
আমেরিকার রাজনীতিতে মাঝে মাঝে এমন কিছু নাম উঠে আসে, যাদের উপস্থিতি কেবল একটি নির্বাচনী দৌড়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সেই নামগুলো একেকটি সময়ের ভাষা হয়ে ওঠে। নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়নের লড়াইয়ে নাম ঘোষণা করা কারিশমা মঞ্জুর তেমনই একটি নাম, যা ধীরে ধীরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসছে।
২০২৬ সালের সিনেট নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের সিনেটর জিন শাহিন পুনর্নির্বাচনে না দাঁড়ানোয় নিউ হ্যাম্পশায়ারের এই আসনটি উন্মুক্ত হয়েছে। ফলে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরেই শুরু হয়েছে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রতিযোগিতা। সেই প্রতিযোগিতায় একজন বাংলাদেশি বংশদ্ভুত বিজ্ঞানীর প্রবেশ শুধু রাজনৈতিক নয়, সামাজিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ।
কারিশমা মঞ্জুর কোনো পেশাদার রাজনীতিক নন। তিনি নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেন একজন বিজ্ঞানী হিসেবে, একজন গবেষক হিসেবে, একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে। কিন্তু এই সাধারণতার ভেতরেই রয়েছে তাঁর আলাদা শক্তি।
নিউ হ্যাম্পশায়ারের এক্সিটার শহরে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন কারিশমা। স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে তাঁর জীবন গড়ে উঠেছে মধ্যবিত্ত আমেরিকার চেনা বাস্তবতায়। একদিকে সন্তানদের পড়াশোনা, অন্যদিকে দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তাঁকে বাস্তব জীবনের কাছাকাছি রেখেছে। তাঁর এই বাস্তব অভিজ্ঞতাই রাজনীতিতে আসার পেছনে বড় প্রেরণা হয়ে উঠেছে।
পেশাগত জীবনে কারিশমা মঞ্জুর একজন প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানী। মলিকিউলার বায়োলজি ও বায়োকেমিস্ট্রিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্লিনিক্যাল রিসার্চে কাজ করেছেন। নিউরোলজিক্যাল রোগ বিশেষ করে মৃগীরোগ, বিষণ্নতা এবং আলঝেইমারের মতো জটিল অসুখের চিকিৎসা গবেষণায় তাঁর ভূমিকা রয়েছে। গবেষণাগারে বসে রোগের সমাধান খোঁজার এই অভিজ্ঞতা তাঁকে মানুষের কষ্টের গভীর বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেছে।
এই গবেষণার মধ্য দিয়েই তাঁর ভেতরে জন্ম নেয় এক গভীর হতাশা। তিনি উপলব্ধি করেন, যেসব চিকিৎসা উদ্ভাবনে তিনি কাজ করছেন, সেগুলোর সুফল আমেরিকার বিপুলসংখ্যক মানুষ কোনো দিনই পাবে না। কারণ তাদের স্বাস্থ্যবিমা নেই। এই উপলব্ধি থেকেই ধীরে ধীরে তিনি ননপ্রফিট ও সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। সেখান থেকেই রাজনীতির দিকে তাঁর যাত্রা।
কারিশমার রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা। তিনি সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার পক্ষে সরব। তাঁর ভাষায়, আমেরিকার স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি, বরং পরিকল্পিতভাবে এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে করপোরেট স্বার্থই মুখ্য। এই ব্যবস্থায় প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ অকালে প্রাণ হারাচ্ছে। একজন বিজ্ঞানী হিসেবে এই বাস্তবতা তাঁকে নৈতিকভাবে নাড়িয়ে দেয়।
স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি ন্যায্য মজুরি ও আবাসন সংকট তাঁর নির্বাচনী অঙ্গীকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিউ হ্যাম্পশায়ারে ন্যূনতম মজুরি দীর্ঘদিন ধরে অপরিবর্তিত। ফলে চাকরি করেও অনেক মানুষ সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারছে না। ভাড়া বাড়ছে, বাড়ি কেনা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। কারিশমা মনে করেন, এই সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি রাজনৈতিক ব্যর্থতার ফল।
অভিবাসন নীতির প্রশ্নেও তিনি একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তুলে ধরছেন। বিদ্যমান আইন মেনে একটি সমন্বিত ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর জোর দেন। আইসের কিছু কার্যক্রমের সমালোচনা করে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার এবং দীর্ঘমেয়াদি ডিটেনশন আইনের শাসনের পরিপন্থি।
নির্বাচনি অর্থায়ন নিয়ে তাঁর অবস্থান আরও স্পষ্ট। বড় করপোরেট অনুদান এবং বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাবকে তিনি গণতন্ত্রের জন্য হুমকি মনে করেন। তাঁর প্রচারণা ছোট অনুদান ও সাধারণ মানুষের সমর্থনের ওপর নির্ভর করছে। এই অবস্থান তাঁকে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রগতিশীল অংশের কাছে আলাদা করে তুলে ধরেছে।

কারিশমা মঞ্জুরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো তাঁর বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত পরিচয়। তিনি প্রথম প্রজন্মের অভিবাসী পরিবারের সন্তান। এই পরিচয় তিনি লুকান না, আবার রাজনীতির একমাত্র পরিচয় হিসেবেও ব্যবহার করেন না। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি সব কমিউনিটির প্রতিনিধি হতে চান। জাতিগত পরিচয়, জন্মস্থান বা বর্ণের ভিত্তিতে বিভাজনের রাজনীতিতে তিনি বিশ্বাস করেন না।
তবু বাস্তবতা হলো, একজন বাংলাদেশি বংশদ্ভুত নারীর সিনেট দৌড়ে নামা অভিবাসী কমিউনিটির জন্য গভীর গর্বের বিষয়। বিশেষ করে দ্বিতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশি আমেরিকানদের কাছে কারিশমা একটি প্রতীক। তিনি দেখিয়ে দিচ্ছেন, গবেষণাগার, শ্রেণিকক্ষ কিংবা সামাজিক আন্দোলন থেকে সরাসরি দেশের সর্বোচ্চ আইনসভায় যাওয়ার পথও সম্ভব।
নিউ ইয়র্কসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে অভিবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তাঁর উপস্থিতি ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। এসব সভায় তিনি শুধু ভোট চাননি, শুনেছেন মানুষের কথা। অভিবাসী কমিউনিটির ভূমিকার প্রশংসা করেছেন এবং নতুন প্রজন্মের আত্মবিশ্বাসের কথা তুলে ধরেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিউ হ্যাম্পশায়ারের মতো রাজ্যে একজন বিজ্ঞানী প্রার্থীর আবেদন আলাদা মাত্রা যোগ করতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং গবেষণার প্রশ্নে তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁকে অন্য প্রার্থীদের থেকে আলাদা করছে। যদিও ডেমোক্র্যাটিক মনোনয়নের লড়াই সহজ নয় এবং অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের মুখোমুখি হতে হবে, তবু কারিশমার উপস্থিতি এই প্রতিযোগিতাকে নতুন রূপ দিয়েছে।
আগামী ৮ সেপ্টেম্বর ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী বাছাই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেই নির্বাচনের আগে কারিশমা মঞ্জুরের পথচলা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত স্বপ্নের গল্প নয়। এটি আমেরিকান রাজনীতিতে অভিবাসী সন্তানদের দৃশ্যমান হওয়ার গল্প। এটি প্রমাণ করে, পরিচয় কোনো সীমা নয়, বরং দায়িত্ব নেওয়ার একটি উৎস।
কারিশমা মঞ্জুর হয়তো এখনো জাতীয় রাজনীতির পরিচিত নাম নন। কিন্তু তাঁর চিন্তাভাবনা, অভিজ্ঞতা এবং সাহসী অবস্থান ইঙ্গিত দেয়, এই নামটি ভবিষ্যতে আরও শোনা যাবে। আর সেই পথচলার প্রতিটি ধাপে বাংলাদেশি বংশদ্ভুত আমেরিকানরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারবেন, তিনি আমাদেরই একজন।









