সম্পাদকের পাতা

নীনার গল্প

নজরুল মিন্টো

আনোয়ারুল ইসলাম

২০২২ সালের মার্চ মাস। স্বাভাবিক একটি সন্ধ্যা। ঠিক সেই সন্ধ্যাতেই ইংল্যান্ডের এলমসওয়েলের একটি ছোট্ট পাবে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দুজন। এই প্রতিবেদনে মেয়েটিকে আমরা নীনা নামেই উল্লেখ করব, এটি তার ছদ্মনাম। আনোয়ারুল ইসলাম নামে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক তরুণের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল আগের দিন, এক পারস্পরিক বন্ধুর মাধ্যমে। পরিচয়টি ছিল আকস্মিক, তবুও দুজনের মধ্যে হয়েছিল অল্প কিছু কথোপকথন। ভয়েস নোটে বিনিময় হয়েছিল কণ্ঠস্বর, আর সেই কণ্ঠস্বরের মধ্যেই যেন নীনা খুঁজে পেয়েছিলেন সহজ-সরল বন্ধুত্বের আভাস।

মাত্র কয়েকটি সংক্ষিপ্ত মুহূর্তেই তার মনে জন্মেছিল এক ধরনের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস ভর করে তিনি ভাবতে শুরু করেছিলেন, হয়তো আনোয়ারুল একজন ভদ্র মানুষ, যাকে প্রথম ডেটে দেখা করা ঝুঁকিপূর্ণ হবে না। ফলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই দেখা করার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু সেই বিশ্বাসের ওপর দাঁড়ানো ভরসাটাই হঠাৎ ভেঙে পড়ল নির্মমভাবে। গণমাধ্যমের ভাষায় বললে এটি ছিল একটি আকস্মিক বিপর্যয়। আর মানবিক দৃষ্টিতে বললে, নীনার অন্তরের বিশ্বাসে এটি ছিল এক গভীর এবং নিষ্ঠুর আঘাত।

ইংল্যান্ডের পূর্ব উপকূল বরাবর বিস্তৃত শান্তিপূর্ণ কাউন্টি সাফোক। এর ভেতরেই আছে ছোট্ট এলাকা এলমসওয়েল। জনসংখ্যা কম, মানুষগুলো পরস্পরকে সবাই চেনে। একটি প্রধান রাস্তা গ্রামটিকে দুদিকে ভাগ করেছে, আর সেই রাস্তার পাশে আছে ঐতিহ্যবাহী পাব, কফিশপ, বেকারি এবং এক কোণে ছোট গ্রোসারি। সন্ধ্যা নামলে পাবে আলো জ্বলে, ভেতরে নিয়মিত গ্রাহকদের আনাগোনা বাড়ে, শোনা যায় পরিচিত কথাবার্তা। এখানকার সমাজবোধ এখনও ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। মানুষ একে অপরকে সাহায্য করে, অনুষ্ঠান ও উৎসবে একত্র হয়, আর অপরিচিতকেও অভ্যর্থনা জানাতে দ্বিধা করে না।

ইংল্যান্ডের শান্তিপূর্ণ কাউন্টি সাফোক

এমন একটি শান্ত, নিরাপদ এলাকার ভেতর কোনো ভয়াবহ ঘটনা সাধারণত ঘটে না। এলমসওয়েলের মানুষ রুটিন অনুযায়ী চলে। স্কুলে বাচ্চারা সারিবদ্ধভাবে হাঁটে, কর্মজীবীরা স্টোউমার্কেট বা ইপ্সউইচে যাতায়াত করে, আর অবসরপ্রাপ্তরা বিকেলের দিকে হাঁটতে বের হন। এই গ্রামকে অনেকে বলেন সাফোকের হৃদস্পন্দন। রাতের বেলা রাস্তা প্রায় ফাঁকা থাকে, আর অদ্ভুত কোনো শব্দ শুনলে মানুষ ধরে নেয়, কোনো পাখি পাতার দোলনায় নড়ছে।

এলমসওয়েলের সেই সন্ধ্যায় জীবন চলছিল তার নিজস্ব ছন্দে। স্থানীয় মানুষ দিনের কাজ শেষে বাড়ি ফিরছিল, কেউ হয়তো সেই পাবের এক কোণে বসে খাবারের অর্ডার দিচ্ছিল। বাইরে বইছিল হালকা সন্ধ্যাবাতাস। সবকিছুই ছিল সাধারণ, শান্ত এবং পূর্ববর্তী দিনগুলোর মতোই নির্ভরতার অনুভূতিতে ভরা। ঠিক সেই পরিবেশের মধ্যেই নীরবে এগিয়ে আসছিল একটি অপ্রত্যাশিত মুহূর্ত, যা পরে নীনার জীবনে গভীর দাগ রেখে যায়।

নীনা ভেবেছিলেন, প্রথম ডেট হয়তো একটি নতুন সম্পর্কের দরজা খুলে দেবে। তাই সেই সন্ধ্যায় তিনি স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তার সেই প্রত্যাশা ভেঙে যায়। এলমসওয়েলের ছোট্ট পাবের ভেতরে তিনি এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হন, যা তার হৃদয়ে ভয়, বিস্ময় এবং অসহায়তার এক কঠিন স্মৃতি তৈরি করে। সেই মুহূর্ত থেকেই সন্ধ্যার স্বাভাবিকতা থেমে যায়, আর শুরু হয় এক নির্মম অভিজ্ঞতার পরবর্তী অধ্যায়।

এলমসওয়েলের একটি প্রধান রাস্তা যেখানে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী পাব, কফিশপ ও বেকারি

সাফোক পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, আনোয়ারুল ইসলাম প্রথম সাক্ষাতের দিনই নীনাকে হোটেলে একটি রুম বুক করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা নীনা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। এক পর্যায়ে নীনা টয়লেটে গেলে, আনোয়ারুল ইসলাম তাকে অনুসরণ করে ভেতরে ঢুকে পড়েন এবং এক অসহায় পরিস্থিতিতে টয়লেটের ভিতরেই তাকে ধর্ষণ করেন। ঘটনাটি ছিল অতি আকস্মিক এবং অপ্রত্যাশিত। সেই মুহূর্তে নীনার প্রতিরোধ, ভয়ের চাপ, অশ্রু এবং বিস্ময় মিলেমিশে এক হৃদকম্পন ঘটানো বাস্তবতার জন্ম দেয়।

এই ঘটনার তদন্ত দীর্ঘ সময় নিয়ে এগিয়েছে। আদালতও খুব সতর্কতার সঙ্গে সব তথ্য পর্যবেক্ষণ করেছে। আনোয়ারুল ইসলাম প্রথম থেকেই অভিযোগ অস্বীকার করেন। আদালতের ভাষ্যে এটিও এক ধরনের মানসিক নির্যাতন, যেখানে ভুক্তভোগীকে নিজের ক্ষতগুলো আবার সামনে তুলে আনতে হয়, প্রমাণ করতে হয় নিজের প্রতি ঘটে যাওয়া অবমাননার প্রতিটি স্তর।

ইপ্সউইচ ক্রাউন কোর্টে শেষ পর্যন্ত বিচারক জানান, অপরাধ ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। আনোয়ারুল ইসলাম ধর্ষণ এবং যৌন নিপীড়ন, উভয় অভিযোগেই দোষী সাব্যস্ত হন। তাকে ধর্ষণের জন্য নয় বছরের সাজা দেওয়া হয়। যৌন নিপীড়নের জন্য আরও ছয় বছরের সাজা ঘোষণা করা হয়। আদালত আরও নির্দেশ দিয়েছে, তাকে যৌন অপরাধী নিবন্ধনে নাম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং তার ওপর একটি restraining order অনির্দিষ্টকাল কার্যকর থাকবে।

এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিটেকটিভ কনস্টেবল জ্যাসমিন মুললি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, আনোয়ারুল ইসলামের আচরণে কোনো ধরনের অনুশোচনার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তার মনোভাব এবং নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত নেতিবাচক। তিনি নীনার সাহসকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। মুললির মতে, নীনার এই সাহসিকতাই মামলাটিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছে এবং আদালতকে সত্য স্থাপন করতে সহায়তা করেছে।

ভুক্তভোগী নীনার ব্যক্তিগত বিবৃতি আদালতে পড়া হলে উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হন। তিনি বলেন, শুরুতে তিনি ভেবেছিলেন, আনোয়ারুল একজন ভালো মানুষ। স্বাভাবিকভাবেই তাকে বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু সেই বিশ্বাস ভেঙে যাওয়ার রাত থেকেই তার জীবন যেন থমকে গেছে। তিনি বলেন, কতবার কেঁদেছেন তার হিসাব নেই। প্রতিটি দিন তাকে মনে করিয়ে দেয়, এক টুকরো বিশ্বাস মানুষকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে। এখনো তিনি জানেন না এই ট্রমা কীভাবে সামলাবেন। তবুও তিনি লড়াই করেছেন, নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন এবং আইনকে পাশে নিয়ে ন্যায়বিচারের পথে হেঁটেছেন।

রায় ঘোষণার পর ঘটনাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয় এবং জাতীয় গণমাধ্যমে। সাফোক কনস্ট্যাবুলারির ওয়েবসাইটে প্রথম প্রেস রিলিজ প্রকাশিত হয়। শিরোনাম ছিল, একজন নারীকে ডেটে দেখা করার পর ধর্ষণ করায় এক ব্যক্তিকে নয় বছরের কারাদণ্ড। এরপর বিবিসি নিউজ অনলাইন প্রতিবেদন প্রকাশ করে, শিরোনামে উঠে আসে সেই প্রথম ডেট এবং পাবের টয়লেটের কথা। পরে ইয়াহু নিউজ এবং স্থানীয় পত্রিকা সাফোক নিউজ একই তথ্য ভিত্তি করে আলাদা রিপোর্ট ছাপে।

এই পুরো ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সামাজিক বার্তাটি। প্রথম ডেট, প্রথম সাক্ষাত বা প্রথম হাসি—কোনো কিছুই কারো ওপর অধিকার চাপিয়ে দেওয়ার অনুমতি দিতে পারে না। সম্মতি ছাড়া কোনো সম্পর্ক, কোনো স্পর্শ, কোনো কাছাকাছি যাওয়া এসবই আইনত অপরাধ এবং মানবিকভাবে নিন্দনীয়। এই মামলায় আদালতের রায় সেই সত্যটিই পুনর্ব্যক্ত করেছে।

তথ্যসূত্র:

  • Suffolk Constabulary (25 November 2025)
  • BBC News Online (25 November 2025)
  • Yahoo News UK (26 November 2025)
  • Suffolk News (26 November 2025)


Back to top button
🌐 Read in Your Language