যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে বাংলাদেশিদের জন্য ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড শর্ত
নজরুল মিন্টো

আটলান্টিকের ওপারে স্ট্যাচু অব লিবার্টির হাতছানি প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে এক দীর্ঘস্থায়ী স্বপ্ন। কেউ আসেন উচ্চশিক্ষায়, কেউ প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা করতে, আবার কেউ স্রেফ পর্যটক হিসেবে। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে এবার যুক্ত হলো এক নতুন দেয়াল। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট ৬ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে তাদের ভিসা বন্ড সংক্রান্ত তালিকা হালনাগাদ করে জানায়, বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী কেউ যদি বি১/বি২ (ভ্রমণ ও ব্যবসা) ভিসার জন্য যোগ্য বিবেচিত হন, তাহলে ভিসা ইস্যুর শর্ত হিসেবে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত “ভিসা বন্ড” বা ফেরতযোগ্য জামানত জমা দিতে হবে।
ভিসা বন্ড মূলত একটি আর্থিক নিশ্চয়তা। এটি কোনো অতিরিক্ত ফি নয়, বরং ভ্রমণভিসার শর্ত হিসেবে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা সরকারি চ্যানেলে আটকে রাখা। মার্কিন কনস্যুলার অফিসাররা যখন কোনো আবেদনকারীকে ভিসা দেওয়ার জন্য উপযুক্ত মনে করবেন, কিন্তু তার মনে এই সন্দেহ জাগবে যে ওই ব্যক্তি ভিসার মেয়াদ শেষে আর দেশে ফিরবেন না, তখনই তিনি এই বন্ড আরোপ করবেন। এটি অনেকটা আদালতের জামানতের মতো।
কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে ঠিক করবেন ৫ হাজার, ১০ হাজার নাকি ১৫ হাজার ডলারের বন্ড প্রযোজ্য হবে (বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬ লক্ষ থেকে ১৮ লক্ষ টাকা)। আপনি যদি নিয়ম মেনে যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং সময়মতো ফিরে আসেন, তবে এই টাকা আপনাকে ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু যদি আপনি সেখানে অবৈধভাবে থেকে যান (ওভারস্টে), তবে ওই অর্থ মার্কিন সরকার চিরতরে বাজেয়াপ্ত করবে।
স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথ্যমতে, এই নিয়মটি আগামী ২১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য কার্যকর হবে। তালিকায় বাংলাদেশসহ মোট ৩৮টি দেশের নাম রয়েছে। এর মধ্যে প্রতিবেশী দেশ নেপাল এবং ভুটানের নামও রয়েছে। ভুটানের মতো কয়েকটি দেশের ক্ষেত্রে এই শর্ত ১ জানুয়ারি থেকেই কার্যকর হয়েছে। নেপালের জন্য বাংলাদেশের মতোই ২১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হচ্ছে।
মার্কিন প্রশাসনের অফিসিয়াল বক্তব্য হলো, ভিসার মেয়াদ শেষে অবৈধভাবে থেকে যাওয়ার প্রবণতা কমানো। তাদের ভাষায়, নির্দিষ্ট কিছু দেশের ক্ষেত্রে ভিজিটর ভিসা নিয়ে গিয়ে সময়ের পরে থেকে যাওয়ার হার উদ্বেগজনক।
তবে এই সিদ্ধান্তের পেছনে আরও কিছু সূক্ষ্ম কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কারণ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রথমত, এটি এক ধরনের ‘আর্থিক ফিল্টার’। যাদের আর্থিক ভিত্তি অত্যন্ত মজবুত, তারাই কেবল যুক্তরাষ্ট্রে যেতে উৎসাহিত হবেন। মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্তদের জন্য এটি একটি অলিখিত নিষেধাজ্ঞা। দ্বিতীয়ত, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কোষাগারে এক বিশাল অঙ্কের এ টাকা জমা হবে। হাজার হাজার আবেদনকারীর কাছ থেকে সংগৃহীত এই অর্থ মার্কিন অর্থনীতিতে এক ধরনের সাময়িক তারল্য জোগান দেবে।
এই ভিসা বন্ডকে বলা হচ্ছে একটি পাইলট প্রোগ্রাম বা পরীক্ষামূলক উদ্যোগ। প্রশ্ন হলো, এই পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর নামই কেন বারবার সামনে আসে। ২০১৩ সালে ব্রিটেন একই ধরনের ভিজিটর ভিসা বন্ড চালুর চিন্তা করেছিল, কিন্তু তীব্র সমালোচনা ও কূটনৈতিক আপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত তারা পরিকল্পনাটি এগোয়নি। যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত দেখতে চাইছে, বন্ড ব্যবস্থা ওভারস্টে কমায় কি না এবং ভ্রমণ খাতে এর প্রভাব কতটা পড়ে।
অনেকের মতে, এটি কেবল অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং একটি ডিজিটাল নজরদারির অংশ। বন্ড জমা দিতে হবে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের Pay.gov প্ল্যাটফর্মে, এবং শর্তাবলিতে অনলাইনে সম্মতি দিতে হবে। এই লেনদেনের মাধ্যমে আবেদনকারীর আন্তর্জাতিক ক্রেডিট প্রোফাইল মার্কিন ইন্টেলিজেন্সের হাতে চলে যাবে। অর্থাৎ, আপনি কেবল টাকাই দিচ্ছেন না, আপনার পুরো আর্থিক জীবনবৃত্তান্ত তাদের ডেটাবেজে সঁপে দিচ্ছেন। কনস্যুলার অফিসারের নির্দেশ ছাড়া কোনো তৃতীয় পক্ষের ওয়েবসাইটে টাকা দিলে মার্কিন সরকার দায় নেবে না, এমন সতর্কতাও দেওয়া হয়েছে। ফলে এই নিয়মের ভেতরে আরেকটি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, প্রতারকচক্র “বন্ড জমা দেওয়ার” নামে ভুয়া লিংক পাঠিয়ে মানুষকে ফাঁদে ফেলতে পারে।
তাত্ত্বিকভাবে বলা হচ্ছে, এটি ফেরতযোগ্য। কিন্তু এখানেও রয়েছে বাস্তব জীবনের একটি কিন্তু। আপনি যখন দেশ থেকে অর্থ পাঠাবেন, তখন ডলারের বিনিময় হার এবং ব্যাংকের সার্ভিস চার্জ বাবদ কিছুটা অর্থক্ষতি হতে পারে। পরে শর্ত পূরণ করে বন্ড ফেরত পেলেও বিনিময় হার বদলে গেলে প্রকৃত লাভ-লোকসানের হিসাব অনেকের জন্য ধোঁয়াটে থেকে যেতে পারে।
আরও একটি জটিলতা তৈরি হয়েছে চলাচলের শর্তে। পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, যারা এই বন্ডের আওতায় ভিসা পাবেন, তাদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকা এবং বের হওয়া নির্দিষ্ট তিনটি বিমানবন্দর দিয়েই হতে হবে। বোস্টন লোগান (BOS), নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি (JFK), এবং ওয়াশিংটন ডুলাস (IAD)। নির্ধারিত পথে না গেলে প্রবেশাধিকার নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে, কিংবা প্রস্থানের তথ্য সঠিকভাবে নথিবদ্ধ না হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আর প্রস্থান নথিবদ্ধ না হলে বন্ড ফেরতের প্রশ্নও আটকে যেতে পারে।
মার্কিন দূতাবাসের নিয়ম অনুযায়ী, বন্ড জমা দেওয়া মানেই ভিসা নিশ্চিত হয়ে গেছে এমন নয়। অফিসার প্রথমে আপনাকে ভিসার জন্য যোগ্য হিসেবে বিবেচিত করবেন, তারপর বন্ড জমা দিতে বলবেন। পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে বা ভিসা পাওয়া ব্যক্তি সব শর্ত মেনে চললে বন্ডের অর্থ ফেরত দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। তবু বাস্তবতা হলো, বন্ড মানেই বাড়তি আর্থিক চাপ, এবং প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে কাগজপত্র ও নিয়ম মেনে চলার বাধ্যবাধকতা আরও কঠোর হয়ে যায়।
তাছাড়া, আপনি যদি যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর সেখানে গিয়ে আপনার ভিসার ধরন পরিবর্তন করতে চান (যেমন: ভিজিটর থেকে স্টুডেন্ট ভিসা), তবে আপনার বন্ডের টাকা আর ফেরত পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ, যে কোনো মূল্যে আপনাকে নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মাটি ছাড়তে হবে।
বাংলাদেশি আবেদনকারীদের সামনে এখানেই আসে বাস্তব জীবনের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন, টাকা পাঠাবেন কীভাবে। ট্রাভেল কোটার নীতিমালায় বছরে বিদেশ ভ্রমণে অনুমোদিত সীমা ১২ হাজার ডলার। একজন ব্যক্তি একাই যদি ১৫ হাজার ডলারের বন্ডের মুখোমুখি হন, তাহলে সীমার ভেতরেই গাণিতিক সংকট তৈরি হয়। তার ওপর পরিবারের দুই সদস্যের জন্য বন্ড চাইলে অঙ্ক দাঁড়ায় আরও বড়। ডলার সংকটের বাজারে ব্যাংকিং চ্যানেলে বড় অঙ্ক পাঠানো, অনুমোদন, কাগজপত্র, সব মিলিয়ে বিষয়টি অনেকের কাছে দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠতে পারে। এই চাপ মানুষকে অবৈধ চ্যানেলের কথা ভাবাতে পারে, যা একদিকে আইনগত ঝুঁকি বাড়ায়, অন্যদিকে প্রতারকচক্রের ফাঁদেও ফেলতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন নিয়মটি সমালোচকদের মতে বৈষম্যমূলক। এটি ভ্রমণের অধিকারকে আয়ের সঙ্গে বেঁধে দেওয়ার এক কৌশলী প্রয়াস বলেই তাদের দাবি। তবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলের উচিত এই বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করা, যাতে অন্তত বাস্তব প্রয়োগে অযথা হয়রানি বা বিভ্রান্তি না বাড়ে। ২১ জানুয়ারি থেকে যে পথচলা শুরু হতে যাচ্ছে, তা কেবল আর্থিক নয়, বরং মানসিক এবং জাতীয় সক্ষমতার এক বড় পরীক্ষা।
সাধারণ নাগরিকদের এখন থেকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে। কোনো দালালের খপ্পরে না পড়ে সরাসরি দূতাবাসের ওয়েবসাইট এবং বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের ওপর ভরসা রাখতে হবে, এবং কনস্যুলার অফিসারের নির্দেশ ছাড়া Pay.gov বা অন্য কোনো লিংকে টাকা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। স্বপ্নের দেশ আমেরিকা হয়তো এখন আগের চেয়েও দূরে সরে গেল, কিন্তু সঠিক তথ্য আর প্রস্তুতিই পারে এই গোলকধাঁধা থেকে পথ দেখাতে।
তথ্যসূত্র: এই প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের Travel.State.Gov এ প্রকাশিত “Countries Subject to Visa Bonds” নোটিশ, Federal Register এ প্রকাশিত Visa Bond Pilot Program সংক্রান্ত নিয়ম, এবং বিষয়টি নিয়ে প্রকাশিত একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিবেদন ও ব্যাখ্যার আলোকে।









