
ইউরোপের পশ্চিমপ্রান্তে আটলান্টিক সাগরের তীরে বিস্তৃত পর্তুগালের রাজধানী লিসবন একটি ঐতিহাসিক ও প্রাণবন্ত নগরী। প্রাচীন সমুদ্রগামী অভিযানের কেন্দ্র হিসেবে খ্যাত এই শহর আজ ইউরোপীয় বাণিজ্য, পর্যটন ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ প্রাণকেন্দ্র। রাজনৈতিক প্রশাসনের পাশাপাশি শিল্প, সঙ্গীত, খাবার এবং বহুসাংস্কৃতিক সহাবস্থানের সমৃদ্ধতায় লিসবনের পরিচয় বহুমাত্রিক।
লিসবন আইবেরীয় উপদ্বীপের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত। শহরটি ট্যাগাস (Rio Tejo) নদীর মোহনাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে, যেখানে নদীর স্রোত ও সমুদ্রের ঢেউ মিলিত হয়ে একটি প্রশস্ত জলভূমি সৃষ্টি করেছে। নদীতীর জুড়ে হাঁটার পথ, রিভারবোট ভ্রমণ এবং সূর্যাস্তের দৃশ্য শহরের দৈনন্দিন অনুষঙ্গ। শহরভূমি দুই তীরে বিস্তৃত এবং সাতটি পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা সরু গলি, পাথরের সিঁড়ি ও ভিউপয়েন্ট লিসবনের স্বতন্ত্র ভূচিত্রকে স্পষ্ট করে। সরাসরি আটলান্টিক মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত থাকায় সামুদ্রিক আবহাওয়া এই শহরকে একটি বিশেষ প্রাকৃতিক ছোঁয়া দেয়।

লিসবন বিশ্বের প্রাচীনতম নগরীগুলোর একটি। প্রাচীন যুগে ফিনিশীয় ও রোমান বণিকেরা এখানে বন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করেন। রোমান আমলে শহরটি অলিসিপো নামে পরিচিত ছিল। পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য পতনের পর বিভিন্ন শক্তি এখানে শাসন চালায়। ৭১১ খ্রিস্টাব্দে ইসলামিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে শহরটি আল উশবুনা নামে পরিচিতি পায়। ১১৪৭ সালে রাজা আফোন্সো হেনরিকেশ লিসবন পুনর্দখল করেন এবং ১২৫৫ সালে এটি পর্তুগালের রাজধানীর মর্যাদা পায়।

সমুদ্র অভিযানের যুগে লিসবনের কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণে বাড়ে। আফ্রিকা ও ভারত মহাসাগরের দূর সমুদ্রপথের অভিযাত্রা এখান থেকেই প্রস্তুত হতো। বিখ্যাত নাবিক ও আবিষ্কারক ভাস্কো দা গামার যাত্রার স্মৃতিচিহ্ন আজও শহরজুড়ে ছড়িয়ে আছে।

পর্তুগালের প্রধান ভাষা পর্তুগিজ। এই ভাষার সঙ্গে স্প্যানিশ, ইতালীয় ও ফরাসির ধ্বনিগত ও শব্দার্থগত মিল রয়েছে। শহরের সাংস্কৃতিক হৃদয়ে আছে ফাদো সঙ্গীত, যেখানে ভালোবাসা, বেদনা ও নস্টালজিয়ার সুর মিশে যায়। ষ্ট্রিট পারফর্মারস, ক্যাফে সংস্কৃতি, থিয়েটার, বইমেলা ও চলচ্চিত্র উৎসব সারা বছর শহরকে প্রাণবন্ত রাখে। আফ্রোপার্তুগিজ, ব্রাজিলীয় ও এশীয় স্বাদের সংমিশ্রণে লিসবনের খাবারদাবারও বৈচিত্র্যময় হয়েছে।

পর্তুগাল দীর্ঘকাল ধরে অভিবাসীবান্ধব। দেশটির প্রাক্তন আফ্রিকান উপনিবেশ এঙ্গোলা, মোজাম্বিক থেকে সত্তর দশকে বিপুল সংখ্যক মানুষ এসে বসতি গড়ে। পরবর্তীতে ব্রাজিলীয় নাগরিকরা বৃহৎ পরিসরে যুক্ত হন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও এশীয় জনগোষ্ঠীর আগমন শহরের বৈচিত্র্য বাড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এশীয়দের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর মধ্যে বাংলাদেশিদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। পর্তুগালের আইনগত নমনীয়তা, মানবিক অভিবাসন নীতি ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী জীবনযাত্রা তাদের আকৃষ্ট করেছে।

পর্তুগালে বাংলাদেশিদের আগমন শুরু হয় ২০০০ সালের পর। ইতালি, স্পেন ও যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী বহু প্রবাসী উন্নত সুযোগ-সুবিধার খোঁজে লিসবনে আসেন। ২০১৫ সালের পর এ প্রবণতা আরও বাড়ে। রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী বা অনিবন্ধিত অবস্থায় থাকা বহু মানুষ কর্মচুক্তি, বাসস্থান ও কর পরিশোধের ভিত্তিতে বৈধতা পেয়েছেন। ২০২২ সালে AIMA গঠনের ফলে প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও মানবিক হয়েছে। বর্তমানে পর্তুগালে প্রায় ২৫ হাজার বাংলাদেশি স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন, যাদের অধিকাংশই সিলেট, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ফেনী, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, শরীয়তপুর ও কুমিল্লা অঞ্চল থেকে এসেছেন।

পর্তুগালের বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশিরা ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। পোর্তো, সিন্ত্রা, সেতুবাল, কাসকাইশ, আলমাদা, ফারো, এভোরা ও লেইরিয়া অঞ্চলে এখন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি বসবাস করছেন।

এসব শহর ও শিল্পাঞ্চলে মূলত গ্রোসারি দোকান, রেস্টুরেন্ট, পোশাক ব্যবসা, নির্মাণশ্রম, কৃষিকাজ ও খাদ্য সরবরাহ খাতে তারা কর্মরত। পোর্তোতে বেশ কিছু বাংলাদেশি তরুণ রেস্টুরেন্ট ও মিনিমার্কেট পরিচালনা করছেন। দক্ষিণ পর্তুগালের আলগার্ভ উপকূলীয় শহরগুলোতেও (যেমন ফারো ও লাগোস) পর্যটন মৌসুমে অস্থায়ীভাবে কাজ করা বাংলাদেশির সংখ্যা বাড়ছে। কেউ কেউ স্থানীয় রিসোর্ট ও হোটেল ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন।

রাজধানী লিসবনের মধ্যে মার্টিম মুনিজ, ইন্তেনদেন্তে, আরোয়োশ, বাইশা চিয়াদো, আলফামা ও আনজোস এলাকায় বাংলাদেশিদের বসতি ঘনীভূত। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর মার্টিম মুনিজে হাঁটলে মনে হয় যেন ঢাকা বা সিলেটের কোনো ব্যস্ত রাস্তা। চারপাশে বাংলা কথা-বার্তা, দোকানের সাইনবোর্ডে বাংলা লেখা, এখানে ওখানে ছোট ছোট জটলা এককথায় রমরমা অবস্থা।

এখানে বসবাসরত বাংলাদেশিরা পর্যটন, রেস্টুরেন্ট, গ্রোসারি, মানি এক্সচেঞ্জ, ট্রাভেল এজেন্সি, ফুড ডেলিভারি, রাইডশেয়ারিং, নির্মাণ ও পরিচ্ছন্নতা খাতে সক্রিয়।
বাংলাদেশিদের শান্ত স্বভাব, পরিশ্রম ও সততা স্থানীয়দের আস্থা অর্জন করেছে। অনেকে এখন বৈধভাবে কর পরিশোধ করেন এবং স্থায়ী ব্যবসায়ী হিসেবে নিজের অবস্থান দৃঢ় করেছেন।
পরবর্তী গন্তব্য: মাদ্রিদ (স্পেন)









