সম্পাদকের পাতা

চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর অধ্যায়

নজরুল মিন্টো

হাদাস লেভি (ডানে) তাঁর নবজাতক সন্তানকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন রাবিন মেডিকেল সেন্টারের স্পার্ম ব্যাংকের পরিচালক ডা. এরান আল্টম্যানের সঙ্গে

ডা. হাদাস লেভি এবং ক্যাপ্টেন নেতানেল সিলবার্গ। পরিচয় হয়েছিল জেরুজালেমের একটি স্বেচ্ছাসেবী মেডিকেল ক্যাম্পে, যেখানে শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা দিতে গিয়েছিলেন হাদাস, আর সীমান্ত টহল শেষে সাহায্যের হাত বাড়াতে এসেছিলেন ক্যাপ্টেন নেতানেল। প্রথম দেখাতেই হাদাসের মনে হয়েছিল এই মানুষটির চোখে যেন অদ্ভুত এক স্থিরতা আছে।

দিনের পর দিন গভীর হয় তাদের সম্পর্ক। ছুটির দিনে কফির কাপ হাতে তারা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করতেন। বিয়ের পর কোথায় থাকবেন, কোন সমুদ্রে গিয়ে হানিমুন করবেন, কতগুলো সন্তান চাই, সবই ছিল তাদের আলোচনার বিষয়। নেতানেল মাঝে মাঝে বলতেন জীবন ছোট, তাই স্বপ্নগুলো লালন করে যেতে হয়। হাদাস হাসতেন। বলতেন, তোমার সঙ্গে থাকলে স্বপ্নগুলো আরও স্পষ্ট মনে হয়।

যুদ্ধ শেষ হলে বিয়ের দিন ঠিক করবেন, এই সিদ্ধান্তও হয়ে গিয়েছিল। দুই পরিবারই অপেক্ষায় ছিল সেই দিনের জন্য। হাদাসের সহকর্মীরা মজা করে বলতেন, বিয়ের আমন্ত্রণ দিতে যেন ভুলে না যান।

কিন্তু যুদ্ধের বাস্তবতা কখনো মানুষের স্বপ্নের মুখ দেখে না। গাজার সীমানায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এক আকস্মিক বিস্ফোরণেই শেষ হয়ে যায় নেতানেলের জীবন। ইউনিটের একজন সহকর্মী সেই খবর পৌঁছে দেন সামরিক দপ্তরে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বার্তাটি পাঠানো হয় হাদাসকে।

মোবাইলে ভেসে ওঠা বার্তাটি পড়েই যেন জমে গেল ডা. হাদাস লেভির পৃথিবী। হাসপাতালের করিডরে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। ঠিক সেই মুহূর্তে ভেতরের আলো, মানুষের চলাফেরা, ব্যস্ততা সবকিছু যেন দূরে সরে গেল। শুধু একটি বাক্য তাঁর বুকের ভেতরে ধাক্কা দিতে লাগল। ক্যাপ্টেন নেতানেল সিলবার্গ আর নেই।

জীবনে অনেক মৃত্যুসংবাদ দেখেছেন হাদাস। শিশু বিশেষজ্ঞ হিসেবে অসংখ্য শোকাহত পরিবারকে সান্ত্বনা দিয়েছেন তিনি। কিন্তু এই মৃত্যু ছিল তাঁর নিজের ভেতরের ছায়া ছিন্ন করে দেওয়া এক আঘাত। দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। মনে হচ্ছিল বাতাস থেমে গেছে, সময়ের গতি হারিয়ে গেছে, পৃথিবী তাঁর শূন্যতার চারপাশে নিস্তরঙ্গ হয়ে পড়েছে।

তারা বিয়ে করতে যাচ্ছিলেন। দুজনেই স্বপ্ন দেখেছিলেন পরিবার গড়ার। নেতানেল প্রায়ই বলতেন, শিশুরা ভবিষ্যতের কণ্ঠ। আর একজন শিশু বিশেষজ্ঞ হিসেবে হাদাস সেই কথার সৌন্দর্য নতুন করে বুঝতেন।

শোকের মাঝেও হঠাৎ এক অদ্ভুত টান অনুভব করলেন তিনি। মনে হলো মৃত্যু কি সত্যিই সবকিছুকে শেষ করে দেয়? তাদের স্বপ্ন কি এই মুহূর্তেই বিলীন হবে?

ঠিক তখনই তাঁর মনে পড়ল কয়েক বছর আগে ফার্টিলিটি কনফারেন্সে শোনা একটি বক্তৃতা। সেখানে এক চিকিৎসক বলেছিলেন যে মৃত্যুর পরও কিছু সময় শুক্রাণু সক্রিয় থাকতে পারে, আর বিশেষ পদ্ধতিতে সেগুলো উত্তোলন করা গেলে ভবিষ্যতে সন্তান জন্ম দেওয়াও সম্ভব।

সেই স্মৃতিটাই যেন বজ্রপাতের মতো ফিরে এল তাঁর মনে। হাদাস বুঝলেন সময়ের সঙ্গে তাঁর দৌড় শুরু হয়ে গেছে।

তিনি জানতেন এই পদ্ধতি অত্যন্ত সময়সংবেদী। মৃত্যুর পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পদক্ষেপ না নিলে আর কিছুই সম্ভব নয়। তিনি আরও জানতেন তারা বিয়ে করেননি। তাই আইনি বাধাও সামনে আসতে পারে।

হাদাস দ্রুত ফোন করলেন হাসপাতালের পরিচালককে। কণ্ঠ কাঁপছিল, কিন্তু সিদ্ধান্ত ছিল অবিচল। তিনি বললেন, নেতানেলের শেষ ইচ্ছাটি তিনি রক্ষা করবেন। তারা দুজন বহুদিন ধরে ভবিষ্যতের একটি শিশুর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সেই স্বপ্নের আলো তিনি নিভতে দেবেন না।

হাসপাতালের গাড়িতে চেপে জেরুজালেমের Hadassah Medical Center এর দিকে যখন ছুটছিলেন, তখন জানালার বাইরে শহরটি যুদ্ধে এলোমেলো হয়ে আছে। সাইরেন বাজছে দূরে কোথাও। মনে হচ্ছিল এই বিশৃঙ্খলার মাঝেও তিনি একটি জীবনের আলো টেনে আনতে ছুটছেন।

হাসপাতালে পৌঁছে চিকিৎসকদের বললেন, আমি তাঁর জীবনের স্বাক্ষর ধরে রাখতে চাই। চিকিৎসকেরা অবাক হলেও তাঁর চোখের দৃঢ়তা বুঝেছিলেন। হাদাস আবেদন করলেন। অবশেষে অনুমতি মিলল।

এরপর শুরু হলো চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক নতুন অধ্যায়। মৃত ক্যাপ্টেন নেতানেল সিলবার্গের দেহ থেকে শুক্রাণু সংগ্রহ ছিল এক সূক্ষ্ম কাজ, যেখানে সময় যেন প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

মৃত্যুর পর অক্সিজেনহীন পরিবেশে শুক্রাণুর কার্যকারিতা দ্রুত হারিয়ে যায়। প্রায় দশ ঘণ্টা ধরে চিকিৎসকরা বারবার চেষ্টা করেছেন সেগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে। শেষ পর্যন্ত মাত্র নয়টি কার্যকরী শুক্রাণু পাওয়া যায়। সফলতার সম্ভাবনা ছিল অত্যন্ত কম।

আইনি প্রশ্ন উঠেছিল, তারা বিবাহিত না হওয়ায় মৃত প্রেমিকের শুক্রাণু ব্যবহারের অধিকার তাঁর আছে কি না। দীর্ঘ আলোচনার পর বিশেষ অনুমতি মেলে।

পোস্টমর্টেম স্পার্ম রিট্রিভাল (PSR) প্রযুক্তির জন্ম গত শতাব্দীর শেষ দিকে। মূল ধাপগুলো হলো:
১. মৃত্যুর ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে শুক্রাণু সংগ্রহ
২. সূচ দিয়ে এপিডিডাইমাল অ্যাসপিরেশন
৩. স্পার্ম হিমায়িত করে সংরক্ষণ
৪. ভবিষ্যতে IVF পদ্ধতিতে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুকে একত্র করে ভ্রূণ তৈরি করা হয়

প্রযুক্তিগত দিক থেকে জটিল না হলেও এটি নৈতিকতা এবং আইনি অধিকার নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। পোস্টমর্টেম স্পার্ম রিট্রিভাল বিষয়টি বেশ কয়েকটি দেশে নিষিদ্ধ। যেমন জার্মানি, সুইডেন, ফরাসি আইন এটিকে পুরোপুরি অবৈধ ঘোষণা করে। অনেক দেশে এটি আংশিক বৈধ। যুক্তরাষ্ট্রের আইন রাজ্যভেদে ভিন্ন। প্রধান নৈতিক প্রশ্নগুলো হলো:
১. মৃত ব্যক্তির লিখিত সম্মতি কি ছিল
২. পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মতামত কি গুরুত্বপূর্ণ
৩. সঙ্গী কি আইনি অধিকার রাখেন
৪. মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীর মর্যাদা কি নবজাতক পাবে
৫. মৃত ব্যক্তির ইচ্ছা ব্যাখ্যা করার অধিকার কার

এ কারণে প্রতিটি দেশ নিজেদের আইনকে ধীরে ধীরে নতুনভাবে পর্যালোচনা করছে।

২০২৪ সালের অক্টোবরে হাদাস লেভি গর্ভবতী হন এবং চিকিৎসকরা জানান, শিশুটি সুস্থ। মাত্র ৯টি স্পার্ম থেকে একটি সুস্থ শিশুর জন্ম চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে একটি বড় মাইলফলক।

হাদাস বলেছিলেন, এটা যেন বিজ্ঞান কল্পকাহিনির ভেতর দিয়ে জন্ম নেওয়া একটি অলৌকিক সত্য। অনেক নারী তাঁর সাহসকে ধন্যবাদ জানিয়ে লিখছেন, যুদ্ধ মানুষকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়, কিন্তু হাদাস এমন এক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যা মৃত্যুর ভেতর থেকেও জীবনকে জয়ী করেছে।

বিশ্বজুড়ে মেডিকেল জার্নালগুলো এই ঘটনাকে একটি বৈজ্ঞানিক চমক হিসেবে বিবেচনা করছে।


Back to top button
🌐 Read in Your Language