
দেখতে দেখতে ২০২৫ সাল প্রায় শেষের পথে। সময়টা এমন, ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টাতে উল্টাতে বছরটি যেন কেটে গেল নাচে, গানে, আবৃত্তিতে, নাটকে আর মেলা ও উৎসবে। আমি কানাডার কথা বলছি। আরও নির্দিষ্ট করে বললে টরন্টোর কথা বলছি। পুরো বছরজুড়ে এই শহরের বাংলাদেশ কমিউনিটি মেতেছিল একটানা উৎসবের আমেজে। মঞ্চ বদলেছে, ব্যানার বদলেছে, অতিথির নাম বদলেছে; কিন্তু উৎসবের ধারা একটুও থামেনি।
একেকটি আয়োজন ছিল বিশাল আর বিশাল। টরন্টোর আকাশে এ বছর হাজার হাজার, লাখ লাখ ডলার উড়েছে। কেবল আনন্দ বিনোদনের জন্য বাঙালিরা এ অর্থ উড়িয়েছে। আলো ঝলমলে হলঘর, রঙিন স্টেজ, ব্যাকড্রপ, সাউন্ড সিস্টেম, দেশ থেকে আনা শিল্পী, ফাইভ স্টার হোটেল, গাড়ি, ফুল আর ক্রেস্টের বন্যায় দেখা গেছে অর্থের এক উন্মাতাল উড্ডয়ন।
তবে এসব অর্থ আয়োজকদের পকেট থেকে আসেনি। টরন্টোর কমিউনিটিকে বিনোদন দেওয়ার জন্য সদা প্রস্তুত এক পাল গৌরিশঙ্কর। ইতিহাসের পাতায় দানবীর গৌরিশঙ্করের নাম হয়তো একাই আছে, কিন্তু আমাদের এই নগরীতে যে অর্ধশতাধিক দানবীরের বসবাস, বাইরের পৃথিবী কয়জনই বা তা জানে। অনুষ্ঠানের বহর যত বড় হয়, এই দানবীরদের উপস্থিতিও তত বাড়ে। এদেরই বলা হয় স্পন্সর।
হঠাৎ কেউ যদি এসব আয়োজনের কোনো পোস্টার বা ব্যানার দেখেন, মনে হতে পারে এটি বুঝি শহীদদের কোনো তালিকা। আর মঞ্চের পেছনের বিশাল ড্রপে বিশাল ছবি, ‘পাওয়ার স্পন্সর’ বা ‘প্লাটিনাম স্পন্সর’-দের নাম লেখা দেখে অনেকেরই ধারণা হয়, অনুষ্ঠানটি বুঝি তাঁদেরই স্মরণে আয়োজন করা হয়েছে।
স্পন্সরশিপ আজকাল শুধু ব্যবসায়িক প্রচারে নয়, এটা যেন ‘মঞ্চে ওঠার লাইসেন্স’। স্পন্সরের নামের আগে-পিছে লাগে বাহারি অলঙ্কার। প্লাটিনাম, মেগা, গোল্ড, সিলভার কিংবা পাওয়ার। এখানেই শেষ নয়; বাড়তি কিছু দিলে বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগও মেলে। অনেকেই এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না, কারণ নেতা বলে কথা। মঞ্চে দাঁড়িয়ে কিছু না কিছু বলতেই হবে। কী বলছেন, কেউ শুনছে কি না, সেটা কোনো বিষয় নয়। যে যত দেয়, সে তত বলে। এসব আয়োজনের মঞ্চে কথা বলাটাও এখন কেনা-বেচার অংশ। এখানে নৈতিকতার কথা তুলে লাভ নেই। এই বাজারি ব্যবস্থার নামই হচ্ছে ‘পেইড লিডারশিপ’।
আজ পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে অনুষ্ঠান আয়োজন করতে আর সংগঠনেরও প্রয়োজন পড়ে না। যদু, মধু যে কেউ একটু আওয়াজ তুললেই হলো, হোক তা ব্যক্তিগত আয়োজন, মুহূর্তেই নানান কিসিমের স্পন্সরদের ভিড় লেগে যায়। শোনা যায়, আজকাল বিবাহ বার্ষিকী থেকে শুরু করে ছেলের ‘সুন্নতে খাতনা’ পর্যন্ত সবকিছুতেই স্পন্সরের ছড়াছড়ি। আহারে স্পন্সর!
এদিকে টরন্টোতে বইছে ‘ক্রেস্ট সংস্কৃতি’র জোয়ার। ঘরে ঘরে এখন ক্রেস্ট আর পদকের ছড়াছড়ি। দেয়ালে, আলমারিতে, অফিসের টেবিলে। সাংবাদিকতার ভাষায় একে বলা যায় ‘ডোনেশন ইন এক্সচেঞ্জ ফর অ্যাপ্রিসিয়েশন’। কেউ কেউ একা বসে এই ‘ক্রয়কৃত সম্মান’-এর সংখ্যা গুনে তৃপ্তির ঢেউ তোলেন। স্ত্রী হয়তো বিরক্ত হয়ে বলেন, “শুধু শুধু টাকা নষ্ট করে এই কাঁচের টুকরা ঘরে আনছো কেন?” সন্তান বলে, “বাবা এগুলো তো তোমার অর্জন নয়, পয়সা দিয়ে কেনা।”। কিন্তু পদকধারী অবজ্ঞার হাসিতে বলেন, “তোমরা এসব বুঝবা না”। আসলেই তো, কয়জনই বা বোঝে এই আভিজাত্যের লড়াই?
বছরজুড়ে নাচ–গান করে মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে, অথচ আমরা কিছুই পাইনি বললে ঠিক বলা হবে না। ২০২৫ সালে আমরা অনেক কিছুই পেয়েছি। পেয়েছি অর্ধশত চেয়ারম্যান। পেয়েছি নানান টাইটেলের শতাধিক কনভেনর। আরও পেয়েছি বয়স ও ব্যাধিতে জর্জরিত হাজার খানেক উপদেষ্টা।
উপদেষ্টা পরিষদে নাম ছাপা হলেই ইনাদের গর্ববোধ জেগে ওঠে। তালিকায় নামের অবস্থান একটু উপরে নিচে হলে কেউ কেউ কপট রাগ দেখান, তবু ভেতরে ভেতরে সেই গর্বই বহন করেন। পরম মমতায় আলমারি থেকে আবার স্যুট আর টাই বের করেন। মঞ্চে যখন তাঁদের নাম ঘোষণা করা হয়, তখন চেহারার উজ্জ্বলতাই বলে দেয় আনন্দের মাত্রা। কানাডার সিটিজেনশিপ পাওয়ার আনন্দের চেয়েও ‘অ্যাডভাইজার’ কার্ড গলায় ঝোলানোর আনন্দ যেন বহুগুণ বেশি।
সব আয়োজন যে সুস্থ বিনোদন ছিল, তা কিন্তু নয়। অনেক ক্ষেত্রেই অপসংস্কৃতি আর বাণিজ্যিক মোহ মূল উদ্দেশ্যকে গ্রাস করেছে।
আমাদের নেতারা মঞ্চে উঠলেই ‘নতুন প্রজন্ম’ নিয়ে আবেগে ভেসে যান। “আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে শেকড় চিনতে হবে”, “তাদের জন্য আমাদের এই আয়োজন” বুলিগুলো শুনতে বেশ লাগে। কিন্তু কোথায় সেই নতুন প্রজন্ম। এসব অনুষ্ঠানে বিদ্যাশিক্ষায় অভাবনীয় সাফল্য পাওয়া কোনো মেধাবী ছাত্র বা কোনো তরুণ উদ্ভাবককে মঞ্চে তুলে সম্মান জানাতে তো দেখি না। দেশের বরেণ্য বিজ্ঞানী, গবেষক, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী তাদের পরিচয় করিয়ে দিতে দেখি না। আমরা তো শুধু নাচে গানে মগ্ন থাকতে চাই। ক্যামেরা ঘোরে নাচের ছন্দের দিকে। আলো পড়ে ভাড়া করা শিল্পীর মুখে। মেধা এখানে আলো পায় না। এই প্রজন্মের সফল ছেলেমেয়েরা যখন আমাদের এইসব সার্কাস দেখে, তখন তারা আমাদের কাছ থেকে আরও দূরে সরে যায়।
অনেকে বলেন, এসব নিয়ে আমি লিখি না কেন? কার জন্য লিখব? যাদের জন্য লিখব তারা আমার কথা শুনবে কেন? তারা শুনবে তাদের পয়সা দেওয়া মানুষের কথা।
আমি যদি বলি, ফাদার্স ডে বা মাদার্স ডেতে কৃতি সন্তানদের গর্বিত বাবা মায়েদের সংবর্ধনা দেওয়া হোক। তাঁরা প্রশ্ন করেন, স্পন্সর করবে কে?
আমি যদি বলি, ক্রিসমাস বা নিউ ইয়ার্সের ছুটিতে যখন শহর প্রায় বন্ধ থাকে, তখন আমরা কমিউনিটির পক্ষ থেকে টরন্টোর হোমলেসদের পাশে দাঁড়াতে পারি। শীতবস্ত্র দিতে পারি, খাবার দিতে পারি। তারা বলেন, এগুলো সরকারের কাজ, আমাদের নয়।
গত ৪০ বছর ধরে শুনছি আমাদের একটি কমিউনিটি সেন্টার দরকার। কিন্তু প্রস্তাব দিলেই নেতারা বলেন, “আগে সবাই এক হোক।” এই এক হওয়া যেন এক অনন্ত অপেক্ষা। আর এই ‘এক হওয়া’র পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো ‘চেয়ারম্যান’ হওয়ার মোহ।
হে মহান স্পন্সরগণ, আপনাদের উপার্জিত অর্থ কীভাবে ব্যয় করবেন, সে অধিকার একান্তভাবেই আপনাদের। আপনারা যদি সেই অর্থ নিজেদের ভোগ বিলাস, ব্যক্তিগত আনন্দ কিংবা পারিবারিক আয়োজনে ব্যয় করেন, সেখানে কারও কিছু বলার সুযোগ নেই। সেই স্বাধীনতা আপনাদের প্রাপ্য। তবে বিনীত অনুরোধ এইটুকু, অপসংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করে আমাদের কমিউনিটিকে বিপথে পরিচালিত করার অংশীদার হবেন না। আপনার অর্থের প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত যায়। একটি ভুল জায়গায় দেওয়া স্পন্সরশিপ কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, একটি প্রজন্মের রুচি ও মূল্যবোধকেও প্রভাবিত করে। আনন্দ যদি হয়, তা হোক সুস্থ ও মানবিক। বিনোদন যদি হয়, তা হোক সংস্কৃতিসম্মত ও মূল্যবোধসম্পন্ন। আপনাদের সচেতন সিদ্ধান্তই পারে আমাদের কমিউনিটিকে সঠিক পথে রাখতে, এবং এই শহরে আমাদের পরিচয়কে আরও মর্যাদার দিকে নিয়ে যেতে।
কানাডার মূলধারার রাজনীতিতে যেসব বঙ্গসন্তান যুক্ত হয়েছেন বা হতে যাচ্ছেন, তাঁদের কাছে বিনীত কিন্তু দৃঢ় অনুরোধ, লোক দেখানোর রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসুন। যদি সত্যিকার অর্থে কানাডার রাজনীতিতে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে চান, তবে বাংলা টাউন বা নিজেদের কমিউনিটির গণ্ডি পেরিয়ে বাইরে আসুন। মূলধারার মানুষজন আপনাদের কর্মকাণ্ড দেখুক, আপনাদের কাজের মধ্য দিয়ে আপনাদের চিনুক। মনে রাখতে হবে, আপনি কাউন্সিলর হবেন, মেয়র হবেন, এমপিপি হবেন কিংবা এমপি হবেন কেবল বাংলাদেশিদের ভোটে নয় এবং কেবল বাংলাদেশিদের জন্যও নয়।
কানাডিয়ান পাসপোর্ট হাতে থাকা আর প্রকৃত অর্থে কানাডিয়ান হয়ে ওঠার মধ্যে যে মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্য আছে, সেটি বোঝার চেষ্টা করুন। রাজনীতি মানে আয়োজকদের মোটা অংকের চাঁদা দিয়ে বা স্পন্সর হয়ে মঞ্চে উঠে বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ কেনা নয়। রাজনীতি মানে অর্থ দিয়ে অর্থহীন ক্রেস্ট সংগ্রহ করা নয়। রাজনীতি মানে মানুষের বিপদে আপদে পাশে থাকা, জনজীবনের মৌলিক সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করা এবং নিয়মিতভাবে জনজীবনের সঙ্গে যুক্ত থাকা।
আপনাদের কার্যক্রমের পরিধি বাড়ান। স্থানীয় স্কুলের ফান্ডরেইজিং, ফুড ব্যাংকের কার্যক্রম, পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি কিংবা সিনিয়র সেন্টারের স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে নিয়মিত উপস্থিত থাকুন। এখানকার মানুষ দেখুক, আপনি শুধু ভোটের সময় নয়, সব সময়ই সমাজের অংশ। এখানে ওখানে টাকা ছিটিয়ে নাম জাহির করার বদলে জনকল্যাণে সময় দিন, শ্রম দিন এবং সততার সঙ্গে পাশে দাঁড়ান।
আর যদি সত্যিই বুঝতে না পারেন আপনার রাজনীতির দর্শন কী, কী করবেন বা কেন এই পথে আসছেন, তবে এখানেই থামুন। এই জায়গাটি গদি দখল করে রাখার জায়গা নয়। এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত থাকুক। আমাদের ছেলেমেয়েরা এই দেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির সাথে মিশে নিজেদের পরিচয় গড়ে তুলছে। একদিন তারাই তাদের কাজ আর মেধার মাধ্যমে আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবে। দয়া করে আপনাদের সস্তা রাজনীতির ‘আবর্জনা’ দিয়ে তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথটি আটকে দেবেন না।
২০২৫ শেষ হচ্ছে। ২০২৬ আসছে। আবার নতুন কনভেনর আসবেন, নতুন চেয়ারম্যানের নাম ঘোষণা করা হবে। পুরোনোদের পাশে নতুন ‘গৌরিশঙ্করদের’ আবির্ভাব ঘটবে। আলমারিতে চকচকে কাঁচের ক্রেস্টের সংখ্যা আরও বাড়বে। নতুন কোনো মেগা ইভেন্ট জন্ম নেবে। আমরা নাচবো, আমরা গাইবো। কেউ কেউ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে যাবো।
সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা। আশা করি, ২০২৬ আমাদের কেবল উৎসব নয়, কিছু বোধও দেবে।









