
ইউরোপের মানচিত্রে যখন ইতিহাস, ঐতিহ্য, সভ্যতা ও শিল্পকলার কথা বলা হয়, তখন রোমের নামটি প্রথমেই উঠে আসে। এই শহর কেবল ইতালির রাজধানী নয়, এটি মানব সভ্যতার এক জীবন্ত দলিল। রোমকে বলা হয় The Eternal City, অমর নগরী। হাজার বছরের ইতিহাসে গড়া এই শহর আজও সজীব, উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত। রোম এমন এক স্থান, যেখানে অতীত ও বর্তমান একসঙ্গে নিঃশ্বাস ফেলে, আর প্রতিটি পাথরে লুকিয়ে থাকে সময়ের দীর্ঘ গল্প।
রোমে পা রাখলে মনে হয় ইতিহাসের পথে হেঁটে চলেছি। প্রাচীন প্রাসাদের ছায়া, গির্জার ঘণ্টাধ্বনি, নদীর কলতান আর পাথুরে রাস্তার ছন্দ মিলেমিশে তৈরি করে এক মায়াময় আবহ। এখানে সময় থেমে থাকে না, বরং ইতিহাসই যেন প্রতিটি নিশ্বাসে নতুন জীবন খুঁজে পায়।
রোম ইতালির মধ্যভাগে, টাইবার নদীর তীরে অবস্থিত। এই নদীর তীরে জন্ম নিয়েছিল প্রাচীন রোমান সভ্যতা, যা আজও শহরের প্রাণরেখা হিসেবে প্রবাহিত। রোম সাতটি পাহাড়ের ওপর গড়ে উঠেছে। প্রতিটি পাহাড়ই রোমান পৌরাণিক কাহিনিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

ভূমধ্যসাগর থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থানের কারণে রোম প্রাচীনকাল থেকেই ছিল বাণিজ্য ও সামরিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু। টাইবার নদীর স্রোত যেমন রোমকে জীবনের স্পন্দন দিয়েছে, তেমনি আশেপাশের পাহাড়গুলো শহরটিকে দিয়েছে এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও প্রতিরক্ষার সুবিধা।
রোমের ইতিহাস শুরু খ্রিষ্টপূর্ব ৭৫৩ সালে। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, রোমুলাস ও রেমাস নামের দুই ভাই এই শহরের ভিত্তি স্থাপন করেন। রোম এক ক্ষুদ্র বসতি থেকে পরিণত হয় বিশাল সাম্রাজ্যে, যার প্রভাব ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অংশে ছড়িয়ে পড়ে। রোমান সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক দক্ষতা, স্থাপত্য, আইন ও নাগরিক জীবনের রূপরেখা আজও আধুনিক সভ্যতার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।
রোমানরা গড়ে তুলেছিল এমন এক সভ্যতা, যা শক্তি, বুদ্ধি ও সৌন্দর্যের অনন্য সামঞ্জস্য। “রোম এক দিনে তৈরি হয়নি” এই প্রবাদটি আজও প্রতিটি উন্নয়নধারার প্রতীক হয়ে আছে। এই শহর আমাদের শেখায়, ইতিহাসের মহিমা গড়ে ওঠে সময়, অধ্যবসায় ও সৃষ্টিশীলতার মিশ্রণে।

রোমের প্রতিটি ইট যেন কথা বলে অতীতের ভাষায়। কলোসিয়াম আজও দাঁড়িয়ে আছে গ্ল্যাডিয়েটরদের রক্ত, সাহস ও গর্বের স্মৃতিতে। রোমান ফোরাম একসময় ছিল রাজনীতি ও প্রশাসনের কেন্দ্র, আজ তা ইতিহাসের খোলা পাঠশালা। প্যালাটাইন হিলে এখনো অনুভব করা যায় রাজপ্রাসাদের সেই গৌরবময় নিসর্গ, যেখানে একসময় বিশ্বের শাসকরা বসবাস করতেন।
রোম শুধু রাজনীতি বা সাম্রাজ্যের কেন্দ্র ছিল না, এটি ছিল ইউরোপীয় সংস্কৃতি ও শিল্পকলার জন্মভূমি। প্রাচীন যুগে যেমন রোম আইন ও স্থাপত্যে পথপ্রদর্শক ছিল, রেনেসাঁ যুগে তেমনি এটি হয়ে উঠেছিল শিল্পকলার নবজাগরণের কেন্দ্র।
মাইকেলেঞ্জেলো, রাফায়েল, বের্নিনি ও কারাভাজ্জোর মতো মহান শিল্পীরা রোমকে পরিণত করেছিলেন এক বিশাল খোলা গ্যালারিতে। তাদের সৃষ্টিকর্ম আজও রোমকে পরিণত করেছে এক জীবন্ত জাদুঘরে।

রোমের হৃদয়ে অবস্থিত ভ্যাটিকান সিটি বিশ্বের ক্ষুদ্রতম স্বাধীন রাষ্ট্র এবং ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের আধ্যাত্মিক রাজধানী। এখানে রয়েছে সেন্ট পিটার্স বাসিলিকা, সিস্টিন চ্যাপেল এবং ভ্যাটিকান মিউজিয়াম। সিস্টিন চ্যাপেলের ছাদে মাইকেলেঞ্জেলোর আঁকা The Creation of Adam শিল্পকলার ইতিহাসে এক অবিনাশী প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
রোমের সরকারি ভাষা ইতালীয় হলেও এখানে শোনা যায় বহু ভাষার মিশ্রণ। পর্যটক, শিক্ষার্থী ও অভিবাসীদের কারণে শহরটি যেন হয়ে উঠেছে বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক এক আবাসভূমি।
রোমানরা পরিবারপ্রেমী, সংস্কৃতিপ্রেমী এবং রুচিশীল মানুষ। তারা জীবনের ছোট ছোট সুখকে উদযাপন করে; কফির কাপ বা বন্ধুর সঙ্গে এক বিকেলের আড্ডাতেও খুঁজে নেয় জীবনের আনন্দ।

রোমান খাদ্যসংস্কৃতি তার ইতিহাসের মতোই সমৃদ্ধ। পাস্তা কার্বনারা, লাসাগনা, রোমান পিজ্জা, স্প্যাগেটি আল’আমাত্রিচিয়ানা বা তিরামিসু—প্রতিটি খাবারের পেছনে লুকিয়ে আছে প্রাচীন ঐতিহ্য। রোমে খাদ্য কেবল আহার নয়, এটি এক সংস্কৃতির প্রকাশ।
রোমের হৃদয়ে অবস্থিত ট্রেভি ফাউন্টেন বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত বারোক স্থাপনা। ১৮ শতকে স্থপতি নিকোলা সালভির নকশায় নির্মিত এই ফাউন্টেনের কেন্দ্রস্থলে সমুদ্রদেবতা নেপচুন দাঁড়িয়ে আছেন, চারপাশে জলঘোড়া ও ট্রাইটনদের ভাস্কর্য যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। বলা হয়, এখানে পেছন ফিরে এক মুদ্রা ছুড়ে ফেললে আবার রোমে ফেরা নিশ্চিত হয়। প্রতিদিন হাজারো পর্যটক স্বপ্নের কামনায় সেই ঐতিহ্য পালন করে, আর সংগৃহীত মুদ্রা যায় দাতব্য কাজে। রাতে আলো ও জলের মিলনে ট্রেভি ফাউন্টেন যেন রোমের আত্মার প্রতিচ্ছবি হয়ে জ্বলে ওঠে।

রোমের যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, যাকে ফিউমিচিনো বিমানবন্দর বলা হয়, ইতালির প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার। শহরের মধ্যে রয়েছে মেট্রো, ট্রাম, বাস ও ট্যাক্সির সুবিধা। শহরের ট্রেন নেটওয়ার্ক রোমকে যুক্ত করেছে ইতালির অন্যান্য শহর যেমন মিলান, ফ্লোরেন্স ও নেপলসের সঙ্গে।
জীবনযাত্রার মান এখানে উন্নত, যদিও ব্যয় তুলনামূলক বেশি। তবে রোমের মানুষ তাদের সরল জীবনধারা ও সামাজিক বন্ধনে আজও ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
রোম শুধু ইতিহাসের নয়, জ্ঞানেরও এক প্রাচীন নগরী। এই শহরে অবস্থিত ইউরোপের কয়েকটি বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়, যার মধ্যে সর্বপ্রথম উল্লেখযোগ্য হলো Sapienza University of Rome (১৩০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত)। এটি ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ ও প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণার উৎকর্ষতার জন্য বিশ্বব্যাপী খ্যাত।

রোমের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় সমৃদ্ধ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের শিক্ষা বিনিময় কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবছর বিশ্বের নানা দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে এসে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে। রোমের উন্মুক্ত ও বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি করে এক স্বাচ্ছন্দ্যময় একাডেমিক আবহ।
ইতালীয় সরকারের স্কলারশিপ প্রোগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকেও অনেক শিক্ষার্থী এখন রোমে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমাচ্ছে। পড়াশোনার পাশাপাশি তারা পার্ট-টাইম কাজও করছে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা পরিশ্রম, মেধা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে ইতিবাচক সুনাম অর্জন করেছে। নতুন প্রজন্মের এই তরুণেরা একদিকে যেমন রোমের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে জ্ঞান অর্জন করছে, অন্যদিকে নিজেদের দেশের সংস্কৃতিও তুলে ধরছে বহুজাতিক শিক্ষাঙ্গনে। তাদের এই সাফল্য আজ রোমে বাংলাদেশিদের নতুন পরিচয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
আজকের রোম কেবল রোমানদের নয়, এটি এক বৈচিত্র্যময় বিশ্বনগর। আফ্রিকা, এশিয়া, পূর্ব ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকা থেকে আগত মানুষ এখানে কাজ ও উন্নত জীবনের আশায় এসেছে। তারা রেস্টুরেন্ট, নির্মাণ, পরিষেবা, পর্যটন ও ট্রান্সপোর্ট খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রোমে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের সহাবস্থান এই শহরকে করেছে আরও মানবিক ও বর্ণিল।

ইতালিতে এখন বাংলাদেশিদের জয়যাত্রা চলছে। ত্রিয়েস্তা, ভিয়েনা, মিলান, ফ্লোরেন্স থেকে শুরু করে রাজধানী রোম পর্যন্ত সর্বত্র তাদের উপস্থিতি লক্ষণীয়। রোমের অলিগলি, চত্বর, রেস্টুরেন্ট কিংবা দোকানপাট—সবখানেই ছড়িয়ে আছে তাদের কর্মচাঞ্চল্য। কারও বাড়ি শরীয়তপুর, কারও মাদারিপুর, আবার কেউ এসেছেন নোয়াখালি থেকে, কেউ সিলেট থেকে। অন্যান্য জেলার মানুষও আছেন, তবে সংখ্যায় তুলনামূলক কম।
বর্তমানে কেবল রোম শহরেই কয়েক হাজার বাংলাদেশি বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক। কেউ রেস্টুরেন্ট চালাচ্ছেন, কেউ এলিমেন্টারি (গ্রোসারি দোকান), কেউ ট্র্যাভেল এজেন্সি, মানি এক্সচেঞ্জ, সেলুন বা হোটেল পরিচালনা করছেন। নানান ধরনের এই ব্যবসায় তারা সফলভাবে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় কিংবা পর্যটন এলাকাগুলোতে এখন বাংলাদেশি দোকান ও রেস্টুরেন্ট একটি পরিচিত দৃশ্য।
বিশেষ করে টোর পিনিয়াতারা, এসকুইলিনো এবং সান লরেঞ্জো অঞ্চলে বাংলাদেশিদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। অনেকেই এই এলাকাগুলোকে আজ “বাংলা টাউন” বলে আখ্যায়িত করেন। রোমের এই অঞ্চলগুলোয় সারি সারি দোকানে বাংলা সাইনবোর্ড দেখা যায়, রাস্তায় শোনা যায় বাংলার ভাষা। এসব এলাকায় বাংলাদেশি মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ইতিমধ্যে হাজার ছাড়িয়েছে। তাদের পরিশ্রম, সততা ও নির্ভরযোগ্যতা স্থানীয়দের কাছেও সম্মানের জায়গা করে নিয়েছে।

শুধু ব্যবসা নয়, ফুড ডেলিভারি, পর্যটন ও পরিষেবা খাতেও বাংলাদেশিদের ভূমিকা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। রোমের প্রায় প্রতিটি ট্যুরিস্ট বাস, ট্র্যাভেল কোম্পানি ও গাইড সেবায় বাংলাদেশিদের কর্মরত দেখা যায়। কলোসিয়াম বা ট্রেভি ফাউন্টেনের আশপাশে ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের মধ্যে অধিকাংশই বাংলাদেশের নাগরিক। কেউ হ্যান্ডব্যাগ বিক্রি করেন, কেউ সুভেনির বা পানীয় বিক্রি করেন, আবার কেউ স্কুটারে করে ফুড ডেলিভারির কাজ করেন। তারা যেন রোমের প্রতিটি কোণে পরিশ্রম ও জীবিকার এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশিদের সাফল্যের মূল রহস্য তাদের অধ্যবসায় ও সততা। দীর্ঘ পরিশ্রমের ফলে অনেকেই এখন নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন, কেউ স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন এবং সন্তানদের স্থানীয় স্কুলে পাঠাচ্ছেন। নতুন প্রজন্ম ইতালীয় ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলে, ইতালীয় সংস্কৃতিতে মিশে যাচ্ছে, কিন্তু ঘরে এখনো টিকে আছে বাংলা গান, গল্প ও ঐতিহ্য।
রোমে বাংলাদেশিরা আজ কেবল অর্থনৈতিক অবদান রাখছে না, বরং তারা হয়ে উঠেছে শহরের সংস্কৃতি ও সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের উৎসব, সৌহার্দ্য ও পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে রোম পেয়েছে এক নতুন প্রাণ, যেখানে দুই সংস্কৃতির মিলনে গড়ে উঠেছে এক মানবিক সেতুবন্ধন।
রোম এমন একটি শহর, যা শুধু দেখা যায় না, অনুভব করা যায়। প্রতিটি গলি যেন ইতিহাসের পৃষ্ঠা, প্রতিটি প্রাসাদ যেন এক শিল্পীর ক্যানভাস। সন্ধ্যার সময় কলোসিয়ামের আলো ঝলমলে হলে মনে হয়, সময় থেমে গেছে এই শহরের সৌন্দর্যে। এই শহরের প্রতিটি ইট, প্রতিটি ছায়া যেন মনে করিয়ে দেয় মানুষের সৃষ্টিশক্তিই ইতিহাসের প্রকৃত অলৌকিকতা।
রোম এক চিরন্তন প্রতীক। সভ্যতার, স্থায়িত্বের, এবং মানুষের অনন্ত সৃষ্টিশক্তির। এই শহর যেন এক ধ্রুপদী কবিতা, যেখানে ইতিহাসের পঙ্ক্তি মিশে আছে জীবনের ছন্দে।
পরবর্তী গন্তব্য: লিসবন (পর্তুগাল)









