সম্পাদকের পাতা

বীমার টাকার লোভে রেস্টুরেন্টে আগুন: ব্র্যাম্পটনে এক বাংলাদেশির ৭ বছর জেল

নজরুল মিন্টো

রাতের আঁধারে আগুন কেবল কাঠ পোড়ায় না, পোড়ায় বিশ্বাসও। ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ, ভোররাতে কানাডার ব্র্যাম্পটন শহরে, এক বাংলাদেশি মালিকানাধীন রেস্টুরেন্টে আগুন লাগে। প্রথমে সবাই ভাবলেন, হয়তো কোনো রান্নার গ্যাস লিক করে দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কানাডার ফায়ার মার্শালদের অভিজ্ঞ চোখ দ্রুতই বুঝে যায়—এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, একটি পরিকল্পিত অপরাধের দৃশ্যপট।

ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন জহিরুল ইসলাম, এক বাংলাদেশি অভিবাসী, যিনি ব্র্যাম্পটনের বুকে ‘স্পাইস ফিউসন’ নামে এক রেস্টুরেন্ট চালাতেন। বাহ্যিক চোখে সব ঠিকঠাক। রেস্টুরেন্ট চলছিল, পরিবার ছিল সঙ্গে, দুই কন্যাসন্তান এবং স্ত্রী ফাতেমা বেগমের সঙ্গে তার অভিবাসী জীবনের গল্পটি ছিলো আশাব্যঞ্জক। কিন্তু ভিতরে ভিতরে ভাঙছিল সেই স্বপ্নের কাঠামো।

২০১৫ সাল থেকেই জহিরুলের ব্যবসায় ভাটার টান পড়ে। রেস্টুরেন্টে মাসিক ১৫,০০০ ডলার করে লোকসান এবং ব্যক্তিগত ঋণের পরিমাণ ৮০,০০০ ডলার। সেইসাথে ছিলো বকেয়া কর, কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে অক্ষমতা। কিন্তু আশ্চর্যভাবে তিনি আগুন লাগানোর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে রেস্টুরেন্টের জন্য একটি বর্ধিত বীমা পলিসি গ্রহণ করেন, যার কভারেজ ছিল ৫ লক্ষ ডলার পর্যন্ত।

১৪ মার্চ রাত ১০টা ৩০ মিনিটে রেস্টুরেন্টের শেষ কর্মচারী বেরিয়ে যাওয়ার পর তিনি নিজে তালা দেন। রাত ৩:১৫-তে তিনি পেছনের দরজা দিয়ে প্রবেশ করেন। গ্যাসোলিন ছড়িয়ে তিনটি ভিন্ন ইগনিশন পয়েন্ট তৈরি করেন, একটি টাইমার ডিভাইস সেট করে বেরিয়ে যান। ৪:১৫-তে অগ্নিবহুল সেই মুহূর্ত।

ফায়ার মার্শালরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখতে পান—অস্বাভাবিকভাবে আগুন ছড়িয়েছে। ‘ভি-প্যাটার্ন’ বিশ্লেষণে তিনটি ইগনিশন পয়েন্ট, গ্যাসোলিনের গন্ধ, নেপথার উপস্থিতি এবং সিসিটিভি ফুটেজ—সবকিছুই মিলিয়ে নিশ্চিত হন এটি একটি পরিকল্পিত আগুন।

কানাডার আদালত নথি (কেস নং: ONSC 2017-6452) ও ব্রাম্পটন গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জহিরুল ইসলাম আগুন লাগানোর পরপরই তার বীমা কোম্পানি ইন্ট্যাক্ট ইন্স্যুরেন্স-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বীমার ক্লেইমে তিনি দাবি করেন: $২২০,০০০ রেস্টুরেন্ট ভবনের ক্ষতি, $১৫০,০০০ সরঞ্জাম ও ফার্নিচার ও $১৩০,০০০ ব্যবসায়িক লোকসান।

কিন্তু তদন্তে দেখা যায়, দাবি করা সরঞ্জামের ৬০% তিনি আগুন লাগানোর দুই সপ্তাহ আগেই বিক্রি করে দিয়েছেন। এছাড়া রেস্টুরেন্টের প্রকৃত আয় দাবিকৃত আয়ের ৩৫% এরও কম।

তদন্তকারীরা তার ল্যাপটপ ও ফোন রেকর্ড ঘেঁটে আবিষ্কার করেন: আগুন লাগানোর ২ সপ্তাহ আগে তিনি “how to make fire look accidental” বিষয়ে গুগল সার্চ করেন, একটি ডার্ক ওয়েব ফোরামে ‘ইন্স্যুরেন্স ফ্রড টেকনিকস’ নিয়ে আলোচনা পড়েন, ‘Arson Techniques’ নামে একটি ই-বুক ডাউনলোড করেন।

এক অজানা নম্বরে আগুনের এক ঘণ্টা আগে তার ফোন কল রেকর্ডে পাওয়া যায়: “আজ রাতেই কাজ শেষ করতে হবে”। আর স্ত্রীকে ফোন করে বলেন, “টাকা পেলে আগে বাংলাদেশ পাঠাবো।”

২০১৭ সালের ১২ অক্টোবর, অন্টারিও সুপিরিয়র কোর্টে বিচারক মাইকেল স্যান্ডারসন মন্তব্য করেন: “এটি আমার ২২ বছরের বিচারজীবনে দেখা সবচেয়ে কৌশলী ইন্স্যুরেন্স ফ্রড। অভিযুক্ত শুধু আইন নয়, গোটা সমাজব্যবস্থার আস্থা ঠকিয়েছেন।”

আদালত তাকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দেন (আগুন লাগানোর জন্য ৫ বছর + প্রতারণার জন্য ২ বছর)। এছাড়া $৩০০,০০০ ডলার জরিমানা, কারাবাস শেষে ডিপোর্টেশনের আদেশ। বর্তমানে তিনি অন্টারিওর মিলহ্যাভেন কারাগারে বন্দী রয়েছেন।

জহিরুলের স্ত্রী ও দুই কন্যা মামলা চলাকালীন বাংলাদেশে ফিরে যান। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলায়। কমিউনিটিতে এই ঘটনা বিস্ময় সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ কমিউনিটির অনেকে জানান, কমিউনিটির কতিপয় বীমা এজেন্টরাও এই ধরণের প্রতারণায় জড়িত রয়েছেন। কীভাবে দাবিকৃত টাকাটা তুলতে হয়, কীভাবে দাবিকে জোরালো করা যায়—এসব পরামর্শ তারা দিয়ে থাকেন। প্রশ্ন জাগে—তাহলে কি শুধু এক জহিরুলই অপরাধী? নাকি ছায়ার মতো ছড়িয়ে আছে আরও অনেক মুখ, যারা ‘পরামর্শ’ দিয়ে ভাগ পায় ধ্বংসের লভ্যাংশ?

এই ঘটনার পর রেস্টুরেন্ট বীমার জন্য ৬ মাসের আর্থিক রেকর্ড জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয। $৫০,০০০ এর বেশি ক্লেইমে স্বাধীন তদন্ত বাধ্যতামূলক। এছাড়া বাংলাদেশি অভিবাসীদের ক্ষেত্রে অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। এদিকে ব্র্যাম্পটনের অন্যান্য বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের বীমা প্রিমিয়াম ২৫% বৃদ্ধি পায়। কিছু বীমা সংস্থা বাংলাদেশি নাম দেখলেই অতিরিক্ত স্ক্রুটিনি শুরু করে।

এই মামলাটি বর্তমানে কানাডার ইন্স্যুরেন্স ব্যুরোর ট্রেনিং ম্যানুয়ালে ‘হাই ভ্যালু আর্সন ক্লেইম’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রতি বছর মার্চ মাসে ইন্স্যুরেন্স ফ্রড অ্যাওয়ারনেস মান্থে এই কেসটি আলোচনায় আসে।

জহিরুল ইসলামের এই গল্প শুধু একটি আগুন নয়, এটি ব্যক্তিগত লোভের পরিণতি। এই প্রতিবেদন পাঠকের কাছে একটিই বার্তা রাখে—অপরাধ যতই সূক্ষ্ম হোক, প্রযুক্তি ও সত্যের আলোয় তা একদিন উদ্ভাসিত হবেই।

সূত্র: Insurance Bureau of Canada (IBC) Report 2017 Fraud Case Study: “High-Value Arson Claims”

দ্রষ্টব্য (Footnote):
এই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত জহিরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী ফাতেমা বেগমের নাম, “স্পাইস ফিউজন” রেস্টুরেন্টের নাম কল্পিত এবং সংযুক্ত ছবিটি প্রতীকী। আইনি সীমাবদ্ধতা থাকায় কল্পিত নাম ব্যবহার করেছি।


Back to top button
🌐 Read in Your Language