা সাধারণ রান্নাঘরের যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মতো মৌলিক বিষয় পর্যন্ত শেখাতে হচ্ছে।

তদন্তকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন, যারা নিজেদের দক্ষ পেশাদার হিসেবে দাবি করে ‘হেলথ কেয়ার’ ভিসায় এলেন, তাদের কেন করদাতার টাকায় চা বানানো বা স্যুপ গরম করা শেখাতে হবে? এটি কি স্রেফ অযোগ্যতা, নাকি এক বিশাল অভিবাসন কেলেঙ্কারি?

যারা ৪০ লাখ টাকা খরচ করে আসছেন, তাদের সবার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয় না। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, লন্ডনের পূর্ব এবং উত্তর দিকের জরাজীর্ণ বাড়িগুলোতে এক একটি রুমে গাদাগাদি করে থাকছেন ১০-১২ জন অভিবাসী। অনেকে কাজ না পেয়ে বা দালালের খপ্পরে পড়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। যেহেতু তারা ভুয়া নথিপত্রে এসেছেন, তাই আইনি সহায়তা নিতেও তারা ভয় পান। অনেকের জীবন আজ এমন এক শোষণচক্রে আটকে গেছে, যাকে মানবাধিকারকর্মীরা আধুনিক দাসত্বের নতুন রূপ হিসেবে দেখছেন। একদিকে ঋণের বোঝা, অন্যদিকে দেশে থাকা পরিবারের চাপ, সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে দিন কাটছে অনেকের।

এই জালিয়াতির সবচেয়ে ভয়াবহ শিকার যুক্তরাজ্যের অসহায় প্রবীণ নাগরিকরা। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন কিছু ঘটনা, যেখানে এসব কর্মীরা জরুরি অবস্থায় ৯৯৯-এ কল করে অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে পারছেন না কেবল ভাষার সীমাবদ্ধতার কারণে। ব্রিটিশ উচ্চারণ বুঝতে না পারা এবং মৌলিক জরুরি প্রোটোকল না জানায় অনেক প্রবীণ নাগরিকের জীবন এখন হুমকির মুখে পড়ছে।

একজন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম আমাদের বাবাকে একজন পেশাদার কেয়ারারের হাতে তুলে দিচ্ছি। কিন্তু আমরা দেখলাম, তিনি জানেনই না কীভাবে ডিজিটাল থার্মোমিটার ব্যবহার করতে হয়।” এই ‘প্রফেশনাল ভ্যাকুয়াম’ বা পেশাদারিত্বের শূন্যতা এখন কেবল প্রশাসনিক সমস্যা নয়, বরং জননিরাপত্তার জন্য একটি বড় ঝুঁকি।

অর্থনৈতিক দিক থেকে এই জালিয়াতি ব্রিটিশ রাজকোষকে চরম সংকটে ফেলেছে। ‘অফিস ফর বাজেট রেসপন্সিবিলিটি’ (OBR) সতর্ক করেছে যে, এই অদক্ষ অভিবাসীরা দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির ওপর বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস সোশ্যাল কেয়ার হাবের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ। ১.৮ মিলিয়ন পাউন্ড সরকারি অনুদান পাওয়া এই সংস্থাটি ‘এআই কোচ’ ব্যবহার করছে। অভিযোগ রয়েছে, এই এআই কোচগুলো নতুন আসা কর্মীদের কাজের বদলে সরাসরি ‘ফুড ব্যাংক’ (বিনামূল্যে খাবার পাওয়ার জায়গা) এবং সরকারি আবাসন সুবিধার দিকে পরিচালিত করছে। অর্থাৎ, যারা কাজের জন্য এসেছেন, তারা আসার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সরকারি ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।

অনুসন্ধানের আরও গভীরে গেলে দেখা যায় এক ‘ভূতুড়ে’ নিয়োগ ব্যবস্থার অস্তিত্ব। এমন অনেক কোম্পানি স্পনসরশিপ দিচ্ছে যাদের বাস্তবে কোনো অফিস বা নার্সিং হোম নেই। তারা স্রেফ কাগজ বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। কর্মীরা যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পর দেখেন, যে কেয়ার হোমে তাদের কাজ করার কথা ছিল, তার অস্তিত্বই নেই। তখন তারা বাধ্য হয়ে অবৈধভাবে অন্য কাজ খোঁজেন বা মানবেতর জীবন যাপন করেন। বিশেষজ্ঞরা একে অভিহিত করছেন আধুনিক দাসত্বের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হিসেবে।

ব্রিটেনের ‘ট্যাক্সপেয়ার্স অ্যালায়েন্স’ এই পুরো বিষয়টিকে ‘Snapshot of Failure’ বা ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। চাপের মুখে পড়ে ব্রিটিশ সরকার এখন ভিসা নীতি আমূল সংস্কার করছে। কেয়ার ভিসায় আসা কর্মীদের সাথে তাদের পরিবারের সদস্যদের (dependents) নিয়ে আসার সুযোগ ইতোমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে। শত শত এজেন্সির স্পনসরশিপ লাইসেন্স বাতিল করা হচ্ছে।

তথ্যসূত্র:

এই প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে প্রকাশিত Bloomberg, The Guardian, The Observer ও The Telegraph–এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলোর ওপর ভিত্তি করে।


Back to top button
🌐 Read in Your Language