সম্পাদকের পাতা

ফ্যাশন দুনিয়ায় ব্রিটিশ–বাংলাদেশি রোকেয়া খানম

নজরুল মিন্টো

গল্পটা শুরু হয় পূর্ব লন্ডনের এক শ্রমজীবী পরিবারে। সাত ভাইবোনের ভিড়ে, বাংলাদেশি অভিবাসী বাবা–মায়ের ছোট্ট ঘরে, রোজকার সঙ্গী ছিল সেলাই মেশিনের টুংটাং শব্দ। বাবা–মা দু’জনই পোশাক কারখানার দর্জি। কাজের ফাঁকে হাতে কাপড়ের টুকরো, সুতো, বোতাম; আর টেবিলের কোণে রাখা আঁকিবুকির খাতায় জেগে থাকা মেয়েটার কৌতূহল। সেই মেয়েটির নাম রোকেয়া খানম।

ছোটবেলা থেকেই কাপড়ের গায়ে হাত চালিয়ে রোকেয়া বুঝে ফেলতো কোন সেলাই কোথায় পড়লে কাটটা নিখুঁত হয়, কোন অলংকরণে কাপড়ের প্রাণ খুলে যায়। স্কুলে তার প্রিয় বিষয় ছিল আর্ট আর ইংরেজি সাহিত্য। রঙ, টেক্সচার, গল্প তথা সব মিলিয়ে যেন তার ভেতরটা হয়ে উঠে এক অদৃশ্য নকশার ক্যানভাস।

কিন্তু জীবনের প্যাটার্ন সোজা সেলাইয়ে বসে না। ষোলোতে তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন আকাশে উড়বেন, এয়ার হোস্টেস হয়ে পৃথিবী দেখবেন। ঠিক তখনই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। মাত্র সতেরো বছর বয়সে অকালপ্রসূত এক সন্তানের জন্ম দেন। জীবনের সমীকরণ যেনো মুহূর্তেই পাল্টে গেলো। কলেজ ছাড়তে হয়, মাথার ওপর নিরাপদ ছাদের নিশ্চয়তা চলে যায়; হোস্টেলে হোস্টেলে ঘুরে বেড়ানো তিনি এক কিশোরি মা।

একদিকে “কিশোরী মা”, অন্যদিকে আর্থিক অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও রোকেয়া পড়াশোনা থেকে সরে যাননি। তিনি আইনশাস্ত্রে তার পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত ডিগ্রি অর্জন করেন। শক্ত ভিত গড়াই ছিল তাঁর লক্ষ্য।

তবে আইনজীবী হওয়ার শেষ ধাপ ব্যয়বহুল প্রশিক্ষণ কোর্স তার নাগালের বাইরে থেকে যায়। অবশ্য তিনি দমে থাকেননি; প্রবেশ করেন করপোরেট জগতে। নিয়মিত সকাল–বিকেলের চাকরি, আর ঘরে ফিরে সন্তানের দায়িত্ব; সবকিছু একসাথে সামলে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যান।

ঠিক সেই সময় তাঁর মনে এলো এক নতুন ভাবনা। যদি এমন পোশাক তৈরি করা যায়, যেখানে বিলাসবহুল নকশার সৌন্দর্য থাকবে, কিন্তু দাম হবে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে! পূর্বের অলংকরণের ঐতিহ্য আর পাশ্চাত্যের আধুনিক কাট মিলিয়ে সেই সাশ্রয়ী বিলাসিতার ধারণাতেই তিনি গড়ে তুলেন আলাদা এক ধারা।

২০১৮ সালে নিজের সঞ্চয় থেকে £২০০০ পাউন্ড তুলে রোকেয়া শুরু করলেন ছোট্ট একটি উদ্যোগ। ঘরের কোণে বসে আঁকলেন প্রথম ডিজাইন। নমুনা তৈরির জন্য পূর্ব লন্ডনের এক দোকান যখন £৯০০ পাউন্ড দাবি করল, তখন তিনি ভরসা রাখলেন অচেনা এক ভারতীয় কারিগরের ওপর। মাত্র £১৮০ পাউন্ডেই তৈরি হলো সেই পোশাক। হাতে পাওয়া সেই প্রথম নমুনাটিই ফিরিয়ে দিল তাঁর আত্মবিশ্বাস।

বেতনের টাকা খরচ করলেন প্রথম ফটোশ্যুটের জন্য। বিনামূল্যে পাওয়া একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সাজালেন নিজের শোরুম। বন্ধুদের সহযোগিতায় তোলা হলো পোশাকের ছবি। আর প্রচারের কৌশল? পরিচিত প্রভাবশালীদের হাতে তুলে দিলেন পোশাক। তবে শর্ত ছিল, ছবি তুলে আবার ফিরিয়ে দিতে হবে।

এরপর থেকে যেন একটার পর একটা ঘটনা ঘটতে থাকলো। মাত্র তিনজন ইনফ্লুয়েন্সারকে তিনি জ্যাকেট ধার দিয়েছিলেন শুধু আয়নার সামনে ছবি তুলে ফেরত দেওয়ার শর্তে। তারা ছবি তুলল, আপলোড করল, আর সেখান থেকেই শুরু হলো ঝড়। এক ঝলকেই সিডনি থেকে নিউ ইয়র্ক পর্যন্ত ছড়িয়ে গেল তাঁর নাম। সামান্য কয়েকটি ছবিই খুলে দিল নতুন দিগন্ত।

কয়েক মাসের মধ্যেই বিক্রির অঙ্ক ছুঁয়ে ফেলল লক্ষ পাউন্ডের ঘর। স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছড়িয়ে পড়ল খানুম’স ((Khanum’s)-এর প্রশংসা। ক্রেতাদের মুখে মুখে খবর ছড়িয়ে গেল, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই হয়ে উঠল তাঁর প্রকৃত শো’রুম। শুরুতে হাতে ছিল মাত্র দুটি পোশাক—একটি ব্লেজার জ্যাকেট আর একটি অলংকৃত বোম্বার। কিন্তু সূক্ষ্ম কারুকাজ আর আধুনিক কাট সেই ছোট্ট সংগ্রহকেও আলাদা করে দিল অন্যসব ব্র্যান্ডের ভিড় থেকে।

২০২২ সালে খানুম’স-এর আয় দাঁড়ায় £৮৬০,০০০ পাউন্ড; ২০২৩-এ তা ছাড়িয়ে যায় £১.২ মিলিয়ন পাউন্ড। আর ২০২৪-এ এসে, যে উদ্যোগ একসময় ছিল কেবল সামান্য বাড়তি আয়ের পথ, সেটিই মাত্র সাত মাসে লক্ষাধিক পাউন্ডের আয়ের পথ দেখায়; এবং আজ সেই ব্র্যান্ডের বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে কয়েক কোটি পাউন্ড সমপর্যায়ের সম্ভাবনায়।

রোকেয়ার ব্র্যান্ডের নাম আজ শোভা পাচ্ছে Vogue, Harper’s Bazaar, Elle ও Tatler-এর মতো আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিনে। বিশ্বখ্যাত তারকারাও গর্বের সঙ্গে পরছেন তাঁর পোশাক। আর যে স্বপ্ন একসময় তাঁর কাছে ছিল একেবারেই ‘অসম্ভব’; অর্থাৎ ব্রিটেনের নামকরা ডিপার্টমেন্ট স্টোর হার্ভে নিকোলসে স্থান করে নেয়া—সেটিই আজ পরিণত হয়েছে বাস্তবে।

খানুম’স শুধু পোশাক নয়; এটা এক নারীবাদী উচ্চারণ। ব্র্যান্ডের মূল সুত্রেই গাঁথা আছে সম্প্রদায়, সংস্কৃতি আর ক্ষমতায়নের অঙ্গীকার। “Khanum”—যার অর্থ মর্যাদা, সম্মান, শক্তি। এ নামটিই আজ হয়ে উঠেছে যত নারী নিজেদের গল্প নতুন করে লিখতে চান, তাঁদের সম্বোধন। রোকেয়া নিজে এই চেতনার প্রতীক। হোস্টেলের অনিশ্চয়তা থেকে আইন ডিগ্রি, করপোরেট ক্যারিয়ার, তারপর উদ্যোক্তা। সব মিলিয়ে তিনি যে বার্তা দেন তা সরল: “অসম্ভব” আসলে এক মানসিকতা, ভেঙে দিলেই পথ দেখা যায়।

রোকেয়ার স্বপ্ন, ২০২৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো গ্রামীণ এলাকায় নারীদের উদ্যোগে একটি কারুশিল্পকেন্দ্র গড়ে তোলা। যেখানে থাকবে প্রশিক্ষণ, কাজ এবং আত্মনির্ভর হওয়ার সুযোগ। তিনি বৈশ্বিক মঞ্চে ব্রিটিশ–বাংলাদেশি পরিচয়ের মেলবন্ধন ঘটিয়ে দেখাতে চান—ফ্যাশন কেবল বাহ্যিক চাকচিক্য নয়; এটি হতে পারে সংস্কৃতির সংলাপ, অর্থনীতির গতিশীলতা এবং সমাজের শক্তির উৎস।

আজ যখন কোনো তরুণী তার পোশাক পরে আয়নার সামনে দাঁড়ায়, রোকেয়া চান সে শুধু সুন্দর দেখাক তা নয়—সে নিজের ভেতরের শক্তিটুকু অনুভব করুক। খানুম’স তাই কোনো “ফাস্ট ফ্যাশন” নয়; এটি স্লো, সচেতন, গল্প-বলতে থাকা ফ্যাশন। প্রতিটি পোশাকের ভেতরে আছে সংস্কৃতির গর্ব, পরিচয়ের সৌন্দর্য, আর এক নারীর হাত ধরে নতুন ভোরের প্রতিশ্রুতি।

এই গল্প কেবল এক উদ্যোক্তার সাফল্যের কাহিনি নয়; এটি প্রতিটি প্রান্তিক মেয়ের উদ্দেশে পাঠানো সাহসী আহ্বান—চলো, আমাদের গল্প আমরা নিজেরাই লিখি।

তথ্যসূত্র:

  • Evening Standard (UK, 28 February 2023)
  • The Sun (UK, 16 May 2024)


Back to top button
🌐 Read in Your Language