সম্পাদকের পাতা

চট্টগ্রামের পাহাড় থেকে বৈশ্বিক আকাশে দেবযানী ঘোষ

নজরুল মিন্টো

আকাশের নীল সীমানায় ডানা মেলার স্বপ্ন মানুষ অনাদিকাল থেকেই দেখেছে। কিন্তু সেই নীল আকাশকে বিষাক্ত কার্বন থেকে মুক্ত রেখে আগামীর প্রজন্মের জন্য একটি পরিচ্ছন্ন পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন খুব কম মানুষই দেখতে পেরেছেন। সেই মুষ্টিমেয় স্বপ্নবাজদের একজন দেবযানী ঘোষ। চট্টগ্রামের পাহাড়ঘেরা জনপদ থেকে উঠে এসে তিনি আজ বৈশ্বিক এভিয়েশন গবেষণার এক অনন্য নাম। জার্মানির স্টুটগার্ট বিমানবন্দরের (Stuttgart Airport) রানওয়ে থেকে যখন বিশ্বের প্রথম চার আসনের হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল চালিত বৈদ্যুতিক বিমান ‘HY4’ ডানা মেলে, তখন সেই ডানার প্রতিটি স্পন্দনে জড়িয়ে ছিল একজন বাংলাদেশি নারীর ঘাম, মেধা আর নিরলস শ্রম। দেবযানী প্রমাণ করেছেন, মেধা ও ইচ্ছাশক্তি থাকলে চট্টগ্রামের অলিগলি পেরিয়েও বিশ্ববিজ্ঞানের মূলধারায় পৌঁছানো সম্ভব।

দেবযানীর জন্ম ১৯৮৮ সালের ৩০ অক্টোবর, চট্টগ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তার বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামের আলো-বাতাসে। ছোটবেলা থেকেই অজানাকে জানার এক তীব্র তৃষ্ণা ছিল তার দুচোখে। অপর্ণাচরণ উচ্চ বিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ -এর গণ্ডি পেরিয়ে তিনি যখন মেধার স্বাক্ষর রেখে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (CUET) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশলে ভর্তি হন, তখনই তার জীবনের লক্ষ্য স্থির হয়ে গিয়েছিল।

শিক্ষাজীবন শেষে তিনি চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা শুরু করেন। কিন্তু তার স্বপ্ন ছিল আরও সুদূরপ্রসারী। গবেষণার নেশা তাকে টেনে নিয়ে যায় বিজ্ঞানের তীর্থস্থান জার্মানিতে। আরডাব্লিউটিএইচ আচেন বিশ্ববিদ্যালয় (RWTH Aachen University) থেকে পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর এবং পরবর্তীতে ইউনিভার্সিটি অফ উলম (University of Ulm) থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করে তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেন এক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের জন্য।

২০১৬ সাল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্ব যখন টালমাটাল, তখন বিজ্ঞানীরা খুঁজছিলেন এমন এক বিমান যা পরিবেশের ক্ষতি না করে আকাশে উড়বে। জার্মানির অ্যারোস্পেস সেন্টার এবং হাইড্রোজেন এন ই -এর যৌথ উদ্যোগে শুরু হয় ‘HY4’ প্রকল্প। এটি ছিল বিশ্বের প্রথম চার আসনের কার্বন নিঃসরণমুক্ত বিমান। এই প্রজেক্টের হৃদপিণ্ড বা বিদ্যুৎ শক্তি ব্যবস্থাপনা বিভাগের দায়িত্ব পড়ে দেবযানীর ওপর।

একজন বাঙালি নারী হিসেবে ইউরোপের অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এমন একটি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। কিন্তু দেবযানী ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তার লক্ষ্য ছিল ফুয়েল সেল ও ব্যাটারির শক্তিকে এমনভাবে সমন্বয় করা, যাতে বিমানটি কেবল উড়তেই না পারে, বরং নিরাপদ ও হালকা থেকেও কার্যকর থাকে।

দেবযানীর মূল কাজ ছিল বিমানের পাওয়ার ইলেকট্রনিক্স ব্যবস্থা নিয়ে। তিনি প্রথাগত সিলিকন প্রযুক্তির বদলে অত্যাধুনিক সিলিকন কার্বাইড ব্যবহার করে একটি নতুন আর্কিটেকচার তৈরি করেন। এর ফলে বিমানের ওজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে, বিদ্যুৎ অপচয় রোধ হয়ে দক্ষতা বাড়ে, এবং ডিসি বিদ্যুৎ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এসিতে রূপান্তরিত হয়ে মোটর পরিচালিত হয়। এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনই HY4 প্রকল্পকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

তার তৈরি এই ইন্টারফেসটি ব্যাটারির চার্জিং-ডিসচার্জিং এবং শক্তি প্রবাহ এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যে, বিমানটি যখন উড্ডয়ন করে তখন একরকম শক্তি ব্যবহার করে, আবার যখন আকাশে ভাসে তখন অন্য এক কৌশলে জ্বালানি সাশ্রয় করে। এই জটিল গাণিতিক ও প্রকৌশলগত সমাধানটিই ছিল HY4-এর সফলতার চাবিকাঠি।

স্টুটগার্ট বিমানবন্দরে সেদিন ছিল টানটান উত্তেজনা। দেবযানী ও তার দলের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের পরীক্ষা। রানওয়ে ধরে যখন HY4 বিমানটি ওপরে উঠতে শুরু করল, তখন পৃথিবীর ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যুক্ত হলো। বিমানটি থেকে কেবল জলীয় বাষ্প নির্গত হচ্ছিল, কোনো ধোঁয়া নয়। এই সফল উড্ডয়ন কেবল একটি প্রযুক্তির জয় ছিল না, এটি ছিল দেবযানীর মতো হাজারো স্বপ্নদ্রষ্টার জয়।

দেবযানী থেমে থাকেননি। ২০২২ সালে তাদের তৈরি হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল চালিত বিমানটি ৭,২৩০ ফুট উচ্চতায় পৌঁছে নতুন এক মাইলফলক স্থাপন করে। এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ইউরোপে নিঃসরণমুক্ত উড্ডয়ন গবেষণাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ‘হাইড্রোজেন এভিয়েশন সেন্টার’ (Hydrogen Aviation Center) গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই কেন্দ্রকে ঘিরে গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক হাইড্রোজেন এভিয়েশনের প্রস্তুতির কাজ ধাপে ধাপে এগিয়ে চলছে।

এভিয়েশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো একটি অত্যন্ত পুরুষশাসিত খাতে নিজের জায়গা করে নেওয়া সহজ ছিল না। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ইউরোপের এভিয়েশন সেক্টরে ৪১ শতাংশ নারী কাজ করলেও কারিগরি বা ইঞ্জিনিয়ারিং ভূমিকায় তাদের উপস্থিতি নগণ্য। যুক্তরাজ্যে মাত্র ১৩.৩ শতাংশ প্রকৌশলী নারী। এমন এক বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্যের বাস্তবতায় দেবযানী কেবল টিকে থাকেননি, বরং নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধান কোনো পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে না; তা নির্ধারিত হয় মেধা, নিষ্ঠা এবং অদম্য সংকল্প দিয়ে।

দেবযানীর এই সাফল্যের পেছনে কাজ করেছে তার সততা এবং নিবিড় গবেষণা। তিনি বিশ্বাস করেন মেধা যখন কঠোর পরিশ্রমের সাথে যুক্ত হয়, তখনই কেবল মহৎ কিছু সৃষ্টি হয়। তিনি কেবল একজন প্রকৌশলী নন, তিনি একজন পরিবেশযোদ্ধাও বটে। তার প্রতিটি গবেষণার মূলে রয়েছে পৃথিবীকে রক্ষা করার আকুতি। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তি যদি মানুষের কাজে না লাগে এবং প্রকৃতিকে ধ্বংস করে, তবে সেই অগ্রগতির কোনো মূল্য নেই।

বর্তমানে এভিয়েশন শিল্প (Global Aviation Industry) বিশ্বজুড়ে ৩ শতাংশ কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী, যা ২০৫০ সালের মধ্যে ২২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। দেবযানী বলেন, “এটি এখন আর কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; আমরা প্রমাণ করেছি যে নিঃসরণমুক্ত উড্ডয়ন সত্যিই সম্ভব।”

হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল চালিত HY4 বিমানের সফল উড্ডয়ন বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিবিসি, রয়টার্স, ইউরোনিউজ এবং ডয়চে ভেলে-এর মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই প্রকল্পকে পরিবেশবান্ধব এভিয়েশনের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরে। প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানবিষয়ক আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে HY4-এর বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি দক্ষতার বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত হয়।

দেবযানী ঘোষ আজ অসংখ্য তরুণ-তরুণীর জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম। তিনি দেখিয়েছেন যে, অখ্যাত একটি স্কুল থেকে পড়েও বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে যাওয়া সম্ভব। বর্তমান প্রজন্মের কাছে তিনি বার্তা দিচ্ছেন, বিজ্ঞান মানে কেবল বইয়ের পাতা নয়, বিজ্ঞান মানে হলো পৃথিবীকে বাসযোগ্য করার হাতিয়ার।

দেবযানী ঘোষ এখন কেবল চট্টগ্রামের মেয়ে নন, তিনি সারা বিশ্বের গর্ব। তার তৈরি করা পথ ধরে আগামী দিনে হয়তো হাজার হাজার যাত্রী নিয়ে উড়বে বড় বড় উড়োজাহাজ। আকাশ হবে নীল, বাতাস হবে নির্মল। আর সেই ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে একজন বাংলাদেশি নারীর নাম।


Back to top button
🌐 Read in Your Language