সম্পাদকের পাতা

নিউ ইয়র্কে হোম কেয়ার সেবার নামে ৬৮ মিলিয়ন ডলারের ভয়াবহ জালিয়াতি

নজরুল মিন্টো

৬৮ মিলিয়ন ডলার জালিয়াতি চক্রের প্রধান জাকিয়া খান

নিউইয়র্ক সিটির ব্রুকলিন বরোর দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত কনি আইল্যান্ড। আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে গড়ে ওঠা এই এলাকা দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত সমুদ্রস্নান ও বিনোদনের কেন্দ্র হিসেবে। ম্যানহাটন থেকে সাবওয়ে বা সড়কপথে প্রায় এক ঘণ্টার দূরত্বে থাকা কনি আইল্যান্ডে প্রতিদিনই ভিড় করেন পর্যটকরা। তবে এই উচ্ছ্বাস আর আলোঝলমলের আড়ালেই রয়েছে আরেক বাস্তবতা। এখানে বসবাস করেন বিপুলসংখ্যক অভিবাসী পরিবার, প্রবীণ নাগরিক এবং শারীরিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে জীবনযাপন করা মানুষ।

এই বাস্তবতার কারণেই এই এলাকায় মেডিকেইডভিত্তিক ডে কেয়ার ও হোম কেয়ার সেবার বিস্তার ঘটেছে। যে সেবার উদ্দেশ্য ছিল অসহায় মানুষকে সহায়তা করা, সেই ব্যবস্থাকেই ব্যবহার করে বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠে এক সুবিন্যস্ত অর্থলুটের নেটওয়ার্ক। অবশেষে ফেডারেল তদন্তে উন্মোচিত হয় প্রায় ৬৮ মিলিয়ন ডলারের ভয়াবহ জালিয়াতির ঘটনা।

হোম কেয়ার সেবার আড়ালে ৬৮ মিলিয়ন ডলারের অর্থলুটের ঘটনায় জাকিয়া খানের সহযোগী আহসান ইজাজ

এই জালিয়াতি চক্রের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন পাকিস্তানি বংশোদ্ভুত দুই ব্যক্তি। একজন জাকিয়া খান, অন্যজন তার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক সহযোগী আহসান ইজাজ। সম্পর্কে তারা মা ও ছেলে। তারা ব্রুকলিনে দুটি সামাজিক প্রাপ্তবয়স্ক ডে কেয়ার সেন্টারের মালিক ছিলেন। একটি Happy Family Social Adult Day Care Center Inc., অন্যটি Family Social Adult Day Care Center Inc.। পাশাপাশি তারা পরিচালনা করতেন একটি হোম কেয়ার সংশ্লিষ্ট আর্থিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান Responsible Care Staffing Inc.।

Happy Family Social Adult Day Care এবং Family Social Adult Day Care কার্যক্রম কার্যত বন্ধ

আদালতের নথি অনুযায়ী, এই পরিকল্পনার সূচনা হয় অক্টোবর ২০১৭ থেকে এবং তা অব্যাহত থাকে জুলাই ২০২৪ পর্যন্ত। প্রায় সাত বছর ধরে একই কৌশল বারবার ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রথম ধাপ ছিল মেডিকেইডভুক্ত মানুষ সংগ্রহ। এ কাজে ব্যবহার করা হয় তথাকথিত মার্কেটারদের। তারা কনি আইল্যান্ড, বাথ বিচসহ আশপাশের এলাকায় গিয়ে প্রবীণ মানুষ ও তাদের পরিবারকে নানা প্রলোভন দেখাতেন। কোথাও নগদ অর্থ, কোথাও উপহার, কোথাও আবার বিনা খরচে যাতায়াতের আশ্বাস। উদ্দেশ্য একটাই, ডে কেয়ার সেন্টারে নাম লেখানো।

এরপর শুরু হতো দ্বিতীয় ধাপ। সেই নাম ব্যবহার করে মেডিকেইডে নিয়মিত বিল জমা দেওয়া হতো। অভিযোগ অনুযায়ী, বহু ক্ষেত্রেই যে সেবার জন্য বিল করা হয়েছে, সেই সেবা বাস্তবে দেওয়া হয়নি। কোথাও সেবাই ছিল না, কোথাও আবার ঘুষ ও কিকব্যাকের মাধ্যমে কেবল কাগজে সেবার উপস্থিতি দেখানো হয়েছে।

এই পুরো ব্যবস্থার ভেতরে বড় ভূমিকা রেখেছে নিউইয়র্কের একটি মেডিকেইড কর্মসূচি Consumer Directed Personal Assistance Program বা CDPAP। এই কর্মসূচির মাধ্যমে মেডিকেইডভুক্ত ব্যক্তি নিজের পরিচর্যাকারী নিজেই বেছে নিতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে সেই পরিচর্যাকারী পরিবারের সদস্যও হতে পারেন। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধারণাটি প্রশংসনীয়।

কিন্তু বাস্তব ব্যবস্থাপনায় এই কর্মসূচির বড় দুর্বলতা হলো তথাকথিত ফিসকাল ইন্টারমিডিয়ারি কাঠামো। এই মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পে রোল, বিলিং ও কাগজপত্র সামলায়। তদারকি দুর্বল হলে এখানেই তৈরি হয় বড় ফাঁক। ফেডারেল অভিযোগ অনুযায়ী, Responsible Care Staffing Inc. ঠিক এই জায়গাটিকেই ব্যবহার করেছে। কাগজে সেবা দেখিয়ে বিল, আর আড়ালে ঘুষের টাকা।

তদন্তে উঠে এসেছে, এই জালিয়াতি একটি বা দুটি প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ ছিল না। অর্থের প্রবাহ আড়াল করতে ব্যবহার করা হয়েছে একাধিক ব্যবসায়িক সত্তা। এর মধ্যে জাকিয়া খানের Tanwee Services Inc. কে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা জালিয়াতির অর্থ গ্রহণ ও নগদ জোগাড়ের কাজে ব্যবহৃত হতো বলে অভিযোগে বলা হয়।

ফেডারেল তদন্তকারীরা জানান, বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, শেল কোম্পানি এবং ব্যবসায়িক লেনদেনের আড়ালে তৈরি করা হতো নগদ অর্থ, যা দিয়ে নিয়মিত কিকব্যাক ও ঘুষ দেওয়া হতো।

তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতে এই জালিয়াতি ধরা পড়ে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের মেডিকেইড প্রশাসন ও ফেডারেল স্বাস্থ্য ও মানবসেবা দপ্তরের (HHS) ইনস্পেক্টর জেনারেল অফিসের একটি নিয়মিত অডিট ও আর্থিক বিশ্লেষণে। বিলিং ডেটা পর্যালোচনার সময় তারা লক্ষ্য করেন, একই ধরনের সামাজিক প্রাপ্তবয়স্ক ডে কেয়ার সেবার জন্য অস্বাভাবিকভাবে বিপুল অঙ্কের বিল জমা দেওয়া হচ্ছে।

একাধিক ক্ষেত্রে একই সুবিধাভোগীর নাম বারবার ব্যবহার করা হয়েছে, আবার কিছু ঘটনায় দেখা যায় যেসব দিনে সেবা দেওয়ার কথা দেখানো হয়েছে, সেই দিনগুলোতে সংশ্লিষ্ট মেডিকেইড সুবিধাভোগীরা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেই অবস্থান করছিলেন। এই তথ্যগুলো একত্রে বিশ্লেষণ করতেই তদন্তকারীদের সন্দেহ ঘনীভূত হয়। ধীরে ধীরে বিষয়টি ফেডারেল অপরাধ তদন্তের পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

৯ অক্টোবর ২০২৪ ভোরে, নিউইয়র্ক সিটির বিভিন্ন স্থানে একযোগে অভিযান চালায় ফেডারেল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনস (HSI), স্বাস্থ্য ও মানবসেবা দপ্তরের ইনস্পেক্টর জেনারেল অফিস (HHS-OIG) এবং নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ (NYPD)–এর যৌথ টিম অভিযুক্তদের বাসা ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছে যায়। পরিকল্পিত অভিযানে একে একে অভিযুক্তদের আটক করা হয়।

গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অভিযুক্তদের ব্রুকলিন ফেডারেল কোর্টে হাজির করা হয় এবং সেদিনই আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়। বহু বছরের গোপন জালিয়াতির অভিযোগ যখন আদালতের কাঠগড়ায় উঠে আসে, তখন বিষয়টি দ্রুতই আদালতকেন্দ্রিক খবরের গণ্ডি পেরিয়ে মূলধারার গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। নিউইয়র্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম, জাতীয় পত্রিকা ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো একে একে প্রকাশ করতে থাকে এই মেডিকেইড জালিয়াতির বিস্তারিত।

নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশিসহ অন্যান্য অভিবাসী কমিউনিটিতে তৈরি হয় তীব্র বিস্ময় ও উদ্বেগ। যেসব ডে কেয়ার সেন্টারকে অনেক পরিবার প্রবীণ সদস্যদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় বলে ভেবেছিল, সেগুলোর নামই উঠে আসে ফেডারেল অভিযোগে। কেউ কেউ বিস্ময়ে প্রশ্ন তোলেন, এত বছর ধরে কীভাবে এই কার্যক্রম নজরের বাইরে থেকে গেল। আবার অনেক প্রবীণ ও তাদের পরিবার শঙ্কিত হয়ে পড়েন, তাদের নাম ও তথ্য কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তারা নিজেরাই কি কোনোভাবে এই অপরাধের অংশ হয়ে গেলেন।

এরপর আসে মামলার সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়। ৬ আগস্ট ২০২৫, ব্রুকলিনের ফেডারেল আদালতে জাকিয়া খান দোষ স্বীকার করেন। বিচারক ছিলেন United States District Judge Natasha C. Merle। তবে এই দোষ স্বীকার কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত ছিল না, কিংবা কোনো চাপহীন স্বীকারোক্তিও নয়।

আদালতের নথি ও প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েক মাস ধরে মামলায় একের পর এক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়। আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড, একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য, শেল কোম্পানির কাগজপত্র, জব্দকৃত নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার, এবং সহ-আসামিদের স্বীকারোক্তি, সব মিলিয়ে প্রসিকিউশনের হাতে গড়ে ওঠে একটি শক্ত প্রমাণের কাঠামো। এই প্রমাণগুলো স্পষ্ট করে দেখায়, কীভাবে ডে কেয়ার ও হোম কেয়ার সেবার আড়ালে মেডিকেইড অর্থ নিয়মিতভাবে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটেই জাকিয়া খান আদালতে দাঁড়িয়ে স্বীকার করেন যে, তিনি প্রায় ৬৮ মিলিয়ন ডলারের মেডিকেইড জালিয়াতির ষড়যন্ত্রে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন, এবং এই কার্যক্রম তার মালিকানাধীন ও নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়েছে।

দোষ স্বীকারের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও জাকিয়া খানের মধ্যে একটি প্লিয়া এগ্রিমেন্ট সম্পন্ন হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী, মার্কিন সরকার জাকিয়া খানের কাছ থেকে ৫ মিলিয়ন ডলার বাজেয়াপ্ত করে। আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়, এই বাজেয়াপ্তির আওতায় রয়েছে একাধিক রিয়েল এস্টেট সম্পত্তি, যেগুলো জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ ব্যবহার করে কেনা হয়েছিল বলে প্রসিকিউশন দাবি করে।

এছাড়া, ফেডারেল এজেন্টরা তার বাসায় তল্লাশির সময় ৩ লাখ ডলারের বেশি নগদ অর্থ এবং বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার জব্দ করেন। আদালতে উপস্থাপিত নথিতে এই নগদ অর্থ ও অলংকারের বিবরণ প্রকাশ পাওয়ার পর মামলাটি নতুন মাত্রা পায়। এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, মেডিকেইড বিলিংয়ের কাগুজে জালিয়াতি কীভাবে নগদ অর্থ, রিয়েল এস্টেট ও মূল্যবান অলংকারে রূপ নিয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ধারণা করা হয় যে জাকিয়া খান বেনামে আরও সম্পদ ক্রয় করেছিলেন এবং কয়েক মিলিয়ন ডলার পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয়েছে। এই সম্ভাব্য অর্থপাচার ও অঘোষিত সম্পদের বিষয়টি এখনও পৃথকভাবে তদন্তাধীন রয়েছে, এবং ভবিষ্যতে আদালতের নথি বা নতুন অভিযোগে এসব বিষয়ে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে বলে তদন্তকারীরা ইঙ্গিত দিয়েছেন।

সরকারি নথি অনুযায়ী, জাকিয়া খানের দুই কর্মচারী Seema Memon এবং Amran Hashmi এর আগেই আদালতে দোষ স্বীকার করেছেন। তাদের স্বীকারোক্তিতে উঠে আসে, কীভাবে তারা প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কার্যক্রম পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন এবং কীভাবে কাগজপত্র ও আর্থিক লেনদেন বাস্তব সেবার সঙ্গে মিলত না জেনেও জাকিয়া খানের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ চালিয়ে গেছেন।

এই স্বীকারোক্তিগুলো মামলাকে আরও শক্ত করে তোলে এবং জাকিয়া খানের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের অবস্থানকে দৃঢ় করে। বর্তমানে এই দুইজন সাজা ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছেন। পাশাপাশি, এই মামলায় আরও ১১ জন আসামি এখনো বিচারাধীন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে জালিয়াতি কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতার।

ফেডারেল মামলার পর Happy Family Social Adult Day Care এবং Family Social Adult Day Care কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। Responsible Care Staffing Inc. এর কার্যক্রমও তদন্তের আওতায় রয়েছে। মেডিকেইড কর্তৃপক্ষ এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে।

৬৮ মিলিয়ন ডলারের জালিয়াতি কেবল একটি অপরাধের গল্প নয়। এটি একটি সতর্কবার্তা। প্রবীণ সেবা ও হোম কেয়ার খাতের মতো সংবেদনশীল জায়গায় সামান্য তদারকির ঘাটতি কীভাবে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, তারই এক নির্মম উদাহরণ।

এই মামলার পর নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের মেডিকেইড প্রশাসন ও ফেডারেল তদন্ত সংস্থাগুলো ব্রুকলিন ও কুইন্স এলাকার আরও বেশ কয়েকটি ডে কেয়ার ও হোম কেয়ার প্রতিষ্ঠানের বিলিং কার্যক্রম খতিয়ে দেখছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই খাতে নজরদারি এখন আরও বিস্তৃত ও কঠোর করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র:

U.S. Department of Justice, Eastern District of New York
United States District Court, EDNY (court filings & plea agreements)
U.S. Department of Health and Human Services, Office of Inspector General
Homeland Security Investigations (HSI), New York
Courthouse News Service, New York–based media reports


Back to top button
🌐 Read in Your Language