
স্পেনের হৃদয়স্পন্দিত রাজধানী মাদ্রিদ। এটি এমন একটি শহর, যেখানে অতীত ও বর্তমান একে অপরের সঙ্গে কথা বলে। এই নগরের ইতিহাসের স্তরগুলি যেন প্রতিটি গলিতে শোনা যায়। রাজকীয় ঐতিহ্য, শিল্প-সংস্কৃতি, রাজনীতি, আধুনিকতা ও জীবনের ছন্দ সব মিলিয়ে মাদ্রিদ যেন এক জীবন্ত ইতিহাসগ্রন্থ। এখানে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, শিল্প ও রাজনীতির ছাপ, উচ্চ জীবনযাত্রার স্বাদ এবং মানুষের গতিশীলতা এক অনন্য মেলবন্ধন তৈরি করেছে।
মাদ্রিদ (Madrid) ইউরোপের অন্যতম উচ্চতম রাজধানী নগরী। শহরের ভূপ্রকৃতিতে হালকা উঁচু-নিচু বৈচিত্র্য দেখা যায়। শহরের উত্তর-পশ্চিমে মহিমান্বিত গুয়াদারামা (Guadarrama) পর্বতমালা অবস্থান করছে, যা মাদ্রিদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যুক্ত করেছে এক মনোরম পটভূমি।

এই শহরের বুক চিরে বয়ে গেছে শান্ত স্রোতের মানসানারেস (Manzanares) নদী, যা মাদ্রিদের প্রাণরেখা হিসেবে পরিচিত। এটি শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নাগরিক জীবনে শীতলতার ছোঁয়া আনে। নদীটি বৃহত্তর ট্যাগাস (Tagus) নদী ব্যবস্থার অংশ, যা স্পেন ও পর্তুগালের অন্যতম প্রধান জলধারা।
মাদ্রিদের ইতিহাস দীর্ঘ ও বহুরূপী। সপ্তম শতাব্দীর শুরুর দিকে আজকের স্পেন ও পর্তুগাল অঞ্চল, অর্থাৎ ইবেরিয়ান উপদ্বীপ, ছিল গথিক রাজ্যের শাসনে। সেই সময় রাজদরবারে অভ্যন্তরীণ কলহ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পায়। এই দুর্বলতার সুযোগে খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীর শুরুতে উত্তর আফ্রিকা থেকে আগত মুসলিম বাহিনী উপদ্বীপে প্রবেশ করে এবং দ্রুত বিজয় অর্জন করে।
এরপর শুরু হয় স্পেনের ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় “আল-আন্দালুস (al-Andalus)”। মুসলিম শাসনের এই যুগ স্পেনকে রাজনীতি, স্থাপত্য, বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক অভূতপূর্ব নবজাগরণে পৌঁছে দেয়। তারা শুধু ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেনি, বরং এমন এক সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলে যেখানে ধর্ম, শিল্প, শিক্ষা ও প্রযুক্তি একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে যুক্ত।
স্পেনে মুসলিম শাসন স্থায়ী হয় প্রায় ৭৮০ বছর (৭১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দ)। শেষ মুসলিম রাজ্য গ্রানাডা, ১৪৯২ সালে খ্রিস্টান শাসক রাজা ফার্দিনান্দ ও রানি ইসাবেলার হাতে পতিত হয়। সেই ঘটনার মধ্য দিয়েই স্পেনে মুসলিম শাসনের অধ্যায় চিরতরে শেষ হয় এবং স্পেন একীভূত খ্রিস্টান রাজ্যে পরিণত হয়।
১৫৬১ সালে স্পেনের রাজা ফিলিপ (II) তার রাজদরবার মাদ্রিদে স্থানান্তর করেন এবং ধাপে ধাপে এই শহরকেই দেশের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দেন। এই সিদ্ধান্ত মাদ্রিদকে শুধু প্রশাসনিক কেন্দ্রই নয়, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করে।

মাদ্রিদে শিল্প, সংগীত, নাট্য ও সংস্কৃতি যেন নিঃশ্বাস নেয় প্রতিটি কোণে। শহরের অলিগলি ভরপুর সঙ্গীত, নাটক, চলচ্চিত্র ও চিত্রকলার রঙে। থিয়েটার, অপেরা, ফ্ল্যামেংকো পারফরম্যান্স এবং চলচ্চিত্র উৎসব এই নগরীর সাংস্কৃতিক প্রাণকে সবসময় উজ্জীবিত রাখে। সন্ধ্যা নামলে মাদ্রিদের আলোয় ভেসে ওঠে শিল্পের উচ্ছ্বাস, সঙ্গীতের তালে তালে নেচে ওঠে শহরের হৃদস্পন্দন। শিল্প এখানে শুধু প্রদর্শন নয়, এটি মাদ্রিদের আত্মার প্রকাশ।
স্থাপত্যের ক্ষেত্রেও মাদ্রিদ এক অনন্য উদাহরণ। এখানে পুরাতন ঐতিহ্য ও আধুনিক নকশার সৌন্দর্য একত্রে মিশে আছে। রাজপ্রাসাদ, বারোক ও ক্লাসিক স্থাপত্য, দৃষ্টিনন্দন স্মারক এবং বিস্তীর্ণ চত্বর এই শহরের নান্দনিক রূপ গড়ে তুলেছে। রয়্যাল প্যালেস অব মাদ্রিদ, প্লাজা মেয়র, পুয়ের্তা দেল সল, প্রাদো মিউজিয়াম, রেইনা সোফিয়া ও থাইসেন-বর্নেমিসা শুধু স্থাপনা নয়, এগুলো স্পেনের ইতিহাস ও শিল্পের জীবন্ত প্রতীক। এই নিদর্শনগুলো মাদ্রিদকে দিয়েছে রাজকীয় মহিমা ও আধুনিক আকর্ষণের অনন্য ভারসাম্য।
মাদ্রিদের মানুষ প্রাণবন্ত, সামাজিক এবং জীবনের প্রতি গভীর অনুরাগী। তাদের দিনের শুরু হয় এক কাপ কফি ও কয়েকটি ট্যাপাস দিয়ে। কাজ শেষে সন্ধ্যা ঘনালে শহরের ক্যাফে, রেস্তোরাঁ ও রাস্তাগুলো ভরে ওঠে প্রাণচাঞ্চল্যে। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, পরিবার নিয়ে সময় কাটানো কিংবা কোনো প্রিয় সুরে হারিয়ে যাওয়া সবই তাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ছুটির দিনে তারা পার্কে কিংবা নদীতীরে সময় কাটায়। কেউ হাঁটে, কেউ সাইকেল চালায়, আবার কেউ শুধুই বসে গল্প করে। কাজ ও আনন্দের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা মাদ্রিদের মানুষের জীবনের মূল দর্শন। তাদের এই জীবনপ্রেমই শহরটিকে করেছে উদ্দীপ্ত, প্রাণবন্ত ও অনবদ্য।
এখানে ফুটবল কেবল খেলা নয়, একপ্রকার ধর্ম। রিয়াল মাদ্রিদ ও অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ এই দুটি ক্লাবের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শহরের প্রাণে স্পন্দন জাগায়। ম্যাচের দিনে মাদ্রিদের আকাশ ভরে যায় স্লোগান ও উত্তেজনায়। সান্তিয়াগো বার্নাবেউ স্টেডিয়াম যেন হয়ে ওঠে শহরের আবেগের প্রতীক।

মাদ্রিদ একটি সত্যিকারের বহুজাতিক নগরী। বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মানুষের মধ্যে বাংলাদেশি অভিবাসীরাও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শহরের লাভাপিয়েস (Lavapiés) এলাকা এখন বাংলাদেশি অভিবাসীদের মিলনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানকার সরু গলিতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বাংলাদেশি মালিকানাধীন দোকান, রেস্তোরাঁ, সেলুন ও সেবা প্রতিষ্ঠান। এসব অভিবাসীরা নিজেদের শ্রম ও সৃজনশীলতায় স্থানীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখছেন।

আমার মাদ্রিদ সফরের পেছনে ছিল সাংবাদিক বকুল খানের আন্তরিক আমন্ত্রণ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে স্পেনে বসবাস করছেন, প্রবাসী কমিউনিটির একজন পরিচিত মুখ, সবার প্রিয়জন। পরিচয় ঘটে মাদ্রিদের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও কমিউনিটি নেতা কামরুজ্জামান সুন্দর-এর সঙ্গে, যিনি আমার ছোটভাই মিঠুর সহপাঠী এবং একই উপজেলার সন্তান।

কামরুজ্জামানের সঙ্গে সাক্ষাতে আমি অভিভূত। তাঁর তিনটি বিশাল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেখে গর্বে বুক ভরে উঠল। শুধু ব্যবসায়ী হিসেবেই নয়, তিনি কমিউনিটির উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

যে কয়দিন মাদ্রিদে ছিলাম, প্রতিটি দিনই ছিল নতুন অভিজ্ঞতায় ভরপুর। শহরের সৌন্দর্য, ইতিহাস আর সংস্কৃতি দেখার আনন্দ যেমন ছিল, তেমনি ছিল অভিবাসী বাংলাদেশিদের আন্তরিক আতিথেয়তা। পুরো সফরজুড়ে সাংবাদিক বকুল খান ও ব্যবসায়ী কামরুজ্জামান আমাদের সঙ্গ দিয়েছেন অকৃত্রিম বন্ধুত্ব আর ভ্রাতৃত্বের টানে। ব্যস্ত কর্মজীবন ও ব্যবসার চাপ সত্ত্বেও তারা প্রতিদিন সময় বের করে আমাদের নিয়ে ঘুরিয়েছেন শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। সব জায়গাতেই তাঁদের উচ্ছ্বাস ও আতিথেয়তায় আমি মুগ্ধ হয়েছি।

তাদের সান্নিধ্যে আমি উপলব্ধি করেছি, প্রবাসে থেকেও কিভাবে মানুষ আপন দেশের প্রতি মমতা, আন্তরিকতা ও বন্ধন ধরে রাখতে পারে। বকুল খানের উষ্ণ ব্যবহারে যেমন সাংবাদিকতার মানবিক দিকটি খুঁজে পেয়েছি, তেমনি কামরুজ্জামান সুন্দরের মধ্যে দেখেছি এক তরুণ উদ্যোক্তার আত্মবিশ্বাস, দক্ষতা ও নেতৃত্বগুণ।

সফরের শেষ রাতে কামরুজ্জামানের মালিকানাধীন দেশ রেষ্টুরেন্টে তারা যে আয়োজন করেছিলেন, সেটি আমার মাদ্রিদ ভ্রমণের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত। সর্বস্তরের কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী, সংগঠক, সমাজকর্মী সবাই সেখানে একত্রিত হয়েছিলেন। ছিল শুভেচ্ছা বিনিময়, আর মাতৃভূমির আলোচনায় ভরপুর এক উষ্ণ সন্ধ্যা। সবার মিলন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ঐক্যের এই দৃশ্য আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।

নৈশভোজ শেষে বিদায়ের সময় তাঁদের চোখের আন্তরিকতা ও হাসি আমার মনে এক স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। মাদ্রিদ ছাড়ার সময় মনে হয়েছিল, আমি শুধু একটি শহরকে নয়, বরং হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া কিছু মানুষকে পিছনে ফেলে যাচ্ছি, যাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার এক অটুট বন্ধনে বাঁধা।

* বিভা মাদ্রিদ (Viva Madrid) অর্থাৎ মাদ্রিদ দীর্ঘজীবী হোক।
পরবর্তী গন্তব্য: লন্ডন (যুক্তরাজ্য)









